এপির প্রতিবেদনে কাশ্মিরে অকথ্য সেনা-নিপীড়নের আলামত

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ২০:০২, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৪৫, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৯

স্বায়ত্তশাসন বাতিলের কয়েক দিনের মাথায় গত ১০ আগস্ট কাশ্মিরের দক্ষিণাঞ্চলে বশির আহমেদ দারের বাড়িতে হাজির হয় ভারতীয় সেনারা। এই ৫০ বছর বয়সী মেকানিকের ওপর পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় দুই দফায় মারপিট চালায় তারা। তার ছোট ভাই কাশ্মিরের ভারতীয় দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের দলে যোগ দিয়েছে। সেনারা তার কাছে তার সেই ছোট ভাইয়ের সন্ধান জানতে চায়। বশিরকে মারপিট করে তার ছোট ভাইকে আত্মসমর্পণ করতে বলে; ভয় দেখায়, না হলে ভয়াবহ পরিণাম ভোগ করতে হবে।

মার্কিন বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েট প্রেসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বশির দাবি করেন, দ্বিতীয় দফায় একটি সেনা ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে তাকে মারপিট করা হয়। বশির বলেন, অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিন সেনা সদস্য তাকে লাঠি দিয়ে পেটাতে থাকে। বাড়িতে জ্ঞান ফিরলে থেঁতলানো আর রক্তাক্ত পশ্চাৎদেশ নিয়ে বসতে পারছিলেন না তিনি। পিঠে ছিল প্রচণ্ড ব্যাথা। এতেও শেষ হয়নি। ১৪ আগস্ট সেনা সদস্যরা আবার তার হেফ শিরমল গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসে। আর বাড়িতে খাবারের জন্য মজুদ রাখা চালসহ অন্যান্য সামগ্রীতে কেরোসিন ঢেলে নষ্ট করে দেয়।

বশির আহমেদ দারের এই বয়ানে ভারতীয় সেনা সদস্যদের এই নিপীড়ন ও সহিংসতার বর্ণনা কাশ্মিরে অস্বাভাবিক নয়। কাশ্মিরের একাধিক গ্রামের ৫০ জনেরও বেশি মানুষ মার্কিন বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, গত ৫ আগস্টের পর ভারতীয় সেনারা তাদের বাড়িতে অভিযান চালিয়েছে। সেনা সদস্যরা তাদের পেটানোর পাশাপাশি বৈদ্যুতিক শক দিয়েছে, নোংরা পানি খেতে বাধ্য করেছে, খাবারের মজুদ নষ্ট করেছে বা প্রাণী হত্যা করেছে আর নারীদের ছিনিয়ে নেওয়ার হুমকি দিয়েছে। হাজার হাজার তরুণকে আটক করা হয়েছে।

নিপীড়নের এসব অভিযোগ সম্পর্কে ভারতীয় সেনাবাহিনীর উত্তরাঞ্চলীয় কমোন্ডের মুখপাত্র কর্নেল রাজেশ কালিয়া গ্রামবাসীদের এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। গ্রামবাসীদের এসব বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহিন আখ্যা দিয়ে তিনি দাবি করেছেন ভারতীয় সেনাবাহিনী মানবাধিকারকে মূল্য দেয়। কালিয়া বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের চলাফেরার খবর আছে। কিছু কিছু তরুণের বিরুদ্ধে দেশবিরোধী ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে আর তাদের আইন অনুযায়ী পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে’।

ভারতের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল বলেন, কাশ্মিরে অভিযানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সম্পৃক্ততা নেই। তিনি বলেন, সেখানে কোনও সহিংসতা হচ্ছে না।

বহু বছর ধরে কাশ্মিরের বাসিন্দা আর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গ্রুপগুলো অভিযোগ করে আসছে ভারতীয় সেনাবাহিনী সেখানে কাঠামোবদ্ধ নিপীড়ন চালাচ্ছে আর ভারতীয় শাসনের বিরোধিতাকারীদের অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করছে।

তবে পাঁচ সপ্তাহ আগে ভারতের হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেওয়ার পর এই অঞ্চলে ক্ষোভ, হতাশা আর আতঙ্ক বাড়তে থাকে। নরেন্দ্র মোদির সরকার কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন বাতিলের পাশাপাশি অঞ্চলটিতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে কার্ফু জারি করে।

