চীনে ‘লাভ হোটেল’ যেভাবে বদলে দিচ্ছে ভালোবাসার ধ্যানধারণা

আরশাদ আলী১৭:২৫, জানুয়ারি ১৪, ২০১৬

ওপার বাংলার নন্দিত গায়ক কবীর সুমন সেই কবেই গেয়েছেন, ‘রাস্তার রং পাল্টায় একদিন/ ধারা পাল্টায় মাও সে তুং এর চীন’...। সত্যিই দিনকে দিন বদলে যাচ্ছে চীন। লং মার্চ আর লাল পতাকার দিনগুলো পেরিয়ে চীন আজ বিশ্বের এক আগ্রাসী বাজার যেন। যেমন বিশ্বজুড়ে বিক্রি করে, তেমনি নিজ দেশেও রয়েছে তার অগণিত ভোক্তা।

কথিত সমাজতন্ত্রের দিন পার করে চীন এখন এক বিশাল রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদী রাষ্ট্র। ব্যক্তিখাতের বেলায়ও চীনের রমরমা বাণিজ্য। বাজারের যুগে সবই যখন পণ্য, তখন ভালোবাসা আর বাদ যাবে কেন। সেজন্যই এক সময় রক্ষণশীল হিসেবে পরিচিত চীনে প্রেমিক-প্রেমিকাদের সময় কাটানো জন্য গড়ে উঠছে লাভ হোটেল। মানুষ ছুটছে টাকা দিয়ে প্রেম কিনতে। কেননা প্রেমটা শাশ্বতই বটে!

বেইজিংয়ের একটি `লাভ হোটেল`

এখনও রক্ষণশীলতার মাত্রাবিদ্যমান থাকায় সমাজের চোখ রাঙানি এড়িয়ে নিজেদের মধ্যে একান্ত সময় কাটাতে চীনের দম্পতিরা বেছে নিচ্ছেন এসব ‘লাভ হোটেল’। এসব হোটেলে তরুণ ও বয়স্ক দম্পতিরা ঘণ্টা বা পুরো রাতের জন্য রুম ভাড়া নিতে পারে। এর মধ্য দিয়ে তারা রক্ষণশীল সমাজকে এড়িয়ে নিজের প্রেমিক কিংবা অপরিচিত কারও সঙ্গে আনন্দভাগ করে নিতে পারে। লাভজনক ব্যবসা হওয়ায় বিনিয়োগও বাড়ছে দ্রুত। আর এতে পাল্টে যাচ্ছে চীনে ভালোবাসা প্রকাশের রীতি। পাল্টে যাচ্ছে যৌনতা নিয়ে সমাজের পুরনো অবস্থান। প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান খবর দিচ্ছে, মাত্র এক দশক আগেও চীনে যেখানে বিয়ের আগে যৌন সম্পর্ক গড়ে তোলা নাগরিকের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৫ শতাংশ, এখন তা ৭০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

‘লাভ হোটেল’ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে চীনের প্রেরণা জাপান। প্রায় এক দশক ধরে জাপানে কয়েক ট্রিলিয়ন মূল্যের লাভ হোটেল গড়ে উঠেছে। ধারণা করা হয় প্রায় ৩০ হাজার লাভ হোটেল রয়েছে দেশটিতে। ফলে জাপানকে বিশ্বের হোটেল রাজধানী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জাপানের ধারাবাহিকতায় এখন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশ চীনও ধীরে ধীরে এই লাভ হোটেল বাণিজ্যের দিকে ঝুঁকছে। দেশটির উদ্যোক্তরা মনে করছেন এতে দেশের যৌন রীতি পাল্টে যেতে পারে।

চীনের একটি `লাভ হোটেল` কক্ষ

২০০৮ সালে দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিশের শহর ন্যানিংয়ে 'প্রথম লাভ' হোটেল গড়ে উঠেছিল।  এরপর দ্রুতই লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট (প্রথম দেখায় ভালোবাসা) কিংবা উই লাভ হোটেল নামে এ ধরনের কয়েকশ হোটেল গড়ে উঠেছে চীনে।

রাজধানী বেইজিংয়ে অনেকগুলো লাভ হোটেল। এগুলোর মধ্যে একটি হোটেলের রুম নম্বর ২০৪। রুমটির নাম শেক্সপিয়ার রুম। রুমের দরজায় লেখা, ‘মধ্য গ্রীষ্মের রাতের স্বপ্ন। তবে আগুন রঙের বেডরুমের ভেতরে কোথাও ওই নাট্যকার বা অন্য কোন কবি-সাহিত্যিকের কোনও চিহ্ন নাই। এর পরিবর্তে চীনের প্রেমিক যুগলকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য রয়েছে গোলাপের কার্পেট আর ফোম ভর্তি জ্যাকুজি।

