পাকিস্তানকে এড়িয়ে যেভাবে সৌদি-ভারত ঘনিষ্ঠতা!

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১১:১৪, অক্টোবর ২৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫৭, অক্টোবর ২৯, ২০১৯

দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে সোমবার রাতে সৌদি আরবে পৌঁছেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ভারত থেকে তার তুরস্কে যাওয়ার কথা ছিল। তবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান কাশ্মির ইস্যুতে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় তুর্কি সফর বাতিল করেন মোদি। সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠছে, কাশ্মির ইস্যুতে সৌদি আরবের অবস্থান তাহলে কী? চিরাচরিত বন্ধু পাকিস্তানের বদলে রিয়াদ কী তাহলে ভারতকেই সমর্থন দিচ্ছে? এমন প্রশ্নের উত্তর মেলা কঠিন হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে পাকিস্তানকে এড়িয়ে সৌদি-ভারত ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে; এ নিয়ে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই।
মোদি-র এবারের সৌদি সফরে দুই দেশের মধ্যে অন্তত ডজনখানেক চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, ইন্ডিয়া-সৌদি স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ কাউন্সিল গঠন। এমবিএস নামে পরিচিত যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে ভিশন-২০৩০ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে রিয়াদ। এই ভিশন-২০৩০-এর অংশ হিসেবে বিশ্বের আটটি দেশের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সৌদি আরব। এই তালিকায় ভারতের নামও রয়েছে।

২০১৮ সালে সৌদি আকাশসীমা ব্যবহার করে ভারত-ইসরায়েল ফ্লাইট চলাচলে রিয়াদের অনুমতি দেওয়ার খবর সামনে আসে। অথচ কিছুদিন আগেও ইসরায়েল অভিমুখী কোনও ফ্লাইটের সৌদি ভূখণ্ড ব্যবহার ছিল অকল্পনীয় ঘটনা। এবারের জাতিসংঘ সম্মেলনে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ কাশ্মির ইস্যুতে সরব হলেও এ ব্যাপারে রিয়াদের দিক থেকে কোনও আওয়াজ আসেনি। অথচ নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে চিরাচরিতভাবেই পাকিস্তান সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের সঙ্গে কিভাবে সৌদি আরবের এমন ঘনিষ্ঠতা তৈরি হলো?

বহু বছর ধরে সৌদি আরবের ওপর ভারতের নির্ভরশীলতা মূলত তেলের কারণে। কারণ ভারত যে ক্রুড বা অপরিশোধিত তেল আমদানি করে থাকে তার প্রায় ২০ শতাংশই আসে সৌদি আরব থেকে। সৌদিতে কর্মরত ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যা ৪০ লাখেরও বেশি। তারা প্রতি বছর ভারতে ১১শ’ কোটি ডলারেরও বেশি রেমিট্যান্স পাঠায়। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৯৩ হাজার ১৩৮ কোটি টাকারও বেশি। তবে সৌদিতে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত আউসাফ সাঈদ জানান, সাম্প্রতিককালে এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একটা গুণগত উত্তরণ ঘটেছে। তার ভাষায়, ‘গত এক দশকে, বিশেষত শেষ চার-পাঁচ বছরে দুই দেশই স্থির করেছে যে ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে এই সম্পর্ককে একটা কৌশলগত মাত্রা দিতে হবে। আর এর মধ্যে শুধু তেল নয়, নিরাপত্তা বা প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা থেকে শুরু করে বিনিয়োগ, কৃষি সব কিছুই থাকবে।’

রাষ্ট্রদূত সাঈদ জানান, মোদি-র এবারের সফরে সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে দুই দেশের মধ্যে ‘স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ কাউন্সিল’ গঠনকে। এর ভিত তৈরি হয়েছিল ফেব্রুয়ারিতে সৌদি যুবরাজ এমবিএসের ভারত সফরের সময়। এই স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ কাউন্সিলের শীর্ষে থাকবেন মোদি ও এমবিএস। তাছাড়া দুই দেশের মন্ত্রীরাও এই পরিষদে যুক্ত থাকবেন।

