behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

নারী দিবসের ঐতিহাসিক পরম্পরা আর দেশে দেশে নারীবিদ্বেষী আইন

উম্মে রায়হানা১৮:১৮, মার্চ ০৮, ২০১৬

নারী ভোটাধিকার আন্দোলনের কর্মীরা, ওয়াশিংটন, ১৯১০আন্তর্জাতিক নারী দিবসের ইতিহাস সম্ভবত অজানা নেই কারোরই। বেতনভাতা ও কর্মঘণ্টার ক্ষেত্রে লৈঙ্গিক বৈষম্য ও শ্রমশোষণের প্রতিবাদে নারী শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও প্রাণহানির ঘটনা ও পরবর্তী সময়ে নারীর মানবাধিকার আন্দোলনের সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এসেছে এই দিবসটি। তবে নারী দিবসের মতো করে নারীর ইতিহাস মাস ততোটা পরিচিত নয়। মূলত আশির দশকে শুরু হয় ইতিহাসে নারীর অবস্থা, অবস্থান, রূপ বর্ণনা অর্থাৎ উপস্থাপন কেমন তা পুনঃপাঠ করার চর্চা ও প্রবণতা। নারীর ইতিহাস আলাদা কিনা বা নারীর ইতিহাস বলে পৃথক ইতিহাসের পাঠ প্রয়োজন কিনা সে সম্পর্কেও আলোচনা ও চর্চা শুরু হয় সেই সময়।
ফেব্রুয়ারি মাসকে যেমন বলা হয় ব্ল্যাক হিস্টরি মান্থ বা কৃষ্ণাঙ্গদের ইতিহাসের মাস, মার্চ মাসকে তেমনিভাবে নির্দিষ্ট করা হয় উইমেন’স হিস্টরি মান্থ হিসেবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ৮ মার্চ নারী দিবসকে সামনে রেখে ১৯৮০ সালের মার্চ মাসের ২ থেকে ৮ তারিখকে নারীর ইতিহাস সপ্তাহ ঘোষণা করেন। সেই ঘোষণায় তিনি বলেন, ‘নারীর অবদান প্রায়শই উল্লেখ করা হয় না, চোখ এড়িয়ে যায়। কিন্তু আজকের আমেরিকাকে গড়ে তোলার পেছনে অর্জন, নেতৃত্ব, সাহস, ভালোবাসা- সবকিছুতেই নারীর অংশগ্রহণ রয়েছে।’
সে সময় নারীবাদীদের পক্ষ থেকে আওয়াজ ওঠে, ‘নারীর ইতিহাস নারীর অধিকার।’ কেননা ততদিনে বিশ্বজুড়ে নারীবাদীরা এই উপলব্ধিতে পৌঁছে গিয়েছিলেন যে ইতিহাসে নারীর উপস্থাপন অত্যন্ত পুরুষতান্ত্রিক, নিতান্তই একপেশে, বিদ্বেষমূলক ও প্রতারণামূলকও। ফলে প্রয়োজন পড়ে ইতিহাসে নারীর অবদানকে পুনরায় পাঠ করার, খুঁড়ে দেখার। এরপর ১৯৮৬ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১৪টি রাজ্যে মার্চকে নারীর ইতিহাসের মাস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

ভোটাধিকার আন্দোলন এবং নারী আন্দোলনের সূত্রপাত

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে, নারী আন্দোলনের শুরু হলেও পশ্চিমের ভোটাধিকার আন্দোলনকেই বলা যায় নারীর অধিকারের লড়াইয়ে প্রথম পদক্ষেপ। কেননা, ভোটাধিকার হচ্ছে একজন নাগরিকের ন্যূনতম অধিকার। কিন্তু নারী সেই অধিকার জন্মগতভাবে পায়নি। তা তাকে লড়াই করে আদায় করে নিতে হয়েছে। কেননা, রাষ্ট্রের ধারণার শুরু থেকেই, নাগরিকের ধারণা থেকে, নারীকে বাদ দেওয়া হয়েছে। প্রাচীন নগররাষ্ট্রের বাসিন্দাদের মধ্যে নারী, শিশু, ক্রীতদাস ও পাগলদের নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হয়নি।
ভোটাধিকার আন্দোলনের সূচনা বিচ্ছিন্নভাবে হলেও পরে দানা বাঁধে। তবে সাধারণভাবে ১৮৪৮ থেকে ১৯২০ সময়কালকে ধরা হয় পশ্চিমা ভোটাধিকার আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়।