রক্তিম ও গোলাপী রঙের জ্যাকুজিকে দেখিয়ে হোটেলের ২৩ বছর বয়সী মার্কেটিং ডিরেক্টর ওয়াং জিয়েন বলেন, এটা আপনার শরীরকে ম্যাসেজ করবে।

চীনের একটি `লাভ হোটেল` কক্ষ ২

ওয়াং যে কোম্পানিতে কাজ করেন তা ইতোমধ্যে ৯টি ‘লাভ হোটেল’ খুলেছে। ২০১১ সাল থেকে ইয়োহান, বেইজিং, চেঙ্গডু ও গুইয়াংয়ে এসব হোটেল গড়ে তোলে তারা। আগামী মাসগুলোতে কুনমিং ও নানজিংয়েও নতুন হোটেল খোলার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। ওয়াং বলেন, ‘এখানে প্রচুর চাহিদা রয়েছে। দেশে প্রচুর প্রেমিক রয়েছেন, তাদের প্রেমিকা প্রয়োজন। প্রতিদিন আমাদের সব রুম ভাড়া হয়ে যায়।

ইয়োহানের এক নারী উদ্যোক্তা সুন ইয়ানপিং ২০১৩ সালে প্রথম লাভ হোটেল গড়ে তুলেছিলেন। এখন তার রয়েছে ৫টি হোটেল। তার আশা ২০২০ সালের মধ্যে ১০০টি হোটেলের মালিক হবেন তিনি। সুন বলেন, ‘আমার মনে হয় মন যা বলে সে কথা আমাদের শোনা উচিত এবং সেদিকেই যাওয়া দরকার। ভালোবাসার বিষয়েও তা করা দরকার। এটাই মানুষের প্রকৃতি।

বেইজিংয়ের নামকরা এক `লাভ হোটেল`

১৯৭৬ সালে চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মহানায়ক চেয়ারম্যান মাও সে তুংয়ের মৃত্যুর পর প্রচণ্ড রক্ষণশীল চীনে বাজার অর্থনীতির দরজা খুলে যাওয়ার ধারাবাহিকতায় যৌনাচারেও এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। সম্প্রতি প্রকাশিত পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনারা দেরিতে বিয়ে করছে, অল্প বয়সে কুমারিত্ব হারাচ্ছে এবং গত দশকের তুলনায় প্রেমের সংখ্যা বেড়েছে। ১৯৮৯ সালে মাত্র ১৫ শতাংশ চীনারা বিয়ের আগে যৌন সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। আর বর্তমানে তা ৭০ শতাংশও ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম।

১৯৯০ সালে চীনে প্রথম যৌনপণ্যের দোকান খোলা হয়েছিল। এরপর এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী উদ্যোক্তা বিলিয়ন ডলারের ডিলডো সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি যৌন খেলনা উৎপাদনকারী দেশ চীন। এরপরও জাপানের তুলনায় চীনের ‘লাভ হোটেল’গুলোকে বিবর্ণই লাগবে। জাপানের হোটেলগুলোতে রয়েছে ওয়াটার স্লাইডসসহ অত্যাধুনিক সুবিধা রয়েছে।

চীনের বেশ কিছু লাভ হোটেলের ভাড়া ৫২০ ইউয়ান (৮০ ডলার)। এ টাকায় পাওয়া যায় প্লাজমা স্ক্রিনের টিভি। তবে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির অশ্লীলতাবিরোধী আইনের কারণে হোটেলে পর্নোগ্রাফি দেখা যায় না।ওয়াং চেষ্টা করছেন তার হোটেলগুলোতে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও বিলাসদ্রব্য আরও বাড়ানোর। তিনি বলেন, ‘জাপানের হোটেলগুলো শুধুই সঙ্গমের জন্য ব্যবহৃত হয়। কিন্তু আমরা শুধু সঙ্গমের কোনও স্থান বানাতে চাই না।। আমরা চাই একটা রোমান্টিক পরিবেশ তৈরি করতে। আমরা চাই দম্পতিদের জন্য স্বাস্থ্যকর ও রোমান্টিক অভিজ্ঞতা দিতে।

/এএ/বিএ/

লাইভ

টপ