behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

তালেবান ইজ ব্যাক!

আরশাদ আলী০৭:৪৪, ডিসেম্বর ২৯, ২০১৫

বারবার আক্রান্ত হওয়া একটি গ্রামে যখন আফগান পুলিশ বাহিনীর বহর প্রবেশ করলো তখনই তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে তালেবান জঙ্গিরা। যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা প্রশিক্ষিত আফগান পুলিশ সদস্যরা তাদের সামরিক যান থেকে বের হয়ে নিজেদের একে-৪৭ রাইফেল দিয়ে চারদিকে গুলি বর্ষণ শুরু করে। পুলিশের এ অবস্থা দেখে বহরের নেতৃত্বে থাকা তাদের কমান্ডার কর্নেল খলিল জাওয়াদ রেডিওতে চিৎকার করে বলতে শুরু করেন, ‘শত্রু মাত্র একটা গুলি করেছে আর তোমরা কয়েকশ গুলি করছ! আগে নিশানা ঠিক কর,তারপর গুলি কর’।

এক মিনিট পরেই জঙ্গিরা চলে যায়। ডিসেম্বর মাসের প্রথম দিকের ওই দিনে দক্ষিণাঞ্চলের হেলমান্দ প্রদেশে হামলা চালিয়ে জঙ্গিরা তাদের বার্তা পাঠায়: তালেবানরা ফিরে এসেছে। তালেবান যোদ্ধারা যুক্তরাষ্ট্র প্রশিক্ষিত আফগান পুলিশের চেয়ে সুশৃঙ্খল এবং কৌশলী।

আফগানিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা নিজেদের মধ্যে তালেবানদের ভয়ানক হামলা ও হুমকি নিয়ে কথা বলা শুরু করেছেন। গত অক্টোবরে আফগান জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের বৈঠকে এটা নিয়েও আলোচনা হয়। অবশ্য আলোচনার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। ওই বৈঠকে দেশটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ স্বীকার করেন যে, তারা আফগানিস্তানের মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘মানুষ যা চেয়েছিলে আমরা তা দিতে ব্যর্থ হয়েছি।’ উচ্চ পর্যায়ের ওই বৈঠকে তিনি বলেন, ‘আমাদের বাহিনীতে শৃঙ্খলার ঘাটতি আছে। আমরা নিজেদের পুলিশ ও সেনাদের দেখভাল ঠিকমতো করতে পারিনি। তারা লাগাতার আক্রমণের শিকার হয়ে আহত হচ্ছে।’

একজন আফগান তালেবান যোদ্ধা

পশ্চিমা ও আফগান কর্মকর্তাদের মতে, ২০০১ সালের পর বর্তমানেই তালেবানরা দেশটির প্রায় ৩০ শতাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে অথবা তাদের ব্যাপক উপস্থিতি রয়েছে। ২০১১ সালে ৯/১১ হামলার পর তালেবানদের ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা হয়।  এখন যুক্তরাষ্ট্র ও আফগানিস্তানের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে হেলমান্দ শহর রক্ষা করা। ২০১২ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র মেরিন ও ব্রিটিশ সেনাদের প্রহরায় থাকা প্রদেশটি যেন আবারও তালেবানদের দখলে চলে না যায়।

ন্যাটোর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান থেকে এক কর্মকর্তা জানান, গত মাস পর্যন্ত চলতি বছরেই ৭ হাজার আফগান নিরাপত্তারক্ষী নিহত হয়েছে, আহত হয়েছে আরও ১২ হাজার। ২০১৪ সালের তুলনায় নিহত ও আহতের হার ২৬ শতাংশ বেশি। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। তালেবানদের হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া ও আহত আফগান সেনারা জানিয়েছেন, তারা আগের চাইতে উন্নত ও অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত বাহিনীর সঙ্গে লড়ছেন। এর আগে তালেবানরা এতো সুশৃঙ্খল ও  ‍সুসজ্জিত ছিল না।

