behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

নারীর বেদনাবোধের ভিন্নতা

ফাহমিদা উর্ণি২৩:০৫, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৫

নারীর বেদনাবোধের ভিন্নতাপুরুষের চেয়ে নারীরাই বেশি দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার সমস্যায় ভোগেন এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোগটি শনাক্ত করা হয় না কিংবা চিকিৎসাহীনই থেকে যায়। আর এর কারণ হিসেবে নারী-পুরুষের ব্যথাজনিত অনুভবের ভিন্নতা বুঝতে না পারাকে কারণ বলে মনে করছেন অস্ট্রেলীয় গাইনোকোলজিস্ট এবং পেইন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ সুসান ইভান। তার মতে নারী-পুরুষদের ব্যথা অনুভবের ভিন্নতা নিয়ে আরও অনেক বেশি গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। আর তার মধ্য দিয়েই দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা বা ক্রনিক পেইনের চিকিৎসা সম্ভব। এ নিয়ে নিবন্ধভিত্তিক অস্ট্রেলীয় ওয়েবসাইট কনভারসেশনে একটি নিবন্ধ লিখেছেন তিনি। নিবন্ধে নারী-পুরুষের আলাদা ব্যথা অনুভবের পর্যবেক্ষণজনিত ইতিহাস, তা নিয়ে গবেষণার কমতি এবং চিকিৎসায় এর প্রভাব তুলে ধরেছেন সুসান।

ব্যথার আলাদা অনুভূতি

টানা ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে যেসব ব্যথা স্থায়ী হয়ে থাকে তাকে ক্রনিক পেইন বলে উল্লেখ করেছেন সুসান। তিনি গবেষণা করে দেখেছেন, সাধারণত পুরুষদের মধ্যে গুচ্ছ গুচ্ছভাবে মাথা ব্যথা হয় (যেমন-মাথার এক পাশে তীব্র ব্যথা), কোমর ব্যথা, অ্যানকাইলুজিং স্পনডিলিটিস (মেরুদণ্ডের ব্যথা), আলো এবং ঘ্রাণজনিত ব্যাঘাত ছাড়াই সৃষ্ট মাইগ্রেন। 

আর শ্রোণী-সম্পর্কিত ব্যথা থেকে শুরু করে অসহ্য পেট ব্যথা, মাথাব্যথা, ধমনীসংক্রান্ত রোগ, বাতজনিত ব্যথা, চোয়াল, দাঁত ও মূত্রাশয়ে ব্যথাজনিত সমস্যাগুলো নারীদের মাঝেই বেশি দেখা যায় বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ব্যথার উপসর্গকে আলাদাভাবে উপস্থাপন

নিজেদের ব্যথার বর্ণনাও নারী ও পুরুষ আলাদাভাবে দিয়ে থাকেন। গবেষণায় দেখা গেছে, নারীরা অনেক বেশি গ্রাফিক ভাষায় ব্যথার উপসর্গের বর্ণনা দেন। অন্যদিকে পুরুষরা ব্যথার বর্ণনা দিতে গিয়ে অনেক বেশি ক্রোধ প্রকাশ করেন। তবে অনেক বেশি বস্তুনিষ্ঠভাবে তারা তাদের উপলব্ধি বর্ণনা করতে পারেন। পুরুষরা অনেক ক্ষেত্রেই স্বল্প ভাষায় তাদের ব্যথার বর্ণনা দেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা তাদের যন্ত্রণাজনিত উদ্দীপনার কথা বলতে লজ্জাবোধ করেন।

নারী/পুরুষের আলাদা ব্যথা ভাবনার ইতিহাস

সুসানের মতে, অন্যদের ব্যথা সম্পর্কে আমরা কেবল তখনই উপলব্ধি করতে পারব যখন একইরকম ব্যথা আমাদের হবে কিংবা সে ব্যথার তীব্রতা আমরা কল্পনা করে নিতে পারি। এক্ষেত্রে নারীদের ব্যথাজনিত সমস্যাগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দৃশ্যমান হয় না এবং অন্যরা উপলব্ধি করতে পারে না।

সুসান জানান, নারীদের যে ব্যথাগুলো বোধগম্য হয় না সেগুলোকে খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ শতক থেকেই সমস্যা আকারে পাঠ করতে শুরু করেন প্রাচীন গ্রিকরা। নারীদের জটিল মাত্রার ব্যথা নিয়ে গবেষণা শেষে ‘ওয়েন্ডারিং উম্ব’ বা ‘বিচরণকারী গর্ভাশয়’ নামে একটি সমাধানে পৌঁছান গবেষকরা। ধারণা করা হয়, নারীর গর্ভাশয় যখন গরম হয়ে যায় এবং শুকিয়ে যায় তখন তা একটি ঠাণ্ডা ও মসৃণ জায়গা খুঁজতে থাকে। আর সেসময় নারীর শরীরে ও মনে একধরনের চাপ তৈরি হয়।

