behind the news
Vision  ad on bangla Tribune

শরণার্থী শিশুদের দ্বীপান্তরিত জীবনের আর্তনাদ

ফাহমিদা উর্ণি১৯:১১, জানুয়ারি ২৮, ২০১৬

দেড় বছর আগের কথা। মিয়ানমারে নানা দমনপীড়নের শিকার হয়ে উন্নত জীবনের আশায় পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া পাড়ি জমায় ১০ বছর বয়সী মিজবাহ আহমেদ। পাচারকারীদের একটি নৌকায় করে অস্ট্রেলিয়ায় যাত্রা শুরু হয় তার। শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া পৌঁছালেও তাদের ঠাঁই হয় প্রশান্ত মহাসাগরের বিচ্ছিন্ন দ্বীপরাষ্ট্র নাউরুতে। সেখানেই ১৮ মাস ধরে আটক আছে মিজবাহ। এখন তার বয়স ১২ বছর। কেবল মিজবাহই নয়, নাউরুতে অস্ট্রেলিয়ার পৃষ্ঠপোষকতায় চলা শরণার্থী আবেদন প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রটিতে অনেক মাস ধরে কিংবা অনেক বছর ধরে আটক আছে আরও বেশ কয়েকজন শরণার্থী শিশু। মিজবাহ জানায়, নাউরুর মতো এতো বাজে জায়গা সে আগে দেখেনি।

অস্ট্রেলিয়ার বিচ্ছিন্ন দ্বীপের সেই শরণার্থী আটক কেন্দ্র

নাউরুতে অবস্থিত সেই নির্জন শরণার্থী আটক কেন্দ্রটি নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন। মাত্র ২১ বর্গ কিলোমিটার কিংবা ৮ বর্গ মাইলের ছোট্ট একটি দ্বীপরাষ্ট্র নাউরু। সেখানে অবস্থিত শরণার্থী আটক কেন্দ্রটিতে থাকা বর্তমান ও সাবেক বন্দিদের সঙ্গে আলাপের মধ্য দিয়েই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন সিএনএন-এর প্রতিনিধি। এতে উঠে এসেছে শিশুদের এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপান্তরিত শরণার্থী জীবনের বিপন্নতার কথা। উঠে এসেছে ওপর যৌন নিপীড়ন আর শারীরিক সহিংসতার কথা। তাদের বন্দিত্ব, অসহায়ত্ব, আত্মহত্যার প্রবণতার কথা।

যখন থেকে শুরু

বিভিন্ন দেশ থেকে নৌকায় করে আসা শরণার্থীদের ঢলকে সামাল দিতে গোটা ইউরোপ যখন হিমশিম খাচ্ছে সেসময় বহুবছরের বিতর্কিত নীতিমালা বহাল রেখেছে অস্ট্রেলিয়া। নৌকায় করে আসা শরণার্থীদের আটকানো এবং পরে তাদের নাউরু দ্বীপে স্থানান্তর করে আসছে দেশটি। 

২০১২ সাল থেকে নৌকায় করে আসা শরণার্থীদের প্রক্রিয়াকরণ শেষ করার জন্য কখনও নাউরু ক্যাম্প আবার কখনও পাপুয়া নিউগিনির মানুস দ্বীপে পাঠানো হয়। অস্ট্রেলিয়া সরকারের দাবি, নৌকায় করে চলে আসলেই যে অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী হয়ে যাওয়া যাবে না সে কথাটুকু সম্ভাব্য আশ্রয়প্রার্থীদের বোঝাতেই তারা এ পদক্ষেপ নিয়ে থাকেন।

অস্ট্রেলিয়া সরকারের রেকর্ড অনুযায়ী ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ নাউরুতে ৫৩৭ জনকে আটক রাখা হয়েছে। এরমধ্যে ৬৮ জন শিশু। আটকদের জাতীয়তা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়; তারা ইরান, আফগানিস্তান, ইরাক ও সিরিয়ার মতো যুদ্ধ বিধ্বস্ত ও সংঘাতপূর্ণ দেশগুলো থেকে আসা। অস্ট্রেলিয়া আর বেসরকারি ব্যক্তিদের সহায়তায় আটক কেন্দ্রটি পরিচালনা করে নাউরু সরকার।

এ যেন এক মধ্যযুগীয় কারাগার

বন্দি শিশু শরণার্থীরা বর্ণনা করেছেন তাদের বিপন্ন দিনযাপনের কথা। তারা ওই শরণার্থী কেন্দ্রকে একটি কারাগারের মতো করেই দেখেন। শিশু শরণার্থীরা জানায়, বেড়ার ভেতরে জীবন যাপন করতে হয় তাদের। শিবির থেকে বের হওয়ার সময় কিংবা শিবিরে ঢোকার সময় তাদের তল্লাশির শিকার হতে হয়। এমনকি তারা স্কুলে যাওয়ার সময়ও ছাড় দেওয়া হয় না। ১৮ বছর বয়সী এক নারী নাম প্রকাশ না করে সিএনএনকে বলেন, ‘উন্নত জীবন ও ভবিষ্যতের আশা করাটা অন্যায় কিছু নয়। আমাদেরকে কারাবন্দি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।’