আফগান নিরাপত্তারক্ষীরা সমস্যায় পড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ অভিযানের সেনাদের আহত হওয়ার ঘটনাও বাড়ছে। ৪ নভেম্বর থেকে আফগানিস্তানে সহযোগিতায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোটের ৪ সদস্য আহত হয়েছে। মার্কিন সেনাবাহিনীর কর্নেল মাইকেল লেহর্ন জানিয়েছেন, এসব বিশেষ সেনারা হেলমান্দে আফগান বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও উপদেশ দেওয়া এবং সহযোগিতা করার জন্যই আছে।

২০১০ সালে মার্কিন ও আফগানদের সম্মিলিত বাহিনী

অক্টোবরে এক গোপন বৈঠকে আফগানিস্তানের যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রবাহিনীর কমান্ডার জেনারেল জন এফ, ক্যাম্পবেল আফগান বাহিনীর সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, যেভাবে বাহিনীকে পরিচালনা করা দরকার তা আফগান কর্মকর্তারা করছে না এবং কর্মকর্তাদের মধ্যেই শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। তিনি বলেন, তালেবানরা দশফুট লম্বা নয়। তালেবানদের চেয়ে আফগান বাহিনীর অস্ত্রশস্ত্র বেশি রয়েছে। তাদের প্রশিক্ষণ আধুনিক।

হেলমান্দ প্রদেশ সুরক্ষিত করার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দেন ক্যাম্পবেল। তিনি বলেন,  আরও সময় ও সুযোগ তৈরি করতে আমি আরও বেশি করে নিজের বিশেষ বাহিনীর সদস্যদের ব্যবহার করব।

২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আফগানিস্তান থেকে ৩০ হাজার সেনা প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়ার পর হেলমান্দ ছিলো মিত্র বাহিনীর কাছে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ। এ বছরের শেষ দিকে এসে হেলমান্দ প্রদেশ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ শুরু হয়েছে। তালেবানসহ আইএস  ধীরে ধীরে উত্তরের দিকে শক্তি বাড়াছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনী লড়াইয়ে সরাসরি অংশগ্রহণ না করার সুবিধা নিচ্ছে এ দুই সংগঠন। বিদেশি বাহিনীর এ সিদ্ধান্তে আফগানিস্তানে সামরিক ও রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে।

এছাড়া দেশটির সরকারও রয়েছে নানা সমস্যায়। অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে, বেকারত্বের উচ্চ হার ও দুর্নীতি বেড়ে চলেছে। প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানির প্রশাসনে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, নীতি নিয়ে মতবিরোধ ও নেতৃত্বের সংঘাত পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে। মন্ত্রীসভা এখনও অপূর্ণ, নেই কোনও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এদিকে পাকিস্তানে তালেবান ও আইএসের বিরুদ্ধে অভিযানের কারণেও বিদেশে প্রশিক্ষিত যোদ্ধারা আফগানিস্তানে প্রবেশ করছে।

গত গ্রীষ্মে তালেবান নেতা মোল্লা ওমরের দুই বছর আগে নিহত হওয়ার খবর আকস্মিক প্রকাশিত হলে সংগঠনটির মধ্যে বিভাজন ও নেতৃত্বের সংকট দেখা দেয়ে। তালেবানদের দলীয় কোন্দলের কারণে আশরাফ ঘানির শান্তি আলোচনার উদ্যোগ আটকে যায়। নতুন নেতা আখতার মোহাম্মদ মনসুর নিজের শক্তি ও ক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে তালেবানদের শক্ত অবস্থানে নিয়ে আসতে পেরেছেন বলে মনে করেন পশ্চিমা কূটনীতিক ও বিশ্লেষকরা। সেপ্টেম্বরে তালেবানরা ক্ষমতাচ্যূত হওয়ার পর প্রথমবারের মতো এবার তারা কুন্দুজ শহর দখল করে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ও বিমান হামলার সহযোগিতায় আফগান বাহিনী তা দখল মুক্ত করে।

