নাঙ্গেলি: স্তনকরের বিরুদ্ধে কেরালার এক লড়াকু নারী

Send
উম্মে রায়হানা
প্রকাশিত : ১৩:০৯, মার্চ ০৮, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৫৭, মার্চ ০৮, ২০১৬

প্রতি বছরই ঘুরে ঘুরে আসে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। নারীর অধিকার আন্দোলনের ইতিহাসকে স্মরণ করতে বিশ্বব্যাপী এই দিবসটি পালিত হয় নানা আয়োজনে। ভারতের কেরালা রাজ্যে নারী দিবসে এমন এক নারীকে স্মরণ করা হয় যিনি ছিলেন নিম্নবর্ণের নারীর আত্মমর্যাদা আদায়ের সংগ্রামের পথে একাকী সৈনিক। নিজের জীবন দিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নিম্নবর্ণের নারীর সম্মান। এবারের নারী দিবসেও লড়াকু নারী নাঙ্গেলিকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছেন কেরালার মানবাধিকার ও নারী অধিকার কর্মীরা।  
সে অনেককাল আগের কথা। প্রায় ২০০ বছর আগে কেরালার ত্রাভানকোরের রাজা প্রজাদের ওপর আরোপ করতেন অদ্ভুত সব কর। বিশেষ করে নিম্নবর্ণের ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শ্রমজীবী মানুষের করের টাকায় সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলতেন এই রাজারা।
সে সময় ওই রাজ্যের নারীপুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্য অলঙ্কার পরা, পুরুষের জন্য গোঁফ রাখা ও নারীর জন্য ঊর্ধ্বাঙ্গে পোশাক পরার জন্য কর দিতে হতো। নারীর স্তনের আকার অনুযায়ী নির্ধারিত এই করকে বলা হতো মুলাক্কারাম।
নিম্নবর্ণের মানুষকে অসম্মানিত করতেই প্রচলিত হয়েছিল এই আইন। ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত থাকলে নিম্নবর্গ ও আদিবাসীদের সহজে চিহ্নিত করা যেতো। ফলে শরীর ঢাকতে হলে, অর্থাৎ সমাজের সাধারণ বা উঁচুতলার মানুষের মত পরিচ্ছদ নিতে হলে বাড়তি কর দিয়ে কিনে নিতে হতো আত্মমর্যাদা।
নাঙ্গেলি ছিলেন চেরথালা শহরের বাসিন্দা। সে শহরের তরুণীরা নিজেদের রূপলাবণ্য নিয়ে বিব্রত হয়ে থাকতেন। রাজার আদেশের বিরুদ্ধে যাওয়ার সাহস তাদের কারোরই ছিল না। ফলে সৌন্দর্য তাদের জন্য অভিশাপ হয়ে দেখা দিতো।

কিন্তু নাঙ্গেলি ছিলেন অন্যরকম। তার সম্পর্কে যে সব গল্পকথা শোনা যায়, তাতে বলা হয়, ৩৫ বছর বয়েসেও নাঙ্গেলি ছিলেন অপূর্ব সুন্দরী। কিন্তু নিজের রূপ ও সুষমাকে অভিশাপ বলে মেনে নিতে রাজি ছিলেন না তিনি। দরিদ্র পরিবারের ভাতকাপড় জোগাতে তাকে প্রায়ই ঘরের বাইরে যেতে হতো।

ফলে তার মুলাক্কারাম বা স্তনকর জমে যায় অনেক। রাজার লোকেরা বারবার তার বাড়ী গিয়ে করের টাকার জন্য তাগাদা দিতে শুরু করে।কিন্তু দরিদ্র পরিবারের নাঙ্গেলি এতগুলো টাকা একসঙ্গে দিতে পারেন না। তিনি কর সংগ্রহকারীদের অপেক্ষা করতে বলেন।মেঝেতে একটা কলাপাতা বিছিয়ে একটি প্রদীপ জ্বালেন। গৃহদেবতার সামনে প্রার্থনা করেন ও প্রার্থনা শেষ করে কাটারির কোপ দিয়ে একে একে নিজের দুই স্তন কেটে ফেলেন। এরপর কলাপাতায় মুড়ে স্তনগুলো তুলে দেন রাজার পেয়াদাদের হাতে।      

স্তন কেটে ফেলায় অতিরিক্ত রক্তপাতে নাঙ্গেলির মৃত্যু হয়। শেষকৃত্যের সময় নাঙ্গেলির প্রেমময় স্বামী নিজেও ঝাপিয়ে পড়েন জ্বলন্ত চিতায়। ভারতের ইতিহাসে কোন পুরুষের স্ত্রীর সঙ্গে সহমরণে যাওয়ার ঘটনা ওই প্রথম, ওই শেষ।

এই ঘটনার কথা লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে পুরো ভারতে। ক্ষোভে ফেটে পড়ে মানুষ। তুলে নেওয়া হয় অন্যায় স্তনকরের নিয়ম।    

নাঙ্গেলির এই আত্মদানের ইতিহাস নিজের ক্যানভাসে তুলে এনেছেন কান্নরভিত্তিক চিত্রকর টি মুরালি। মুরালি নাঙ্গেলির একাধিক ছবি এঁকেছেন ক্যানভাসের ওপর অ্যাক্রেলিকে। নাঙ্গেলি ছাড়াও নিম্নবর্গের মানুষের লড়াই তার আঁকার প্রধান উপজীব্য হিসেবে ছিল। কিন্তু নাঙ্গেলির ছবি এঁকে ব্যপকভাবে সমালোচিতও হয়েছেন তিনি। ব্রাহ্মণ্যবাদীদের তোপের মুখে পড়েছেন তিনি।

মুরালি বলেন, ‘চেরথালার সবাই নাঙ্গেলির গল্প জানে। বছরের পর বছর ধরে লোকের মুখে মুখে প্রচলিত রয়েছে তার নির্ভীক আত্মদানের ইতিহাস।’

নাঙ্গেলির ছবি আঁকা শুধুই শিল্পের জন্য নয়, বরং নারীর গৌরবময় লড়াইয়ের ইতিহাস ধরে রাখার জন্যেও। মুরালি মনে করেন, ভারত সরকারের উচিত নাঙ্গেলির স্মরণে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা। 

নাঙ্গেলির কোন সন্তানাদি ছিল না। তার বংশধরদের মধ্যে বেঁচে আছেন তার বোনের নাতনি লীলা আম্মা(৬৭)। লীলা বলেন। ‘আমরা বড়দের মুখে আমাদের এই পূর্বনারীর সাহস ও অপূর্ব সৌন্দর্যের কথা শুনে শুনে বড় হয়েছি।’

গবেষক অজয় সরকার বলেন, ‘কেরালার মানুষ কিছু কিছু জানে। কিন্তু পুরো দেশের মানুষ নাঙ্গেলির এই সাহসী অবদানের কথা ভুলতে বসেছে। মানুষের অধিকার আন্দোলনে, নারীর মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনে, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের সৈনিকদের সঙ্গে নাঙ্গেলির নাম যুক্ত হওয়া উচিত।’ সূত্র – দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া, কন্টেন্টরাইটার ডট ইন, ভেগাবোম্ব 

/ইউআর/বিএ/ 

আপ-/এফইউ/

লাইভ

টপ