বিবিসির বিশ্লেষণ ট্রাম্প-এরদোয়ানের হাতে নির্মিত হচ্ছে সিরীয় যুদ্ধের নতুন মানচিত্র

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৫:০৬, অক্টোবর ১৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৪৮, অক্টোবর ১৫, ২০১৯

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আর তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেব এরদোয়ানের সাম্প্রতিক ভূমিকায় নতুন করে নির্মিত হচ্ছে সিরিয়া যুদ্ধের মানচিত্র। এক সপ্তাহ আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার কথিত ‘দুর্দান্ত আর নিপুণ বিজ্ঞতায়’ সিরিয়ার উত্তরাঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহার করে নেওয়ার ঘোষণা দেন। ট্রাম্পের সেই ঘোষণার পর থেকেই এই নির্মাণের শুরু। একে কুর্দি মিত্রদের সঙ্গে আমেরিকার বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ওই ঘোষণা তুরস্ক, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাসার আল আসাদের সরকার, তাদের সমর্থক রাশিয়া ও ইরান এবং উগ্রবাদী জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের জন্য খুলে দিয়েছে বিপুল সুযোগের ভাণ্ডার।

সিরিয়ার আট বছরের যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যকে বদলে দিয়েছে, এনেছে পরিবর্তন। গত সপ্তাহটি ছিল আরেকটি সন্ধিক্ষণ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘বিজ্ঞতা’ তাকে হয়তো ভবিষ্যতের ঘটনাপ্রবাহে দূরদৃষ্টি রাখতে সহায়তা করেছে। তবে নিজ প্রবৃত্তির ওপর তার গভীর আস্থা মধ্যপ্রাচ্যের সীমাহীন জটিলতার জমিনে একটি মারাত্মক ভুল হিসেবে পরিণত হতে পারে। 

বহু বছর ধরে এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, সিরীয়রা নয়, দেশটির ভাগ্য নির্ধারণ করবে বিদেশিরা। বারবার এই যুদ্ধে হস্তক্ষেপ স্থায়ী হয়েছে, বেড়েছে তার প্রচণ্ডতা। প্রতিবার সেনা প্রবেশের অর্থ দাঁড়িয়েছে বিপর্যয় আর বেসামরিক মৃত্যু। যেসব নেতা আদেশ দিয়েছেন, তাদের জন্য আক্রান্তদের দুর্ভোগের ভিডিও দেখা বাধ্যতামূলক করা উচিত। অনলাইন বা টেলিভিশনে সেসব খুঁজে পাওয়া কঠিন কিছু নয়।

সিরিয়ার নিরন্তর যুদ্ধ থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সরে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে তুরস্ক বিবেচনা করেছে সেখানে তাদের সেনা পাঠানোর সবুজ সংকেত হিসেবে। সে দেশের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেব এরদোয়ান ঘোষণা করেন, তিনি কুর্দি বাহিনী সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সের (এসডিএফ) বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে চান। কারণ, তারা তার দেশের কুর্দি বিদ্রোহীদের মিত্র। তার পরিকল্পনা হলো সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সীমান্তের দুই পাশই নিয়ন্ত্রণ করা আর ৩২ মাইল ভেতর পর্যন্ত দখলকৃত এলাকা প্রতিষ্ঠা করা। ওই এলাকায় তিনি দশ লাখ বা তারও বেশি সিরীয় শরণার্থীকে সরিয়ে রাখতে চান।

যুক্তরাষ্ট্র যখন আইএসবিরোধী লড়াইয়ে সিরিয়ার কুর্দি এবং কয়েকটি আরব গোষ্ঠীকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তখন তারা সম্ভাব্য একটি সমস্যা সম্পর্কে সচেতন ছিল। ওয়াশিংটন জানতো তাদের ন্যাটো মিত্র তুরস্ক কুর্দিদের সন্ত্রাসী বিবেচনা করে। সেই কুর্দিরাই যখন ওয়াশিংটনের মিত্র, তখন ভবিষ্যতের সমস্যা সম্পর্কে চোখ বন্ধ করে ছিল মার্কিন প্রশাসন। সেই ভবিতব্য এখন বর্তমান, যা আজ বিস্ফোরিত হয়েছে।