এখন তালেবানরা বেশ কয়েকটি প্রদেশের রাজধানীর প্রবেশ মুখের কাছাকাছি হামলা চালাচ্ছে। বছরের অন্য যেকোনও সময়ের তুলনায় শহরগুলোতে হামলা হচ্ছে বেশি। হেলমান্দের চলমান সংঘর্ষে তালেবানদের কৌশল পরিবর্তনের প্রমাণ দেয়। কুন্দুজ হাতছাড়া হওয়ার পর তালেবানরা নিজেদের কৌশল আরও উন্নত করেছে। তারা এখন সরাসরি প্রাদেশিক রাজধানী দখল করার আগে আশপাশের বেশ কিছু জেলা দখল করছে। এরপর তারা রাজধানীর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ইতোমধ্যেই তালেবানরা হেলমান্দের রাজধানীর সীমান্ত শহর লস্কর ঘাহ’র বাবাজি এলাকা দখল করেছে।

তালেবান সদস্যদের সঙ্গে যুদ্ধরত একজন স্থানীয় আফগান পুলিশ

হেলমান্দ শহরটি পাকিস্তান সীমান্তের কাছে অবস্থিত। আফিমের জন্য সবচেয়ে বেশি হেলমান্দ পরিচিতি।এই শহর দখল করলে আফিম বিক্রি করে তালেবানরা তহবিল সংগ্রহ করতে পারবে। ইতোমধ্যে তালেবানরা খনি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ‘ট্যাক্স’ সংগ্রহ করছে। এছাড়া প্রদেশটিতে রয়েছে কাজাকি ড্যাম। যেখান থেকে কান্দাহার ও হেলমান্দে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। কিছু কিছু জেলার বাসিন্দাদের বিদ্যুৎ বিল তালেবানদের কাছে দিতে হয়।

আফগান নিরাপত্তা কাউন্সিলের বৈঠকে দেশটির গোয়েন্দা প্রধান রহমতুল্লাহ নাবিল হেলমান্দকে তালেবানদের  অর্থের উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পাকিস্তানের সঙ্গে তালেবান নিয়ে শান্তি আলোচনায় আশরাফ ঘানির উদ্যোগের পরে নাবিল পদত্যাগ করেন।ওয়াশিংটন পোস্টের দেওয়া তথ্য অনুসারে আফগান বাহিনীর প্রধান জেনারেল কাদেম শাহ শাহীম জানান, সেনা সংখ্যা কম ও নতুন সেনা না থাকায় হেলমান্দে সামরিক ক্ষতি হয়েছে। তিনি জানান, হেলমান্দে আফগান বাহিনীর প্রায় ৪০ শতাংশ সামরিক যান ভঙ্গুর। সামরিক বাহিনীর মধ্যে নেতৃত্বের সংকটও রয়েছে বলে জানান তিনি।

মার্কিন সেনাবাহিনীর শীর্ষ মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল উইলসন শফনার এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, মার্কিন বাহিনী আফগানিস্তানের প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও সহযোগিতা করতেই আছে। তালেবানদের সঙ্গে যুদ্ধে নেতৃত্বে রয়েছে আফগানরাই। কিন্তু আফগানিস্তানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারাও ভাবতে শুরু করেছেন যে, শুধু তারা লড়াই করে তালেবানদের সঙ্গে জয়ী হওয়া সম্ভব না।

যতই লড়াই দীর্ঘায়িত হচ্ছে তাতে করে দীর্ঘ মেয়াদি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে। আফগান কর্মকর্তাদের ক্যাম্পবেল বলেছেন, ‘হেলমান্দের পতন আমি মেনে নেব না। কিন্তু আমি আপনাদের লড়াই করাতে পারব না। আমাদের চাইতে এটা বেশি আপনাদের চাইতে হবে।’

/এএ/বিএ/

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