আটককেন্দ্রে ৮২৭ দিন ধরে থাকা এক শিশু

বছরব্যাপী নাউরুর উষ্ণ আবহাওয়ার মধ্যে তাঁবুতে দিন কাটাতে হয় শরণার্থীদের। তাঁবুতে ইদুর আর তেলাপোকার উপদ্রব থাকারও অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ। মিজবাহ জানায়, তেলাপোকার কারণে তাদের রাতে ঘুম আসে না।

আরেক সাবেক বন্দির অভিযোগ, নিরাপত্তারক্ষীরা সারাক্ষণ তাদের কড়া নজরে রাখেন। শিক্ষাগত সুবিধার কমতি থাকায় কিশোররা হতাশায় ভুগছে এবং কারও কারও মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দিচ্ছে। এছাড়া শরণার্থী ক্যাম্পটিতে যৌন নিপীড়ন ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়া সরকারের করা এক প্রতিবেদনেও যৌন নিপীড়ন আর শারীরিক সহিংসতার অভিযোগ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। তবে অস্ট্রেলিয়া সরকারের দাবি, আটক কেন্দ্রটির নিরাপত্তা রক্ষা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নাউরু সরকারের।

অস্ট্রেলিয়া সরকারের নিজস্ব মানবাধিকার কমিশনের ২০১৪ সালের প্রতিবেদনেও নাউরু ক্যাম্পে শরণার্থী শিশুদের হতাশার কথা তুলে ধরা হয়। বলা হয়, নাউরুর শিশুরা শারীরিক ও মানসিকভাবে অতিরিক্ত মাত্রায় দুর্বল হয়ে পড়েছে। প্রতিবেদন প্রকাশের চার সপ্তাহের মধ্যে নাউরু থেকে শিশু ও পরিবারগুলোকে অস্ট্রেলিয়ায় স্থানান্তরের সুপারিশ করা হয়। 

আটককেন্দ্রে ৯০৪ দিন ধরে থাকা শরণার্থী শিশুশরণার্থী আটক কেন্দ্রে সাংবাদিকদের প্রবেশেও নানা কড়াকড়ি আরোপ করে রেখেছে অস্ট্রেলিয়া ও নাউরু সরকার। আটক কেন্দ্রটিতে প্রবেশের জন্য প্রতি আবেদন বাবদ ৮ হাজার ডলার অফেরতযোগ্য ভিসা ফি নিয়ে থাকে নাউরু সরকার। দেশটির সরকারের দাবি, সাংবাদিকদের অবাধে প্রবেশ করতে দিলে তাদের ক্যামেরা দেখে শরণার্থীরা বিশৃঙ্খল হয়ে পড়তে পারে।
আর অস্ট্রেলীয় আটক কেন্দ্রগুলোতে পরিদর্শনের ক্ষেত্রে দেশটির অভিবাসন বিভাগের একটি ফর্ম পূরণ করে আসতে হয়। অভিবাসন বিভাগের শর্ত অনুযায়ী, কোনও সাংবাদিক বন্দিদের সাক্ষাৎকার নিতে পারবে না এবং তারা যেসব তথ্য লিপিবদ্ধ করবে তা দেখাতে হবে। তবে সেসব শর্ত না মেনেই সাবেক ও বর্তমান শরণার্থীদের সাক্ষাৎকার নেয় সিএনএন।

উন্মুক্ত করার ঘোষণার পরও বন্দিদশা 

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত অক্টোবরে জোর করে শরণার্থী আটকের প্রবণতা বন্ধের ঘোষণা দেয় নাউরু সরকার। একইসঙ্গে আশ্রয়প্রার্থীদের চলাচল উন্মুক্ত করে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। আর চলতি বছরের শুরুতে আশ্রয়প্রার্থী শিশুদের জন্য স্কুল খোলার খোলার ঘোষণা দেয় অস্ট্রেলিয়া সরকার। এরপরও শরণার্থীরা এখনও বন্দি জীবন যাপন করছে। অস্ট্রেলীয় সরকার ঘোষিত স্কুলটি বন্ধ হয়ে গেছে এবং শিক্ষার্থীদের নাউরুর সরকারি স্কুলে যাওয়ার জন্য বলা হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, স্থানীয় স্কুলগুলোতে তাদের নানা হয়রানির শিকার হতে হয়। আর সেকারণে অনেকেই স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।

অন্ধকারের বন্দি জীবন নিয়ে বন্দি শিবিরেই নিজেদের স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিতে শুরু করেছে সেই শিশুরা, যাদের ছিল অনেক বড় হওয়ার স্বপ্ন। যারা দেশ ছেড়েছিল ভালো থাকার আশায়। সূত্র: সিএনএন

/এফইউ/বিএ/

 

 

Global Brand  ad on Bangla Tribune

লাইভ

IPDC  ad on bangla Tribune
টপ