কেন জাকির নায়েককে ভারতে পাঠাতে চান না মাহাথির?

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ২১:৪৩, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:২৭, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৯

ভারতের বিতর্কিত ইসলামি বক্তা জাকির নায়েককে দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে শুরু থেকেই অনিচ্ছা প্রকাশ করে আসছেন মালয়েশীয় প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ। দ্য হিন্দুর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি জাকিরের বিতর্কিত মন্তব্যকে ঘিরে মালয়েশিয়ায় সমালোচনার ঝড় ওঠার প্রেক্ষাপটে ইন্টারপোলকে আবারও তার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির আহ্বান জানাবে দিল্লি। এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের উত্তরে মাহাথির বলেছেন,  ইন্টারপোল নয়, জাকিরকে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্তের এখতিয়ার মালয়েশিয়ার। আগেও একাধিকবার তিনি জাকিরকে ভারতে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে নিজের অনিচ্ছার কথা জানিয়েছেন। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মালয়েশিয়ার মুসলিমদের মধ্যে জাকিরের বিপুল সংখ্যক সমর্থক থাকায় মাহাথির তাদের নাখোশ করে বিতর্কিত ওই ব্যক্তিকে দেশে ফেরত পাঠাতে চাইছেন না। বিশ্লেষকরা বলছেন, মালয়-মুসলিমদের সমর্থন হারানোর ভয়েই তিনি এমন অবস্থান নিয়েছেন।

জাকির নায়েক

 

ভারতের আদালতে অর্থপাচার ও ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর মধ্য দিয়ে জিহাদি কার্যক্রম উদ্বুদ্ধ করার অভিযোগ রয়েছে জাকিরের বিরুদ্ধে। দিল্লির পক্ষ থেকে তাকে ফেরত পাঠানোর আনুষ্ঠানিক আবেদন করা হলে ২০১৮ সালে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ এ ব্যাপারে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। এ বছর জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহেও মাহাথির বলেছিলেন, ন্যায়বিচার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকলে জাকির নায়েককে ভারতে ফেরত পাঠানো হবে না। তবে সম্প্রতি জাকিরের এক বর্ণবাদী মন্তব্যের পর মাহাথির তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। এ ঘটনায় পুলিশি তদন্ত চলছে। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক খবর অনুযায়ী, এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে জাকির নায়েককে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে দিল্লি।

সোমবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু জানিয়েছে, জাকিরের গ্রেফতারে সহায়তা করতে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলকে রেড নোটিশ ইস্যু করতে শিগগিরই অনুরোধ করতে যাচ্ছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। তবে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথিরকে এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘বিতর্কিত ইসলামি ধর্মপ্রচারক জাকির নায়েকের বহিঃসমর্পণ বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে আবেদন করা হলে ওই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার মালয়েশিয়ার।’ ভারতের আদালতে অর্থপাচার ও ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর মধ্য দিয়ে জিহাদি কার্যক্রম উদ্বুদ্ধ করার অভিযোগ রয়েছে জাকিরের বিরুদ্ধে। ভারত-মালয়েশিয়া বন্দিবিনিময় চুক্তিতে জাতি, ধর্ম ও রাজনৈতিক কারণে বিচার কিংবা শাস্তির আশঙ্কা না থাকলে পলাতকদের ফেরত পাঠানোর কথা বলা রয়েছে। তবে মাহাথির পরোক্ষভাবে বলতে চাইছেন, জাকিরকে ভারতে ফেরত পাঠালে রাজনৈতিক কারণে তিনি ন্যয়বিচার নাও পেতে পারেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে মাহাথির বলেছেন, ‘জাকির স্বাভাবিকভাবে মনে করছেন (ভারতে) তিনি ন্যায়বিচার পাবেন না।’

জাকিরকে ভারতে ফেরত পাঠানোর বিষয়টিকে মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের সাবেক দেহরক্ষী সিরুল আজহার উমরের বহিঃসমর্পণের আবেদনে অস্ট্রেলিয়ার অস্বীকৃতির ঘটনাটির সঙ্গে তুলনা করেন তিনি। মোঙ্গলিয়ান অনুবাদক আলতানটুয়া শাড়িইবুউ’র হত্যার বিষয়ে অভিযুক্ত ছিলেন উমর। এ প্রসঙ্গে মাহাথির বলেন, ‘আমরা সিরুলের বহিঃসমর্পণে অস্ট্রেলিয়ার কাছে আবেদন করেছিলাম। তবে তারা ভয় পাচ্ছিলো যে আমরা তাকে ফাঁসিতে ঝুলাতে যাচ্ছি।’

