ভারতজুড়ে এনআরসি বাস্তবায়ন কঠিন, তবে সম্ভব

Send
আশিষ বিশ্বাস, কলকাতা
প্রকাশিত : ২৩:০৩, নভেম্বর ০৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:৩৫, নভেম্বর ০৭, ২০১৯

ভারতজুড়ে জাতীয় নাগরিক তালিকা প্রস্তুত করতে অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে দেশটির ক্ষমতাসীন দল বিজেপিকে। কঠিন হলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপি সভাপতি বারবারই বলে আসছেন দেশজুড়ে এনআরসি করা হবে এবং অবৈধ বাংলাদেশিদের খুঁজে বের করা হবে। তবে এটা কঠিন হলেও অবাস্তব নয়। এতে করে এক পদক্ষেপে অনেক কাজ হয়ে যাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

অমিত শাহের মূল উদ্দেশ্য হয়তো বেশ পরিকল্পনামাফিক। দীর্ঘদিন ধরে চলা সারাদা চিট ফান্ড কিংবা নারাদা ঘুল কেলেঙ্কারির বিপরীতে বিরোধীপক্ষকে বরাবরই এনআরসি ইস্যুতে বিভক্ত রেখেছেন তিনি। এই ইস্যুতে বাংলাদেশকে কখনওই চাপ প্রয়োগ করেনি ভারত।

ফলে এটা স্পষ্ট যে, বিজেপি এনআরসি ইস্যুকে তাদের অভ্যন্তরীণ হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহার করতে চায়। বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে এর প্রভাব পড়তে দেবে না তারা। ভারতের সাধারণ জনগণও এটা নিয়ে বিভ্রান্তি ও  চাপে থাকে। ক্ষমতা যেহেতু প্রশাসনের হাতে তারা খুব ভালও করেই জানে আসামে এনআরসি নিয়ে বিতর্ক থামানো কঠিনই হবে।

আর  এখন তো প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গোগোইয়ের কাছ থেকেই পরোক্ষভাবে এনআরসির পক্ষে বক্তব্য আসলো। তার বিদায়ী ভাষণে তেমনটিই আভাস মিলেছে যেমনটা আসামে তালিকা ঘোষণার পর মিলেছিল। এনআরসি প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও প্রধান সমন্বয় ছিলেন তিনি।

বিচারপতি গোগোই এনআরসি কাজের সাফাই গেয়েছেন। তিনি এই প্রক্রিয়ায় আসামের ভবিষ্যৎ চিন্তা করেননি। তিনি ৩ কোটি ২০ লাখ মানুষের মধ্যে বাদ যাওয়া ১৯ লাখের কথা উড়িয়ে দেননি। বিজেপি, কংগ্রেস, এজিপি, এআইডিইউফ এর মতো আসামের বড় দলগুলোর কেউই চূড়ান্ত তালিকার সমর্থন দেননি।

অবসরের কয়েকদিন আগে দিল্লিতে একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের সময় এনআরসি নিয়ে গোগোইয়ের বক্তব্যে ব্যথিত হয়েছেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত আসাম সাহিত্য সভা এবং অল আসাম স্টুডেন্ট ইউনিয়নের (এএএসইউ) সদস্যরা। তাদের কাছে অবৈধ বাংলাদেশিদের চিহ্নিত করে বিতাড়িত করা অনেক দিন ধরেই অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে বিবেচিত। তাদের এই আবেগের কারণে অনেক সময় অপেক্ষাকৃত বড় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও টক্কর দিতে পারেন তারা।

বলে রাখা প্রয়োজন যে আসামের রাজনৈতিক নেতা ও নীতিনির্ধারকদের অনেকের ভাগ্যও এর সঙ্গে জড়িত। প্রধান বিচারপতি বলেন, আসামে অনেক ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ বাস করেন। তাদের অনেকেই বছরের পর বছর অ-অসমিয়াদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করছে এটা সত্য যে ১৯৮৩ সালে নিলি হত্যাকাণ্ডে ২ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। তবে সেই সহিংসতায় মুসলিম অভিবাসীদের ওপর হামলা চালানো হয়েছিল, অসমিয়াদের ওপর না। সেই সহিংসতা আসলে বাঙালি হিন্দু ও মুসলিমরে মধ্যে হয়েছিল। কয়েকবছর তার প্রভাব থাকে।

