যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশি নারীরা কেন সিরিয়ায় যাচ্ছে

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৮:৩৭, জানুয়ারি ৩০, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:২৭, জানুয়ারি ৩০, ২০১৬

যুক্তরাজ্য থেকে যে নারীরা সশস্ত্র সুন্নিপন্থী সংগঠন ইসলামিক স্টেটে (আইএস) যোগ দিতে গেছে, তাদের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশিরাও। কেন তারা আইএসে যোগ দিতে সিরিয়ায় যেতে উদ্ধুব্ধ হয়েছে, তা খুঁজে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে বিবিসি বাংলার তরফ থেকে। মিজানুর রহমান খানের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বাংলাদেশি নারীদের আইএসে উদ্বুদ্ধ হওয়ার কারণ। বিবিসি বাংলার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনলাইনে বিভিন্ন ওয়েবসাইটের মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ হয়ে ‘কিছু একটা করার জন্য’ই তারা সিরিয়ার পথে পা বাড়িয়েছেন। পশ্চিমা দেশগুলো মুসলমানদের সঙ্গে যথার্থ আচরণ করে না, এমন ধারণাও রয়েছে তাদের মধ্যে। তারা মনে করছে, আইএস তাদের মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করবে। কেউ কেউ আবার নিছক রোমান্টিক অভিজ্ঞতা নিতেই সেখানে যাচ্ছে।

মুসলিম নারীরা মনে করছে যে ইসলামিক স্টেটের হয়ে যুদ্ধ করতে পারলে তারা আরো ভালো মুসলিম হতে পারবেন

পূর্ব লন্ডনে বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকার একটি স্কুল- বেথনাল গ্রিন একাডেমি। দিনটি ছিলো ২০১৫ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি। অন্যান্য দিনের মতো ক্লাস চলছিলো – কিন্তু সেদিন তিনটি মেয়ে স্কুলে যায়নি। জানা যায় তারা তুরস্কের সীমান্ত পার হয়ে ইসলামিক স্টেটে যোগ দিতে সিরিয়ার পথে পা বাড়িয়েছে। তারা হচ্ছে - শামীমা বেগম, আমিরা আবাসী এবং খাদিজা সুলতানা। বয়স ১৫ থেকে ১৭। তাদের পরিবারের সদস্যরা একদিন আগেও এ বিষয়ে কিছুই বুঝতে পারেননি। আমিরার হতচকিত বাবা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘সবকিছুই খুব স্বাভাবিক ছিলো। তার চলাফেরা থেকে কিছুই বোঝা যায়নি। ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় ও শুধু বললো বাবা, আমার একটু তাড়া আছে। ও শুধু একটা টেক্সট মেসেজ পাঠিয়েছিলো- বাবা আমি একটু দূরে আছি। জোহরের নামাজ পরেই চলে আসবো। তোমরা চিন্তা করো না। কিন্তু ও আর ফেরেনি।’ এই শামীমা, খাদিজা আর আমিরার মতো ৫০ থেকে ৬০ জন নারী ব্রিটেনের গ্লাসগো থেকে ব্রিস্টল, ব্রাইটন থেকে লন্ডন এরকম বিভিন্ন শহর থেকে পাড়ি দিয়েছে যুদ্ধ কবলিত সিরিয়ায়। বিবিসি বাংলা জানাচ্ছে, সরকারি হিসেবে তাদের সংখ্যা ৫৬।

বেথনাল গ্রিন থেকে সিরিয়ায় চলে যাওয়া তিন কিশোরীর পরিবার

উগ্রপন্থা প্রতিরোধে যুক্তরাজ্যের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান – কুইলিয়াম ফাউন্ডেশন। তার একজন গবেষক নিকিতা মালিক মনে করেন, অনেক সময় নিয়ে এবং প্রচুর গবেষণার পরেই তারা ইসলামিক স্টেটে যোগ দিতে সিরিয়ায় যাচ্ছে। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, ‘পূর্ব লন্ডনের বেথনাল গ্রিন থেকে যে মেয়েগুলো গিয়েছে, তাদের একজন একশোটিরও বেশি জিহাদি ওয়েবসাইট ঘাটাঘাটি করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্রিটেনে এ ধরনের কিছু নারীর সাথে আইএসের যোগাযোগও আছে। তাদের সাথে ধর্মের বিভিন্ন বিষয়ে কথাবার্তা হয়। আলোচনা হয় সমাজে নারীর অবস্থা নিয়ে।’ তিনি মনে করেন, এই মেয়েরা মনে করছে, আইএস তাদেরকে মর্যাদা দিচ্ছে, তারাও জিহাদে সমান অংশ নিতে পারছে, তাদের কিছুটা ক্ষমতায়ন ঘটছে যা আগে কখনো ছিলো না। ‘তাদেরকে যে শুধু অস্ত্র হাতে যুদ্ধে যেতে হবে তা নয়। আগামী প্রজন্মের মুজাহিদিনকে শিক্ষিত করে তোলা এবং জিহাদিদের ভালো স্ত্রী হয়ে উঠাও তাদের ধর্মীয় একটি দায়িত্ব বলে তারা মনে করে।’ বলেন নিকিতা।