কাশ্মিরের প্রধান শহর শ্রীনগরে কিছু কিছু বিধিনিষেধ তুলে নিয়ে শিক্ষার্থীদের স্কুলে কলেজে ফেরার আহ্বান জানানো হচ্ছে। খুলতে বলা হচ্ছে দোকানপাট। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করছেন ভারত সরকার সবকিছু স্বাভাবিক দেখিয়ে সশস্ত্র বিদ্রোহ ও ভিন্নমতালম্বীদের দমন করা গেছে এমন প্রচারণা চালাতে এসব আহ্বান জানানো হচ্ছে।

আগস্টের শুরু থেকেই সেনাবাহিনীর রাতের বেলার অভিযানে নিপীড়ন শুরু হয় বলে সাক্ষাৎকারে জানিয়েছে কাশ্মিরের অন্তত দুইশো মানুষ। পারিগাম গ্রামের বেকারি ব্যবসায়ী সোনাউল্লাহ সোফির বাড়িতে যখন সেনা অভিযান চালানো হয় তখন তিনি ঘুমাচ্ছিলেন। সেনা সদস্যরা তার দুই সন্তানকে রাস্তায় টেনে নিয়ে বন্দুকের বাট, লোহার চেইন আর লাঠি দিয়ে পেটাতে শুরু করে বলে জানান তিনি। সোফি বলেন, ‘সেনা সদস্যরা আমার ছেলেদের রাস্তার মাঝখানে নির্দয়ভাবে পেটাতে শুরু করলে অসহায়ভাবে আমি তাদের চিৎকার শুনতে থাকি’।

৭ আগস্টের ওই ঘটনা প্রসঙ্গে সোফি’র ২০ বছর বয়সী ছেলে মুজাফফর আহমেদ জানান সেনারা কিছুক্ষণের মধ্যে আরও দশ তরুণকে গ্রামের মোড়ে নিয়ে আসে। তাদের কাছে ভারতবিরোধী বিক্ষোভকারীদের নাম জানতে চায়। পিঠের কাপড় তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘তিন ঘণ্টা ধরে আমাদের পিঠ আর পায়ে মারা হয়। দেওয়া হয় বিদ্যুতের শক। আমরা চিৎকার করে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানালে তারা পেটানোয় আরও নির্দয় ও নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে। তারা আমাদের ময়লা আর নর্দমার পানি খেতে বাধ্য করে’।

পুলিশি তথ্য ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-এ পর্যালোচনায় দেখা গেছে অভিযান শুরুর পর অন্তত ৩ হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে। তাদের বেশিরভাগই তরুণ। জন নিরাপত্তা আইনের অধীনে আটক হয়েছে অন্তত ১২০ জনকে। এই আইনে কাউকে আটক করা হলে তাকে বিনাবিচারে দুই বছর পর্যন্ত কারাগারে রাখা যায়। এছাড়া হাজার হাজার মানুষকে বিক্ষোভে অংশ নিতে দেখা গেছে অভিযোগে পুলিশি লকআপে রাখা হয়েছে। তাদের কাউকে কাউকে ছেড়ে দেওয়া হলেও কয়েক দিন পর পর পুলিশের কাছে রিপোর্ট করতে বলা হয়েছে। আবার কাউকে কাউকে দিনের বেলা আটক রেখে রাতের বেলা বাড়িতে ঘুমাতে পাঠানো হচ্ছে আর বাবামায়েদের বলা হচ্ছে পরের দিন থানায় দিয়ে যেতে।ছেলেকে নির্যাতনের দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করে রেখেছেন বাবা সোনাউল্লাহ সোফি

মুজাফফর আহমেদ বলেন সেনা সদস্যরা ভোরে তাদের ছেড়ে দিয়ে চলে যায়। পরে অন্তত আট ঘণ্টা ধরে তাকে আর তার বড় ভাইকে একটা অ্যাম্বুলেন্সে রাখা হয় আর নিয়ে যাওয়া হয় শ্রীনগরের এক হাসপাতালে।

১৯৪০ এর দশকে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই কাশ্মিরে বিরোধ চলে আসছে। প্রতিবেশি দেশ দুটি নিজেদের মধ্যে তিনটি যুদ্ধের দুটিই লড়েছে এই ইস্যুতে। এখন তারা কাশ্মিরের আলাদা আলাদা অংশের নিয়ন্ত্রণ করে।

নিজেদের নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে ভারত বিরোধী বিক্ষোভ মোকাবিলার চেষ্টা করে যাচ্ছে দিল্লি। রাজনৈতিক বিপর্যয়, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ আর ভিন্ন মতালম্বীদের ওপর নিপীড়নের ধারাবাহিকতায় ১৯৮৯ সালে সেখানে ভারতের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হয়। বিদ্রোহীদের কেউ কেউ পাকিস্তানের সঙ্গে একীভূত হতে চায় আবার কেউ কাশ্মিরের স্বাধীনতা দাবি করছে। তখন থেকে এই সংঘাতে অন্তত ৭০ হাজার মানুষের প্রাণহানি হয়েছে।