ভোটাধিকার আন্দোলনেরও রয়েছে নানা অজানা দিক। পশ্চিমা ভোটাধিকার আন্দোলনকে অনেক সময়ই শ্বেতাঙ্গ, মধ্যবিত্ত ও শিক্ষিত ইউরোপিয়ান ও মার্কিন নারীর আন্দোলন হিসেবে দেখা হলেও এর মূল গ্রোথিত রয়েছে দাসপ্রথা ও বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের মধ্যেই।

ভোটাধিকারের মিছিল, যুক্তরাষ্ট্র, ১৯১৭

কাছাকাছি সময়ে শুরু হলেও, দাসপ্রথাবিরোধী ও বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করলেও নারীর ভোটাধিকার প্রশ্নে বিভক্ত হয়ে পড়েন রাজনৈতিক ও মানবাধিকারকর্মীরা। সমাজসংস্কারক ধাঁচের রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যেও দেখা দেয় দ্বিধা ও দ্বন্দ্ব। এক সময় নারীর ভোটাধিকার প্রশ্নে প্রান্তিক হয়ে পড়া নারী রাজনৈতিক কর্মীরা পৃথক আন্দোলন শুরু করেন।

পশ্চিমের ইতিহাসে নারীর ভোটাধিকার অর্জনের বছর হিসেবে ১৯২০ কে ধরা হলেও ঐদিকে রাশিয়ার নারী রাজনৈতিক কর্মীরা ছিলেন কিছুটা এগিয়ে। বলশেভিক পার্টি ও ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের প্রভাবে রাশিয়ার নারী ভোটাধিকার পায় ১৯১৭ সালে; ১৯২০ সালে যখন ইউরোপ আমেরিকার নারীবাদীরা ভোটাধিকার অর্জনকে উদযাপন করছেন, ততদিনে রাশিয়ার নারী পেয়ে গিয়েছেন গর্ভপাতের অধিকারও, যদিও পরবর্তীতে তা বাতিল হয়।

কিন্তু এতদিন পরও নারী কি আদৌ পেয়েছে নাগরিকের সম্মান?

নারীর ভোটাধিকারের ইতিহাসের চেয়েও নাগরিক হিসেবে আজকের পৃথিবীতে নারীর অবস্থা ও অবস্থান সম্ভবত বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান পৃথিবীতে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক যে সমস্ত আইন প্রচলিত রয়েছে, তা থেকে কোনমতেই মনে করা যায় না রাষ্ট্র নারীকে সমান সমান নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করে। যদিও আইনের চোখে সকল নাগরিক সমান হওয়ার কথা, কিন্তু পৃথিবীর বেশিরভাগ রাষ্ট্রেই রয়েছে চরম বৈষম্যমূলক আইন।

যান চালনা

রাশিয়ায় নারীরা ট্রেন, ট্রাক অথবা ট্রাক্টর চালানোর অধিকার পান না। রাশিয়ার লেবার কোড বা শ্রমিক আইনের ১৬২ নম্বর ধারায় ৪৫৬ রকম কাজ উল্লেখ করা রয়েছে যা নারীরা করতে পারবেন না।

সৌদি আরবে নারী কোন রকম যান চালনা করতে পারেন না। সম্প্রতি এ বিষয়ে সরব হয়েছেন আরবের নারীবাদীরা। তারা ২০১১ সালে ইউমেনটুড্রাইভ ম্নামের একটি অনলাইন প্রচারণা চালান। সেখানে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ড্রাইভিং সিটে বসে ছবি তুলে তা পোস্ট করেন নারীরা।তবে এই প্রচারণা তেমন কোন সাফল্যের মুখ দেখেনি।

কিন্তু এরই প্রেক্ষিতে সন্তানদের স্কুলে আনা নেওয়া ও জরুরি অবস্থায় পরিবারের অসুস্থ সদস্যদের হাসপাতালে নেওয়ার জন্য নারীকে গাড়ি চালানোর অনুমতি দেওয়া হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

সাক্ষ্য প্রদান

পাকিস্তানে ইসলামি শরীয়াহ আইন অনুযায়ী একজন পুরুষের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য কিন্তু একজন নারীর সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতা তার অর্ধেক। অর্থাৎ দুইজন নারীর সাক্ষ্য একজন পুরুষের সাক্ষ্যের সমান বলে বিবেচিত হয়।

শুধু পাকিস্তান নয়, যে সব দেশেই ইসলামি শরীয়াহ আইন প্রচলিত রয়েছে সেখানেই রয়েছে সাক্ষ্য প্রদানের এই বিধান।

বিবাহ, তালাক ও দাম্পত্যকালীন ধর্ষণ  

ইহুদি আইন অনুযায়ী বিবাহবিচ্ছেদের অধিকার কেবল পুরুষের। নির্যাতন নিপীড়নের শিকার হলেও নারী তার বিবাহিত স্বামীকে তালাক দেওয়ার অধিকার রাখেন না।

