যে মেয়েকে ৩০ বছর বন্দি রেখেছিলেন বাবা

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৪:০৪, জানুয়ারি ৩০, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২১, জানুয়ারি ৩০, ২০১৬

৩৩ বছর বয়সী নারী কেটি মরগ্যান ডেভিস। জীবনের প্রথম ৩০ বছর কেটেছে চার দেয়ালের আড়ালে। আর তাকে এমন বন্দিদশায় রেখেছিলেন স্বয়ং তার বাবা অরবিন্দ বালাকৃষ্ণান; যিনি নিজেকে মাওবাদী বলে পরিচয় দিতেন, ঐশ্বরিক ক্ষমতা থাকার দাবি করতেন। আর সেই ক্ষমতার দোহাই দিয়ে কেবল মেয়েকে বন্দি করেই ক্ষান্ত হননি, চালিয়েছেন শিশু নিপীড়ন, যৌন নিপীড়ন ও নানা নৃশংসতা। মেয়েকে বন্দি করে রাখা এবং দুই অনুসারীর ওপর ক্রমাগত যৌন নিপীড়ন চালিয়ে যাওয়ার দায়ে শুক্রবার অরবিন্দকে ২৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। লন্ডনের সাদার্ক ক্রাউন কোর্টে এই মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। আর বাবার সাজা ঘোষণার পর প্রথমবারের মতো মিডিয়ায় নিজের পরিচয় প্রকাশ করেন মরগ্যান ডেভিস। বর্ণনা করেন বাবার বিকারগ্রস্ত আচরণের কথা।

অরবিন্দ বা কমরেড বালা ১৯৭০ এর দশকে লন্ডনে ‘ওয়ার্কার্স ইনস্টিটিউট অব মার্ক্সিজম-লেনিনিজম-মাও সে তুং থট’ নামে একটি কথিত কমিউনিস্ট সংঘ স্থাপন করেন। তিনি তার অনুসারীদের মধ্যে নাকি এই বিশ্বাস ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন যে, তিনি তাদের মনের কথা পড়তে পারেন। যদি তাকে অমান্য করা হয় তাহলে তিনি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটিয়ে দিতে পারেন।

কথিত মাওবাদী নেতা অরবিন্দ

তার বাসায় প্রতিষ্ঠিত কালেক্টিভ বা যৌথাবাসে এক সঙ্গে থাকতেন অনেকে। যদিও শুরুতে কমরেড বালা নিজেকে মাও সে তুং এর অনুসারী বলে দাবি করতেন, পরে তার চিন্তাভাবনা সেখান থেকে বহু দূরে সরে আসে।

বেশিরভাগ অনুসারী তাকে ছেড়ে চলে যান। যারা থেকে যান তাদের বেশিরভাগই ছিলেন নারী। এদেরকে কমরেড বালা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে অভিযোগ করা হয়। অন্তত দুজন নারী অনুসারীকে ‘বিশুদ্ধ’ করার নামে কমরেড বালা তাদের ওপর যৌন নিপীড়ন চালান। এছাড়া যৌথাবাসে থাকা মানুষদের ওপর নানা সহিংসতা ও বিকৃত মানসিকতার সন্ত্রাস চালাতেন কমরেড বালা। জ্যাকি নামের একটি ইলেক্ট্রনিক মেশিন ব্যবহার করে তাদের মেরে ফেলারও হুমকি দেওয়া হতো। কমরেড বালা হুমকি দিতের যে সীমারেখা পার হলেই ওই যন্ত্র তাদের মেরে ফেলবে।

মরগ্যান জানান, বাবা তাকে ৩০ বছর পর্যন্ত কালেক্টিভে আটকে রেখেছিলেন। বাড়ি থেকে বের হতে চাইলে ফ্যাসিবাদী ডেথ স্কোয়াড তাকে মেরে ফেলতে পারে বলে ভয় দেখাতেন। মরগ্যানকে অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে খেলতে দেওয়া হতো না, কখনও কখনও পেটানো হতো। চার দেয়ালের ভেতর বন্দি মরগ্যানের কাছে খাটের নিচে ঘুরেফিরে বেড়ানো ইঁদুরদের বন্ধু বলে মনে হতো। মরগ্যান জানান, তার মায়ের নাম সিয়ান ডেভিস। তিনিও কমরেড বালার অনুসারী ছিলেন এবং ওই কমিউনে থাকতেন। পরে আরেক অনুসারীকে বিয়ে করেন বালা। মরগ্যান জানান, তাকে বলা হয়েছিল তার মা মারা গেছেন। পরে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে কমিউনের জানালা দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন সিয়ান। মারা যাওয়ার আগে তিনি মরগ্যানকে জানান তিনিই তার মা।

কেটি মর্গান

২০১৩ সালে ৩০ বছর বয়সে বাড়ি থেকে পালান মরগ্যান। তাকে যারা আশ্রয় দিয়েছিলেন তারা আদালতকে জানান, মরগ্যান ছয় বছরের শিশুর মতো আচরণ করতো। রাস্তা পার হওয়া কিংবা ঘরের কাজ কিভাবে করতে হয় তা তিনি জানতেন না।

মরগ্যান জানান, স্টালিন, মাও কিংবা সাদ্দাম হোসেনের মতো হতে চাইতেন কমরেড বালা। বাড়িতে তাদের নিয়ে কোনও সমালোচনা করা নিষিদ্ধ ছিলো। কখনও কখনও তিনি আবার সব একনায়কদের মধ্যে সেরা হতে চাইতেন। কখনও কথনও মাওকে নিজের শত্রুও ভাবতেন। সবমিলিয়ে তার বাবার মধ্যে এক ধরনের আত্মমুগ্ধতাজনিত মানসিক বিকৃতি ছিলো বলে জানান মরগ্যান।

বাবাকে ভুল স্বীকার করে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মরগ্যান ডেভিস। বাবাকে ক্ষমাও করে দিয়েছেন বলে জানান তিনি। নেলসন ম্যান্ডেলার বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, 'ম্যান্ডেলা বলতেন, যদি তুমি ঘৃণা, ক্রোধ আর তিক্ততা নিয়ে কারাগার ত্যাগ করো তবে মনে বুঝে নিও তুমি তখনও কারাগারেই আছো।' সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

/এফইউ/বিএ/

লাইভ

টপ