পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মিরে জোরালো হচ্ছে স্বাধীনতার দাবি

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ২৩:৪৯, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:০০, সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৯

পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ জম্মু-কাশ্মিরের নামের সঙ্গে আজাদ অর্থ স্বাধীন। এর মধ্য দিয়ে ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মিরের সঙ্গে পার্থক্যও ঘোষণা করা হয়, সীমান্তের ওপারের চেয়ে তারা বেশি স্বাধীনতা ভোগ করে। কিন্তু পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরেও একটি বিষয় স্পষ্ট, স্থানীয়দের ভাষায়, স্বাধীনতা নিয়ে কোনও কথা সহ্য করা হবে না।

৫ আগস্ট ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন ও বিশেষ অধিকারের বাতিলের পর ব্যাপক দমন-পীড়নে বড় ধরনের বিক্ষোভ শুরু হয়ে হয়েছে। একই সঙ্গে ভারত ও পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণ থেকে স্বাধীন কাশ্মির গড়ে তোলার আওয়াজ উঠছে। স্থানীয় অ্যাক্টিভিস্ট ও কর্মকর্তারা বলছেন, ভারতের মতো একইভাবে নিরাপত্তা অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে।

পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই কাশ্মিরিদের রক্ষাকারী হিসেবে নিজেকে দাবি করে আসছে। দেশটির সরকার ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে স্বাধীনতা আন্দোলন দমনে নিপীড়নের অভিযোগ করে আসছে দিল্লির বিরুদ্ধে।

সম্প্রতি আজাদ জম্মু-কাশ্মিরে যাওয়ার এক বিরল সুযোগ পেয়েছেন মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক সাংবাদিক। সরেজমিনে তিনি দেখতে পেয়েছেন, ক্রমবর্ধমান স্বাধীনতাপন্থী আন্দোলন দমনে পাকিস্তানি নিরাপত্তাবাহিনী কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে।

স্থানীয়রা বলছেন, ভারত তাদের নিয়ন্ত্রণে কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন ও বিশেষ অধিকার বাতিল করায় উভয় কাশ্মিরের একত্রিত হওয়ার সুযোগ কমে আসছে। আর পাকিস্তান মধ্যস্ততার প্রস্তাব দেওয়া ছাড়া কিছুই করেনি, আর ভারত তা প্রত্যাখ্যান করেছে।

পাকিস্তানি অভিযানের আরেকটি লক্ষ্য রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন বাতিল হওয়ায় সশস্ত্রপন্থীরা সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। ফলে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, যদি সশস্ত্র গোষ্ঠীদের নিয়ন্ত্রণে রাখা না যায় তাহলে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হতে পারে তারা। এই অবস্থায় সীমান্তের দুই পাশের কোনও দেশই তাদের পক্ষে দাঁড়াচ্ছে না বলে হতাশ কাশ্মিরিরা।

আজাদ কাশ্মিরের রাজধানী মুজাফ্ফরাবাদের এক প্রখ্যাত সাংবাদিক আব্দুল হাকীম কাশ্মিরি বলেন, কাশ্মির নিয়ে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ করেছে। কিন্তু এই বিরোধে কাশ্মিরিদের কথা কখনও শুনতে চাওয়া হয়নি। আমার পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও জনগণকে ভালোবাসি। কিন্তু আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে। আর মানুষ জানে কথা বলার সর্বোচ্চ সীমার কথা: স্বাধীনতা।

স্থানীয়রা জানান, এক সময় স্বাধীনতাপন্থী বিক্ষোভে অল্প কিছু মানুষ জড়ো হতো। কিন্তু এখন এসব বিক্ষোভে কয়েক হাজার মানুষ অংশ নেন। গত মাসে কাশ্মিরিরা সীমান্তের দিকে বিক্ষোভ করতে গিয়েছিলেন। এক পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পাকিস্তানি নিরাপত্তাবাহিনীর সংঘর্ষ হয়। বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দিচ্ছিলেন, ‘আমরা এপারে স্বাধীনতা চাই’, ‘আমরা ওপারে স্বাধীনতা চাই’, ‘বিদেশি নিপীড়ক’, ‘চলে যাও’।

পুলিশ লাঠিচার্জ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়। সংঘর্ষে আহত হয় অন্তত ৭ পুলিশ কর্মকর্তা। বিক্ষোভের এই খবর পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমে আসেনি। কারণ ভারতের মতো এখানেও পাকিস্তান মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে কিছু সময়ের জন্য। সেনাবাহিনীর এক জেনারেল বিক্ষোভকারীদের ‘ভারতীয় এজেন্ট’ বলে অভিহিত করেছেন।

আজাদ কাশ্মিরের রাজনৈতিক নেতারা সীমান্তের দিকে মিছিল না নিয়ে যেতে আহ্বান জানানোর পরও কাশ্মিরিরা বিক্ষোভ করেন। শনিবার ভারত সীমান্তের কাছে বড় ধরনের বিক্ষোভ করেন। অক্টোবরের শুরুতে সীমান্তে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ আয়োজন করা হতে পারে।