মুসলিম বিবাহ আইনে পুরুষ একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করতে পারলেও নারী তা পারেন না।

পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই বিবাহের মধ্যে ধর্ষণ অর্থাৎ দাম্পত্য ধর্ষণকে ধর্ষণ বলে বিবেচনা করা হয় না। কোন বিবাহিত নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্বামী জোরপূর্বক যৌন সঙ্গম করলে আদালতে তার বিচার হওয়া সম্ভব নয়।

উপরন্তু, বিভিন্ন দেশেই আইনের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া হয়েছে এ ধরনের ধর্ষণকে। যেমন, ১৯৯২ সালে ইয়েমেনে এক আদালতের নির্দেশে বলা হয়, নারীকে অবশ্যই তার স্বামীকে সহবাসে সম্মতি দিতে হবে।

একইভাবে ২০১৩ সালে ভারতে আদালতের এক রুলের মাধ্যমে এই ধরনের ধর্ষণকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। স্ত্রীর বয়স ১৫ বছরের ওপরে হলেই স্বামী কর্তৃক জোরপূর্বক যৌনসঙ্গমকে ধর্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে না ও এর কোন বিচার হবে না।

পারিবারিক নির্যাতন

দাম্পত্যের মধ্যে শারিরীক নিগ্রহ আইনের আওতায় আনার চর্চা এখনও প্রতিষ্ঠিত কোন চর্চা নয়। সম্প্রতি চীনে পারিবারিক নির্যাতনকে আইনের আওতায় আনার বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। বিবাহিত স্বামী তার স্ত্রীকে শারিরীক নির্যাতন করলে তাকে ‘ব্যক্তিগত’ বিষয় হিসেবেই দেখা হয়। নাইজেরিয়ায় স্বামীর করা আঘাত যদি দৃশ্যমান ও যন্ত্রণাদায়ক না হয় তাহলে তাকে কোন অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় না। স্ত্রীকে সংশোধনের জন্য মারধোর করার আইনগত অধিকার স্বামীর রয়েছে।


জাতীয়তা ও নাগরিকত্ব

ভোটাধিকার আন্দোলন কর্মী

পৃথিবীর বেশিরভাগ রাষ্ট্রেই নাগরিক তার জাতীয়তার উত্তরাধিকার পায় পিতার কাছ থেকে, মাতার কাছ থেকে নয়। যুক্তরাষ্ট্রে বিবাহবহির্ভূত সন্তানদের জাতীয়তাও নির্দিষ্ট হয় পিতার জাতীয়তার প্রেক্ষিতে।

শুধু জন্মগত উত্তরাধিকারই নয়। বৈবাহিক সূত্রে পাওয়া নাগরিকত্বের ক্ষেত্রেও রয়েছে একই বৈষম্য। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুরুষ নাগরিক কোনও বিদেশিনীকে বিয়ে করলে তার স্ত্রী সেই দেশের নাগরিকত্ব পান বা দাবি করতে পারেন, নারী নাগরিক বিদেশি কারও সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলে ওই বিদেশী স্বামী স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওই রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পান না। তার জন্য আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।

কর্মস্থল ও শ্রমশোষণ

একই সমান কাজ করে সমান মজুরি না পাওয়ার উদাহরণ সম্ভবত চলচ্চিত্র অভিনেতা-অভিনেত্রী থেকে শুরু করে স্কুল শিক্ষক-শিক্ষিকা পর্যন্ত সর্বস্তরে বিদ্যমান। এ ছাড়াও রয়েছে নানা রকম বৈষম্য। যেমন মাদাগাস্কারে নারী এমন কোন পেশা গ্রহণ করতে পারেন না যেখানে রাত্রে কাজ করতে হয়। শুধুমাত্র কোন পরিবার চালিত ব্যবসা প্রতিস্থানে নাইট শিফটে কাজ করার অধিকার রয়েছে মাদাগাস্কারের নারীর।

চলাফেরার স্বাধীনতা

ইয়েমেন ও আফগানিস্তানে নারীরা তাদের স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাড়ির বাইরে বের হতে পারেন না। সৌদি আরবে নারীর বাইরে বের হওয়ার জন্য প্রয়োজন হয় একজন পুরুষসঙ্গী যিনি ওই নারীর পরিবারের সদস্য। সূত্র- হাফিংটন পোস্ট, মেইল অনলাইন, রাশিয়া বিয়ন্ড দ্য হেডলাইন, হিস্টরি, দ্য উইক

/ইউআর/এফইউ/      

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