এখন বিশ্বের অন্যতম সামরিকায়িত এলাকা কাশ্মির। সেনা সদস্য আর আধাসামরিক বাহিনী এখানে নিয়মিত টহল দেয়। বেশিরভাগ কাশ্মিরি ভারতীয় সেনা উপস্থিতিকে ক্ষতিকর মনে করে বিদ্রোহীদের সমর্থন করে।

এখন নতুন প্রজন্মের কাশ্মিরিরা বিক্ষোভে সামিল হচ্ছে। দিল্লির শাসনের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিয়ে লড়াইয়ের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হচ্ছে তারা।

এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারতীয় আধাসামরিক বাহিনীর একটি গাড়িবহরে আক আত্মঘাতী হামলা চালানো হলে অন্তত ৪০ জন সেনা নিহত হয়। আহত হয় আরও অনেকে। ওই সময়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, বিদ্রোহীদের মোকাবিলায় নিরাপত্তা বাহিনীকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে।

বছরের পর বছর ধরে মানবাধিকারগ্রুপগুলো ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আসছে যে তারা শারিরীক ও যৌন নিপীড়ন এবং অন্যায় গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে একটি জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রন করছে। ভারতীয় কর্মকর্তারা অভিযোগ অস্বীকার করে একে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রচারণা আখ্যা দিয়ে আসছে। মানবাধিকার গ্রুপগুলো ১৯৮৯ সাল থেকে ভারতীয় সেনাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তুলে আসছে তার মধ্যে রয়েছে: ধর্ষণ, সমকামিতা, ওয়াটারবোর্ডিং (মাথা কাপড় দিয়ে ঢেকে ক্রমাগত পানি ঢালতে থাকা), যৌনাঙ্গে বিদ্যুতের শক, আগুন দেওয়া এবং ঘুম পড়তে না দেওয়া।

গত বছর জাতিসংঘ এসব অভিযোগ তদন্ত করতে একটি স্বাধীন অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠনের আহ্বান জানায়। তবে ভারত ওই প্রতিবেদনকে ‘প্রতারণাপূর্ণ’ আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখান করে।

প্রখ্যাত অধিকারকর্মী পারভেজ ইমরোজ বলেন, চলমান অভিযানে নিরাপত্তা বাহিনীর নতুন নিপীড়নের খবর বিব্রতকর।

সন্ধ্যার পর সেনা সদস্যরা ঢুকে পড়লে আপেল বাগান বিস্তৃত গ্রামগুলোতে ভয় আর ক্ষোভ ফুটে ওঠে। ৬০ বছর বয়সী আবদুল গনি ধর জানান আগস্টের শুরু থেকে মারাং গ্রামে তার বাড়িতে অন্তত সাতবার অভিযান চালিয়েছে সেনা সদস্যরা। তারা আসার আগে নিজের মেয়েদের অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দিয়েছেন বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, তারা বলে তারা আমাদের ছেলেদের খুঁজতে এসেছে কিন্তু আমি জানি তারা আমার মেয়েদের খুঁজতে আসে।

অন্য তিনটি গ্রামের বাসিন্দারাও বলেছেন সেনা সদস্যরা তাদের হুমকি দিয়েছে যে মেয়েদের পরিবার থেকে কেড়ে নিয়ে গিয়ে অন্য জায়গায় নিয়ে বিয়ে দেওয়া হবে। আরিয়াল গ্রামের বাসিন্দা নাজির আহমেদ ভাট বলেন, তারা আমাদের বাড়ি আর হৃদয় বিজয়ী সেনাদের মতো লুণ্ঠন করেছে। তারা এখন এমন আচরণ করছে যেন তারা আমাদের জীবন, সম্পদ আর সম্মানের ওপর অধিকার নিয়ে নিয়েছে।

আগস্টের শুরুতে যখন রফিক আহমেদ লোনের বাড়িতে সেনা সদস্যরা যায় তখন তিনি বাড়ির বাইরে ছিলেন। সেনারা আমার স্ত্রীকে বাড়ি তল্লাশির সময় সঙ্গে থাকতে বলে। কিন্তু সে প্রত্যাখ্যান করলে লাঠি আর বন্দুকের বাট দিয়ে পেটানো হয়।

 

/জেজে/বিএ/

লাইভ

টপ