কাশ্মিরে নারীরাও রক্ষা পাচ্ছেন না নিরাপত্তা বাহিনীর নির্যাতন থেকে

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৪:০০, সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৩, সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৯

২২ আগস্ট, ভোরবেলা। মায়ের সঙ্গে বাড়িতেই ছিলেন নাঈমা। হঠাৎ দেখতে পেলেন কয়েকটা ছেলে তাদের বাসার মূল দরজা টপকে পেছনের দিক দিয়ে দ্রুত পালিয়ে যাচ্ছে। সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স (সিআরপিএফ)-এর সদস্যরা ধাওয়া করছিল তাদের। আর তা দেখে আতঙ্কিত হয়ে দ্রুত বাথরুমে লুকিয়ে পড়ে ২৬ বছর বয়সী নাঈমা।

শ্রীনগরের প্রান্তদেশে অবস্থিত হাবাক সানপোরা এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর রাতভর সংঘর্ষ হয়েছে। ওই এলাকাতেই বসবাস নাঈমার। ভারত সরকার কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল এবং রাজ্যটিকে দ্বিখণ্ডিত করে দুটি আলাদা অঞ্চল হিসেবে ঘোষণার পরদিন থেকেই ডাল হ্রদের তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা এলাকার অধিবাসীরা এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ দেখেছেন।

নিরাপত্তাবাহিনী অভিযান চালাতে পারে, এমনটা আঁচ করে হাবাক সানপোরা গ্রামের তরুণেরা তাদের পার্শ্ববর্তী এলাকায় যাওয়ার সব রাস্তা ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে দেয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, আগুন জ্বালিয়ে রাতের ঠান্ডা আবহাওয়া মোকাবিলার চেষ্টা করে প্রতিরোধকারীরা। একপর্যায়ে সিআরপিএফ সেনারা জোর করে এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করেন।
স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, দুই পক্ষের মধ্যে প্রায় রাত দুইটা নাগাদ সংঘর্ষ শুরু হয় এবং সারা রাত তা চলতে থাকে। এ সময় আশপাশের গ্রামের সব মসজিদ থেকে প্রতিরোধকারী তরুণদের সহায়তার জন্য সেখানকার বাসিন্দাদের আহ্বান জানিয়ে মাইকিং করা হয়। শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনী সেখান থেকে কাউকে আটক কিংবা গ্রেফতার করতে সমর্থ হয়নি। তবে স্থানীয়দের দাবি, সংঘর্ষ চলাকালীন কমপক্ষে ২০ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন ছররা গুলির আঘাতে। এরমধ্যে দুইজনের চোখ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

শুধু রাস্তার মধ্যেই সংঘর্ষে জড়িয়ে থেমে থাকেনি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। বাড়িতে বাড়িতে গিয়েও তল্লাশি চালিয়েছে তারা।

নাঈমা তার ভাইদের উপার্জনের বাড়তি টাকা যোগ করতে চাদর বুনতেন। এলাকার সবচেয়ে সরু গলির একদম শেষ মাথায় এই পরিবারের একতলা ঘরটি অবস্থিত। সংঘর্ষের দিন রাতে নাঈমার দুই ভাই গ্রেফতার ঠেকানোর জন্য বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। বাড়িতে নাঈমা তার ৭০ বছরের বৃদ্ধ মা জানা বেগমের সঙ্গে একা ছিলেন। ভোর প্রায় সাড়ে ছয়টা নাগাদ, তিনি যখন সিআরপিএফ সেনাদের দেখতে পেলেন, তখনি দৌড়ে গিয়ে বাথরুমে লুকিয়ে পড়লেন।

নাঈমা বলেন, ‘যখন সিআরপিএফ’র লোকেরা আমাদের বাড়ির আঙিনায় ঢুকে আমাদের জানালার কাচ ভাঙা শুরু করলো, তখন আমি বাথরুমে ছিলাম।’ তিনি জানান, সে সময় ভীতির মধ্যে থাকায় ধীরে ধীরে বাথরুমের বাইরে বেরিয়ে এসেছিলেন এবং কোনও রকমে মাকে সঙ্গে নিয়ে আবার বাথরুমে ঢুকে পড়েন।