সাম্প্রতিক সময়ে এমন কোনও বড় ঘটনা ঘটেনি। তবে সংখ্যালঘুদের অভিযোগ রয়েছে যে তারা অসমিয়াদের মতো সমান অধিকার পান না।

বিতর্কিত প্রধান সমন্বয়কের  বদলির কিছুদিন পরই প্রধান বিচারপতিকেও বিদায় নিতে হবে বিষয়টি কট্টরপন্থী অসমিয়া অ্যাক্টিভিস্টদের জন্য আসলে দুঃসংবাদ। সুপ্রিম কোর্টে আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকায় এনআরসি ইস্যুটি এখনও শেষ হয়ে যায়নি। বাদপড়াদের আপিল করার পর সেই সংখ্যা ১৯ লাখ থেকে ৪ থেকে ৫ লাখে নেমে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ভুল হোক কিংবা সঠিক, বেশিরভাগ অ-অসমিয়ারাই মনে করেন বিচারপতি গোগোই কিংবা হাজেলা এনআরসি কার্যক্রমে তাদের আবেদন বিলম্বিত করেছেন। তাদেরকে অযথা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছুটতে হয়েছে। তাদের পরিচয়পত্র দেখানো ও আবাসন প্রমাণে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে অনেককে।

আসামের বর্ষীয়ান সাংবাদিক অমল গুপ্ত বলেন, পরবর্তী প্রধান বিচারপতি অসামিয়া হচ্ছেন না  এটা বাঙালি হিন্দু ও মুসলিমদের জন্য স্বস্তির।

অল আসাম স্টুডেন্ট ইউনিয়নের (এএএসইউ) নেতা সমুজ্জল ভট্টাচার্য বলেন, এনআরসির পরিসংখ্যান নির্দেশ করে ৩২ সংখ্যার মধ্যে মুষ্টিমেয় কয়েকজন তাদেরকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করতে পারেনি। তা গ্রহণযোগ্য নয়। অন্যদিকে আসামে ৪০ লাখ অবৈধ বাসিন্দা রয়েছে দাবি করে ২০১২ সালে কর্তৃপক্ষকে তাদের সনাক্ত করতে বাধ্য করেছিল বেসরকারি সংস্থা আসসাম পাবলিক ওয়ার্ক (এপিডব্লিউ)। তারাও এখন এই এনআরসি নিয়ে হতাশ। (এএএসইউ) ও (এপিডব্লিউ) উভয় বলছে, এখন ১৯ লাখের এই সংখ্যা একটি স্থুল অবমূল্যায়ন।

গোগোই বা হাজেলার অন্তর্বেদনা এখানে শেষ হচ্ছে না। আসামের চূড়ান্ত এনআরসি প্রত্যাখ্যান করেছে বিজেপি, কংগ্রেস, বামপন্থী দল ও অন্য সংস্থাগুলো। এজন্য তাদের মনোবেদনা আরও বাড়ছে। আসামের বিজেপি নেতা শীলদিত্ত দেব বলেন, এর কারণে কঠোর অবস্থানে আছে সেখানকার হিন্দুরা। এএএসইউর সমুজ্জল অভিযোগ করেছেন, স্থানীয় কর্তৃপক্ষগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে সত্যিকারের নাগরিকদের বাদ দিয়ে বিদেশিদের অন্তর্ভুক্ত করেছে। একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইঙ্গিত দিয়ে ঠিক একইরকম অভিযোগ করেছে এএএমএসইউ ও এআইইউডিএফের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠদের সংগঠনগুলো।

আসামে যেখানে এনআরসি নিয়ে বিভ্রান্তিকর অবস্থায় রয়েছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ, সেখানে অন্য রাজ্যে অনুরূপ কিছু করতে যাওয়া কেন্দ্রের পছন্দসই বলে মনে হয় না। ইতোমধ্যে কর্ণাটক রাজ্যে এনআরসি হালনাগাদের জন্য চাপ দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার, যা বাতিল হয়েছে। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গ সর্বোতভাবে এর বিরোধিতা করেছে রাজ্য সরকার। এনআরসির ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান জোরালো হলেও যেসব রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় নেই, এমন রাজ্যে এনআরসি বাস্তবায়ন অনেক কঠিন হবে তাদের জন্য।

/এইচকে/টিএন/

লাইভ

টপ