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রিয়তায় ধস নামতে পারে; এমন আশঙ্কায় মুসলিম-মালয় ভোটব্যাংক ধরে রাখতে মাহাথির প্রশাসন জাকির নায়েককে ভারতে ফেরত পাঠাতে চাইছে না। ওই প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, ভারত রাজনৈতিক কারণে জাকিরকে ফাঁসাতে চাইছে; এমনটা মনে করলে মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া শুরু করতে অস্বীকার করতে পারে। হিউম্যান রাইটসের শীর্ষ আইনজীবী মালিক ইমতিয়াজ বলেন, ‘এই বিষয়টিই সম্ভবত তর্কবিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হবে। বিচারের মুখোমুখি হলে, ওটা রাজনৈতিক বিষয় হবে বলে মনে হয় না। যদি বহিঃসমর্পণের প্রক্রিয়া এগিয়ে যায় তখন তিনি তার বক্তব্য তুলে ধরতে এবং বহিঃসমর্পণের বিরোধিতা করতেও সমর্থ হবেন।’

ধর্মত্যাগী ও এলজিবিটি সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য মৃত্যুদণ্ডের সুপারিশ, চুরির জন্য হাত কাটা এবং ৯/১১-এর হামলাকে ‘অভ্যন্তরীণ’ আখ্যা দেওয়ার মতো বিতর্কিত মন্তব্য সত্ত্বেও মালয়েশিয়ার মুসলিম সংখ্যাঘরিষ্ঠ জনগণের একটা অংশের সমর্থন পাচ্ছেন জাকির নায়েক। মালয়েশিয়ায় জাকিরকে ইসলাম ধর্মের একজন পণ্ডিত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে তার ফ্যান অ্যাকাউন্টে স্থানীয় কমেন্টারদের কাছে থেকে তার সুস্বাস্থ্যের জন্য শুভকামনা ও তার দর্শনের জন্য প্রশংসা করা হয়। তবে তার বিদ্বেষমূলক বক্তব্যগুলো অন্য দেশের সরকারগুলোকেও বিব্রত করছে। ২০১৭ সালে সিঙ্গাপুরে তার বক্তৃতার আবেদন নিষিদ্ধ করার পর, তার ‘অসমর্থিত ব্যবহারের’ কারণে ব্রিটেনেও তার প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ রবীচন্দ্র মুর্তি জাকিরকে ভারতে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টকে বলেন, ‘এটা একটা জটিল বিষয়। মাহাথির তাকে ভারতে ফেরত পাঠালে সেটি হিন্দু সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ হিসেবে দেখা হতে পারে। এতে মালয়-মুসলিমদের সমর্থন হারাতে হতে পারে সরকার দলীয় জোটকে।’

মালয়েশিয়ায় ধর্ম ও জাতিগত ইস্যুকে স্পর্শকাতর বিবেচনা করা হয়। দেশটির ৬০ শতাংশ মানুষ মুসলমান আর বাকিরা চীন ও ভারতের নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী। এদের বেশিরভাগই সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষ। সম্প্রতি জাকির নায়েক মন্তব্য করেছেন, ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানদের চেয়ে মালয়েশিয়ায় থাকা সংখ্যালঘু হিন্দুরা শতগুণ বেশি অধিকার ভোগ করছেন। মালয়েশিয়ায় বসবাসকারী হিন্দুরা দেশটির চেয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন করেন বেশি। জাকিরের এমন বক্তব্যের পরও মাহথির তাকে ভারতে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে পরোক্ষভাবে নেতিবাচক অবস্থান নেন। সে সময় টিআরটি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, জাকির নায়েক তাদের কাছে ‘অনাহূত’ হলেও তাকে অন্য কোথাও পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। মাহাথির ওই সাক্ষাৎকারে বলেন, জাকিরের কট্টরপন্থী মতবাদ মালয়েশিয়ার ধর্মীয় সম্প্রীতির জন্য হুমকি হলেও অন্য কোনও দেশ তাকে রাখতে চায় না বলেই মালয়েশিয়া তাকে বের করে দিতে পারছে না।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাকিরের প্রতি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের আগ্রহ সত্ত্বেও তাকে মালয়েশিয়া থেকে বিতাড়ন বা তার বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনিচ্ছুক মালয়েশিয়ার বর্তমান ও পূর্ববর্তী সরকার। সিঙ্গাপুরের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের মুস্তফা ইজুদ্দিন বলেন, ‘সেখানকার মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধের সংবেদনশীলতার কারণে সম্ভবত মাহাথিরের নেতৃত্বাধীন মালয়েশিয়া জাকিরকে ভারতে ফেরত পাঠাবে না।’

সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাহিদ হামিদি ২০১৭ সালে পার্লামেন্টে বলেছিলেন, জাকিরের বক্তব্যে ‘সন্ত্রাসবাদে উদ্বুদ্ধ করে’ এমন কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গত মে মাসে ক্ষমতায় আসার পর জাকিরের সঙ্গে সাক্ষাৎও করেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ। এমন বাস্তবতায় মায়েশিয়ার আইনজীবী পি রামাসামিসহ যেসব রাজনীতিবিদ জাকির নায়েকের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন তারা এ জন্য প্রতিহিংসার ঝুঁকিতে আছেন।

/এইচকে/বিএ/এমওএফ/

লাইভ

টপ