বেশিরভাগ নারীকেই রিক্রুট করা হয়েছে অনলাইনে

মেয়েদের পাশাপাশি মায়েরাও যাচ্ছেন সিরিয়ায়। এক বছরের শিশু সন্তান থেকে শুরু করে সত্তরোর্ধ বৃদ্ধ পিতাকে নিয়েও চলে গেছেন অনেকে। অনেকে গেছেন সংসার ফেলেও। কুইলিয়াম ফাউন্ডেশনের নিকিতা মালিক মনে করেন, এর মধ্য দিয়ে মেয়েরা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তারাও কোনো একটা কাজে অংশ নিতে পারছে। 'পশ্চিমা দেশগুলো ইসলামের বিরুদ্ধে লড়াই করছে এবং ইসলামিক স্টেটের হয়ে যুদ্ধ করতে পারলে তারা ভালো মুসলিম হতে পারবে। একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তারা রাখতে পারবে সমান ভূমিকা। এছাড়াও আরো কিছু বিষয় আছে যেগুলো তাদেরকে ইসলামিক স্টেটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যেমন তারা হয়তো মনে করছে সমাজে বা কমিউনিটিতে তারা নিজেদেরকে ঠিকমতো মানাতে পারছে না’।

সন্তানরা ইন্টারনেটে কি করছে তার ওপর নজর রাখা খুবই জরুরি
গবেষকরা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, আইএসে বেশকিছু নারী যোদ্ধা আছে যাদের কাজ অনলাইনের মাধ্যমে নতুন নতুন মেয়ে সংগ্রহ করা। টুইটারের মতো সামাজিক নেটওয়ার্কে এই অভিযান চালায় তারা। তাদেরকে বলা হয় কিভাবে পুরোটা পথ পাড়ি দিতে হবে, পিতামাতাকে লুকিয়ে কিভাবে অর্থ পরিশোধ করতে হবে, বিমানের টিকেট কিভাবে এবং কোন ট্রাভেল এজেন্টের কাছ থেকে কাটতে হবে, যুক্তরাজ্যে কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। নিকিতা মালিক বলেন, ‘তাদের বিয়ের কথাও আগাম বলে দেওয়া হয়। মেয়েরা ভালো করেই জানে তারা যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছাবে তাদেরকে বিয়ে করা হবে। আগে থেকেই তাদেরকে ধারণা দেওয়া হয় সে কাকে বিয়ে করবে, তার ওই স্বামী কেমন,  ওখানে তার ভূমিকা কী হবে- এসব বিষয়ে তাদেরকে একটা প্রাথমিক ধারণা দেওয়া হয়’।

উগ্রপন্থার ব্যাপারে বাংলাদেশিদেরকে সচেতন করতে লন্ডনে একটি বাংলা টিভি চ্যানেলে অনুষ্ঠান করেন হেনা আহমেদ। তার আশঙ্কা, এই প্রজন্মের অভিভাবকরা মোটেও সচেতন নন। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন,  কোন কোন ক্ষেত্রে পিতামাতারা নিজেরাই তাদের ছেলেমেয়েকে আইএসের ভিডিও দেখান। কারণ তারা মনে করেন পশ্চিমা বিশ্ব ইসলামের সাথে অন্যায় করছে এবং সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যে তারা তাদের সন্তানদেরকে আইএসের জন্যে প্রস্তুত করছেন। তিনি জানান , বাংলাদেশী নন এরকম একটি মেয়ে সিরিয়ায় যাওয়ার জন্যে বিমানে উঠার পর তাকে নামিয়ে আনা হয়। তার পিতামাতার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। তখন দেখা গেছে মেয়েটি ইউটিউবে যেসব ভিডিও দেখেছে মা বাবাই সেগুলো তাকে দেখিয়েছেন। এর বাইরে বাবা-মার অসেচতনার প্রসঙ্গও আলোচনা করেন হেনা।

সোশাল ওয়ার্কার হেনা আহমেদ

হেনা আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশি পরিবারগুলোতে পিতামাতারা তাদের সন্তানের ওপর নজর খুব একটা রাখেন না এবং সেই নজর রাখার ক্ষমতাও তাদের নেই। কারণ ছেলেমেয়েরা ইন্টারনেটে কি করছে সে বিষয়ে বাবা মায়ের কোনো ধারণা নেই। ইন্টারনেট সম্পর্কে তাদের দক্ষতাও নেই বললেই চলে। ছেলেমেয়েরা বেডরুমে সারা রাত ল্যাপটপ নিয়ে বসে থাকে। জানতে চাইলে তারা বলে যে পড়াশোনা করছে। বাবা মায়েরাতো সেটাই চান। ফলে তাদের পক্ষে এটা জানা সম্ভব না যে ছেলেমেয়েরা আসলে সেখানে কি করছে’। সূত্র: বিবিসি বাংলা

/বিএ/

লাইভ

টপ