‘বিটুইন দ্য গ্রেট ডিভাইড: অ্যা জার্নি ইনটু পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মির’ বইয়ের লেখক আনাম জাকারিয়া বলেন, সীমান্তের উভয় পাশেই স্বাধীনতার সংগ্রাম দমন করা হচ্ছে। কাশ্মিরকে সংঘাতের কেন্দ্র ও ভারত-পাকিস্তানের দাবার ঘুঁটি বানানো নিয়ে হতাশা বিরাজ করছে।

হারিস কাদের নামে স্থানীয় এক সাংবাদিক এই বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন। স্বাধীনতাপন্থী অবস্থানের কারণে মুজাফ্ফরাবাদে তার পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, কাশ্মিরিরা নিজেদের ভাগ্য নিজেদের হাতে নিতে চাইছে। আমরা বুঝতে পেরেছি যে, আমরা শুধু নিজেদেরকেই বিশ্বাস করতে পারি। নিয়ন্ত্রণ রেখা (লাইন অব কন্ট্রোল) আমাদের বিচ্ছিন্ন করেছে, এটাই আমাদের নিজের দেশেই শরণার্থী বানিয়েছে।

আজাদ কাশ্মিরের প্রেসিডেন্ট মাসুদ খান বলছেন, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে বিক্ষোভ দমন করা হয়েছে।

কিন্তু সরকারে কাশ্মিরি জাতীয়তাবাদীদের স্থান নেই। খানের মতো নির্বাচিত কর্মকর্তাদের দায়িত্ব গ্রহণের আগে পাকিস্তানি আদর্শে বিশ্বাসী বলে একটি ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করতে হয়।

কাশ্মিরের সাবেক এক সশস্ত্র স্বাধীনতাপন্থী পাকিস্তানের বিশ্বাসঘাতকতা নিয়ে ক্ষুব্ধ। তিনি বলেন, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী কাশ্মিরিদের স্বাধীনতার সংগ্রামকে কলঙ্কিত করেছে। পাকিস্তানের বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে দিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে লড়াই করানোর মাধ্যমে। লস্কর-ই-তৈয়বার মতো সংগঠনগুলো ভারতের পার্লামেন্ট ও মুম্বাইয়ে হামলা চালিয়েছে।

ওই স্বাধীনতা সংগ্রামী বলেন, আমরা ছিলাম মুক্তিযোদ্ধা, আমরা কাশ্মিরেরই মানুষ ছিলাম। কিন্তু পরে পাকিস্তান লস্কর-ই-তৈয়বাকে আমাদের আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করায়। মানুষ আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রামকে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে।

মুজাফ্ফরাবাদে কাশ্মিরের স্বাধীনতাপন্থী সংগঠন হিজবুল মুজাহিদিনের কার্যালয় মে মাস থেকে বন্ধ করে দিয়েছে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ। 

আজাদ কাশ্মিরের সাবেক প্রধান বিচারপতি মানুজর গিলানি বলেন, একসময় জিহাদ ছিল জীবনের অংশ। এখন সব টম, ডিক ও হ্যারি দাঁড়িয়ে যায় এবং বলে তারা জিহাদে যাবে। এখন জিহাদিদের সন্ত্রাসী বলা হচ্ছে। এক সময় তারা পাকিস্তানের স্বার্থে কাজ করত। কিন্তু এখন পাকিস্তান মনে করে এই পন্থা খারাপ।

কয়েকজন স্থানীয় মনে করেন, ভারত যখন কাশ্মিরে তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও পাকাপোক্ত করছে পাকিস্তানও আজাদ কাশ্মিরে একই পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। 

হিজবুল মুজাহিদিনের রাজনৈতিক শাখা মনে করা হয় জামাত-ই-ইসলামিকে। দলটির সাবেক প্রধান আব্দুল রশিদ তুরাবি দাবি করেন, তারা এখনও শান্তি চায়। সংলাপই সবার অগ্রাধিকারে রয়েছে। তিনি বলেন, সংকটের কূটনৈতিক সমাধানের সময় কমে যাচ্ছে এবং অনেকেই আর থেমে থাকতে রাজি না। নরেন্দ্র মোদি মানুষকে জিহাদের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন, আমি না।

তবে স্থানীয়রা এতটা ধৈর্য্যশীল না। মুহাম্মদ আরশাদ আব্বাসি নামের এক দোকানদার বলেন, একমাত্র সমাধান যুদ্ধ। অনেক বছর তো হলো, ভারতের সঙ্গে আলোচনায় আমরা কী অর্জন করেছি? জিহাদ ছাড়া অন্য কোনও উপায় নেই।

 

/এএ/

লাইভ

টপ