গ্রিক চিকিৎসকরা এরই নাম দেন হিস্টেরিয়া। গ্রিক শব্দ হিস্টেরোস থেকে যার উদ্ভব। হিস্টেরোস শব্দটি নারীর আবেগ এবং শারীরিক অবস্থা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এ পর্যায়ের ব্যথায় থাকা নারীরা নিজেদের হীন ও দুর্বল ভাবতে থাকেন এবং অযৌক্তিক আচরণ করেন। প্রাচীন গ্রিসে নারীদের অধঃস্তন সামাজিক অবস্থান বোঝাতে গিয়ে ‘দ্য নিকোমাচিয়ান ইথিকস’ নামক বইতে হিস্টেরিয়ার ধারণাটি ব্যবহার করেছিলেন এরিস্টটল।

নারীর বেদনাবোধ

পরবর্তী ২০০০ বছর পর্যন্ত নারী শরীরের ব্যাপক পরিবর্তনজনিত উপসর্গ বোঝাতে ইউরোপীয় চিকিৎসাবিদেরা হিস্টেরিয়া শব্দটি ব্যবহার করে আসছিলেন। ১৯৮০ সালে ডিএসএম থ্রি ম্যানুয়েল অব সাইক্রিয়াটিক ডিজঅর্ডার থেকে শব্দটি মুছে ফেলা হয়।

অন্যদিকে পুরুষদের ব্যথা বোঝার বা ব্যথা নিয়ে ভাবনার ইতিহাস তৈরি হয়েছে যুদ্ধক্ষেত্রে আহত অবস্থায় তাদের আচরণ এবং সক্ষমতার মধ্য দিয়ে। ১৯৭২ সালে ইংরেজ কবি উইলিয়াম কাউপার উদ্ধৃত করেন যে, যুদ্ধক্ষেত্রে খ্যাতি ও যশসহ অন্যান্য প্ররোচনা পুরুষকে ব্যথা ভুলে থাকতে সহায়তা করত।

নারীর ব্যথার স্বতন্ত্র উদ্দীপনা

শনাক্ত না হওয়া গর্ভধারণের ক্ষেত্রে নতুন ওষুধ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এমন আশঙ্কায় ১৯৭৭ সালে গর্ভধারণে সক্ষম নারীদের ওপর নতুন ওষুধের পরীক্ষা না চালানোর সুপারিশ করে ইউএস ফুড এন্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। ধারণা ছিল, পুরুষের ব্যথা নিয়ে গবেষণা করলে তা দিয়ে দুই লিঙ্গের মানুষের ব্যথাই অনুধাবন করা যাবে। সে ধারণা থেকে বেশিরভাগ ব্যথাজনিত গবেষণাই পুরুষদের ওপর করা হয়েছে। আর তখন থেকেই মূলত নারী/পুরুষের ব্যথার ভিন্নতা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।

তবে ক্রমাগত নতুন গবেষণায় দেখা যায় নারীরা পুরুষের তুলনায় বেশি ব্যথাজনিত উদ্দীপনায় ভুগে থাকে। তার মানে এ নয় যে, নারীরা পুরুষদের চেয়ে দুর্বল কিংবা তাদের ব্যথা সত্যি নয়। নারীর বিশেষত্বজনিত ব্যথা যেমন ঋতুস্রাবজনিত ব্যথার মত ব্যথাগুলো নারীর শরীরের অন্য জায়গায়ও তীব্র ব্যথার উদ্ভব ঘটাতে পারে। নারীর স্নায়ুতে কম এনডরফিন(যা ব্যথা দমন করে) উৎপন্ন হয়। এমনকি ব্যথা উপশমে মরফিন দেয়া হলেও তা নারী-পুরুষভেদে আলাদা কাজ করে।

নতুন গবেষণাগুলোতে দেখা যায় নারী-পুরুষের মাঝে ব্যথার উদ্ভব কিংবা পথগুলোও আলাদা হতে পারে। শ্বাসপ্রণালিতে থাকা কোষ মাইক্রোগ্লিয়া দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা তৈরিতে ভূমিকা পালন করে থাকে। ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে মাইক্রোগ্লিয়ার সক্রিয়তা প্রতিরোধকারী ওষুধ ব্যবহার করে পুরুষের শরীরের ব্যথা কমানো গেলেও তা দিয়ে নারীর ব্যথাবোধ কমানো যায় না।

আর তাই যুদ্ধক্ষেত্রে প্রচণ্ড যন্ত্রণা নিয়ে টিকে থাকার সঙ্গে পুরুষের ব্যথার ধারণা কিংবা দীর্ঘস্থায়ী রোগগুলোর(নারীসংক্রান্ত) ব্যথাকে জয় করার সক্ষমতার মধ্য দিয়ে ব্যথাবোধ নির্ণয় করার যে পর্যবেক্ষণজনিত ধারণা তার শরীরবৃত্তীয় প্রমাণের প্রয়োজন পড়েছে। আমাদের শরীরের কোষ যদি লিঙ্গভেদে আলাদা আচরণ করতে পারে তবে নারী-পুরুষের বেদনাবোধে যে ভিন্নতা থাকতে পারে সেক্ষেত্রে বোধহয় বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। সূত্র: কনভারসেশন, স্ক্রল.ইন

/এফইউ/বিএ/

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