এক সপ্তাহ আগেও যুক্তরাষ্ট্রের সীমিত সংখ্যক সেনা উপস্থিতিকে সিরীয় কুর্দিদের নিরাপত্তা সুরক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছিল। আইএস (ইসলামিক স্টেট) জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হয়ে উঠেছিল তারা। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অন্যদের দেওয়া বিমান সক্ষমতা ও বিশেষ বাহিনীর পাশাপাশি কুর্দিরা লড়াই করেছে মাঠে, তাদের বহু যোদ্ধা প্রাণ হারিয়েছে‌ যুদ্ধের ময়দানে। আইএস কথিত খেলাফতের পতনের পর কুর্দিরা তল্লাশি চালিয়ে হাজার হাজার জিহাদি যোদ্ধাকে আটক করে কারাগারে পুরে রেখেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কয়েকটি টুইট বার্তার পর সিরিয়ার কুর্দিরা বুঝতে বাধ্য হয় তাদের ছেড়ে যাওয়া হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এস্পার অবশ্য কুর্দিদের ছেড়ে যাওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। তবে কুর্দিদের সমস্যাসংকুল ইতিহাসে আরও একবার বিদেশি শক্তি তাদের ছেড়ে গেলো। সে কারণেই তারা তাদের পুরনো শত্রু দামেস্কের দিকে ঘুরে যেতে বাধ্য হলো।

রবিবার কুর্দিরা সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাসার আল আসাদের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের ঘোষণা দেয়। চুক্তিতে ২০১২ সালের পর থেকে হাতছাড়া থাকা তুর্কি সীমান্তের দিকে দামেস্কের সেনাবাহিনীকে অগ্রসর হতে দিতে একমত হয় তারা। এটা আসাদের জন্য বড় বিজয়। দ্রুত তার সেনাবাহিনী উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ঘাঁটি ছেড়ে বেরিয়ে আসে। আসাদ অনুগতরা সিরিয়ার পতাকা ওড়াতে শুরু করে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতির জন্য এটা এক বিপর্যয়কর মুহূর্ত। কুর্দিদের সঙ্গে মিত্রতা এবং সিরিয়ার অংশবিশেষে তাদের শাসনক্ষমতাকে সুরক্ষা দেওয়ার বাস্তবতা আমেরিকাকে যুদ্ধক্ষেত্রের বাজিতে একধাপ এগিয়ে দিয়েছিল। আসাদ প্রশাসনের মিত্র রাশিয়া আর ইরানকে পেছনে ঠেলে দেওয়ারও একটি উপায় ছিল এটা। তবে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়া আর সিরীয় সেনাবাহিনীর সংহত অবস্থা ক্রেমলিন-তেহরানেরও বিজয়।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকায় আইএস (ইসলামিক স্টেট)-এর উগ্রবাদীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরোজা খুলে গেছে বলে মনে হচ্ছে। তাদের কথিত মুখপত্র টেলিগ্রামে তারা সিরিয়ায় সহিংসতার নতুন অভিযানের ঘোষণা দিয়েছে। তারা তাদের খেলাফত হারিয়েছে কিন্তু যারা কারাগারের বাইরে আছে তারা পুনর্গঠিত হয়ে গেরিলা হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সাম্প্রতিক বাস্তবতাকে আইএস কারাগারে আটক থাকা তাদের হাজার হাজার যোদ্ধার মুক্তির সুযোগ হিসেবে দেখছে। এদের কেউ কেউ নৃশংস হত্যাকারী, যারা আরেকবার অস্ত্র ও বোমা হাতে তুলে নিতে পারলে শুধু সিরিয়া নয়, আরও বৃহত্তর এলাকায় মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠতে পারে। আইএস-এর নতুন এই হুমকির বিষয়ে স্নায়ুবিক চাপে পড়েছে পশ্চিমা দেশগুলো।

মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন সংকটে ইউরোপীয় দেশগুলো তুরস্ককে অভিযান থামানোর আহ্বান জানাচ্ছে। কোনও কোনও ন্যাটো সদস্য হয়তো রুশ-সমর্থিত সিরিয়ায় দুঃস্বপ্নের উন্মোচন দেখতে পাচ্ছে। রাশিয়া বলছে তারা তুরস্কের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। তবে যুদ্ধক্ষেত্রের সহিংসতায় ভুল অনুমান, ভুল পদক্ষেপ খুবই সাধারণ একটা ব্যাপার। গত সপ্তাহে যা ঘটেছে তা হয়তো সিরীয় যুদ্ধকে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যাবে। বড় দুই নিয়ামক শক্তি আমেরিকা ও কুর্দিরা দৃশ্যপটের বাইরে চলে গেছে। আর প্রেসিডেন্ট আসাদ ও তার মিত্র ইরান ও রাশিয়া সিরিয়া যুদ্ধে তাদের বিজয়কে আরও সংহত করতে শুরু করেছে।

/জেজে/বিএ/এমওএফ/

লাইভ

টপ