নাঈমা জানান, এরপরও তারা রক্ষা পাননি। সিআরপিএফ’র লোকেরা তাদের বাথরুমের দরজায় লাথি মারতে শুরু করে। তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যাবহার করতে থাকে। তার ধারণা, সৈন্যরা হয়তো ভেবেছিল পরিবারের পুরুষ সদস্যদের সেখানে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।
সৈন্যরা রান্নাঘরে ঢুকে পড়তে পারে এবং পরিবারের জন্য সংরক্ষিত খাবার নষ্ট করে ফেলতে পারে, এমন আশঙ্কায় নাঈমা দরজা খুলে দেন। তিনি জানান, তখন সিপিআরএফ’র লোকদের সঙ্গে তার তর্কাতর্কি হয় এবং তাদের বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলেন।

নাঈমার ভাষ্য অনুযায়ী, ‘তারপর তারা (সেনারা) আমাদের মারধর শুরু করলো। সিআরপিএফ’র এক লোক আমার পিছনের দিকে একাধিকবার লাথি মেরেছে। যখন আমি চিৎকার করতে শুরু করলাম, লোকটি তখন তার বন্দুক বের করে এবং বন্দুকের পেছনের অংশ দিয়ে আমাকে মারার প্রস্তুতি নেয়। তখনই একজন স্থানীয় জম্মু এবং কাশ্মিরের পুলিশ কর্মকর্তা তাকে বাধা দেয় এবং বলে সে যেন আমাকে ছেড়ে দেয়।’

সৈন্যরা অবশেষে চলে যায়। নাঈমাকে সিআরপিএফ’র লোকেরা শুধু মারধর করেই যে ছেড়ে দিয়েছে তা ভেবে নাঈমার মা অবশেষে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন।

নাঈমার মা জানা বেগম বলেন, ‘যখন সৈন্যরা তাদের বাড়িতে প্রবেশ করে, তখন বাড়িতে শুধু তারা দুইজন নারী ছিলেন। ঈশ্বর ক্ষমা করুক, যদি তখন বাড়িতে আমার মেয়ে একা থাকতো, তখন না জানি কী হতো! বাথরুমের ভেতরে একজন মানুষ যেকোনও ধরনের অবস্থাতেই থাকতে পারে। তারপরও তারা তাদের পায়ের বুট জুতা দিয়ে বাথরুমের দরজা ভাঙার চেষ্টা করেছিল। তখন যেকোনও কিছু একটা ঘটে যেতে পারত।”

আগস্ট মাসের ৫ তারিখ থেকে কাশ্মিরে বসবাসকারীদের একটি বড় অংশকে এই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের হাতে শারীরিকভাবে নির্যাতিত হতে হয়েছে। এদের অনেকেই আবার তাদের থেঁতলে যাওয়া পিঠ এবং ভেঙে যাওয়া পা দেখিয়েছে সাংবাদিকদের। ২২ আগস্টের ঘটনার দিন হাবাক সানপোরা এলাকায় আহত হওয়া নারীদের মধ্যে নাঈমা শুধু একা ছিল না। সেদিন সকালে নিরাপত্তা বাহিনীর লোকেরা যখন ফাতিমা বানু নামক আরও একজন প্রতিবেশী মহিলার বাসায় ঢুকে পড়ে, তখন তিনি বাসার বাইরে অবস্থান করছিলেন।

ফাতিমা বানুর স্বামী ফারুক আহমেদ জানান, “যখন সিআরপিএফের জওয়ানরা সরাসরি তার পা লক্ষ্য করে টিয়ার গ্যাসের একটি শেল ছুড়ে মারে তখন ফাতিমা বানু তার বাচ্চাদের ঘরের ভিতরে নিয়ে যেতে চেষ্টা করছিল। বানুর সেই পায়ে পরে সার্জারি করার প্রয়োজন হয়েছিল। আমাকে সাত হাজারের বেশি টাকা ওষুধ কিনতে ব্যয় করতে হয়েছে।”

স্থানীয়দের জন্য এখন এসব প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে গেছে। নিজেদের বাড়ির ভাঙা জানালা এবং ভাঙা দরজা নিয়ে এখন কেউ আর তেমনভাবে হা-হুতাশ করে না। এমনকি এইরকম হানা আবারও ঘটার আশঙ্কায় স্থানীয়রা এখন তাদের এসব ভাঙা জানালা দরজা নতুন করে ঠিক করেন না।

কিন্তু জাম্মু এবং কাশ্মীরের সিআরপিএফ’র মুখপাত্র সঞ্জয় শর্মা সেদিন রাতে রেইডের মধ্য দিয়ে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনা অস্বীকার করেন। লুটপাট এবং নারীদের ওপর নির্যাতন চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি জানান, এই ঘটনা কখনও রেইড ছিল না।

সূত্র: স্ক্রল ইন

/জিএ/এফইউ/বিএ/এমওএফ/

লাইভ

টপ