বিশ্বের বাছাই করা কয়েকটি দেশের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলার লক্ষ্যে বছর দুয়েক আগে রিয়াদে এসসিআইএসপি নামে একটি সেন্টার গড়ে তুলেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। এই এসসিআইএসপি-র পূর্ণ রূপ হচ্ছে দ্য সৌদি সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক ইন্টারন্যাশনাল পার্টনারশিপ। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে ভারতকে তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সৌদির এই সেন্টারের প্রমোশনাল ভিডিওতে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যাচু অব লিবার্টি, ফ্রান্সের আইফেল টাওয়ার, ব্রিটেনের বিগ বেনের পাশাপাশি ভারতের তাজমহলও জায়গা করে নিয়েছে।

মাস্টারকার্ড ও ভিসা-র বিকল্প হিসেবে ভারত সম্প্রতি 'রুপে' নামে একটি পেমেন্ট গেটওয়ে চালু করেছে। এখন সেই রুপে-র জন্যও নিজেদের দরজা উন্মুক্ত করে দিচ্ছে রিয়াদ। এমনকি ভারত অধিকৃত কাশ্মিরের প্রধান কৃষিপণ্য কাশ্মীরি আপেলের বিরাট বাজারে পরিণত হয়েছে সৌদি আরব। কিন্তু ভারতের সঙ্গে এই ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা কি সৌদি আরব-পাকিস্তান সম্পর্কে কোনও প্রভাব ফেলছে না?

রিয়াদে প্রায় ১০ বছর ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছেন তালমিজ আহমেদ। বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘আসলে ২০০৮ সালে মুম্বাইয়ে জঙ্গি হামলার পর থেকেই এই সম্পর্কে একটা নাটকীয় মোড় এসেছে। কাশ্মির ইস্যুর সঙ্গে এর কোনও সম্পর্কও নেই। সৌদির শীর্ষ নেতৃত্ব অনুধাবন করেছেন, পাকিস্তান থেকে উগ্রপন্থা বা জিহাদের উৎপত্তির একটা বিরাট ঝুঁকি আছে - যা সীমান্ত মানে না। আজ ভারত আক্রান্ত হলে কাল তারাও আক্রান্ত হতে পারে। ভারতের মতো তাদেরও সুদীর্ঘ সমুদ্রতট আছে। আর করাচি থেকে সৌদি উপকূলও খুব দূরে নয়।’

তালমিজ আহমেদ জানান, মুম্বাই হামলার পরই ভারত ও সৌদি মিলে রিয়াদ ঘোষণাপত্র জারি করে। আর এই ঘোষণাপত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল সন্ত্রাসবাদ দমন। সাবেক এই ভারতীয় কূটনীতিকের মতে, চিরাচরিতভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি আরবের নিবিড় সম্পর্ক থাকলেও ভারত-সৌদি সম্পর্কের সঙ্গে তার কোনও বিরোধ নেই। তার ভাষায়, ‘হ্যাঁ, ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তানেরও রিয়াদে একটি নিজস্ব ভূমিকা আছে। সেই শীতল যুদ্ধের সময় বা তারও আগে থেকেই। তারা সৌদি শাসকদের নিরাপত্তা দিয়ে থাকে ইত্যাদি। কিন্তু সেগুলোতে ভারত উৎসাহীও নয়। সৌদি আরবে ভারতের ভূমিকা পুরোপুরি কূটনৈতিক।’ ফলে মঙ্গলবার রিয়াদে যখন নরেন্দ্র মোদি ও এমবিএস মিলিত হবেন তখন সেখানে কাশ্মিরের কোনও ছায়াই পড়বে না। দিল্লি অন্তত সে ব্যাপারে নিশ্চিত। সূত্র: বিবিসি, আল জাজিরা।

 

/এমপি/

লাইভ

টপ