বাংলাদেশের অর্থ হাতিয়েছে যে ছয় হ্যাকার

Send
শাহেরীন আরাফাত২০:০১, মার্চ ১০, ২০১৬

ছয় হ্যাকারের মধ্যে একজন ক্যাসিনো ব্যবসায়ী কিম অংযুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের ৮১ মিলিয়ন ডলার চুরির অভিযোগে,সন্দেহভাজন ছয়জনের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে ফিলিপাইন। দেশটির মুদ্রাপাচারবিরোধী সংস্থা,অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিল (এএমসিএল) জানিয়েছে, ফিলিপাইনের আর্থিক ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগে এই আন্তর্জাতিক চুরির ঘটনা ঘটিয়েছে তারা।

সন্দেহভাজনদের মধ্যে পাঁচজনেরই ব্যাংক একাউন্ট রয়েছে রিজাল কমার্সিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনে (আরসিবিসি)। হ্যাকাররা যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংকের একাউন্ট থেকে অর্থ সরিয়ে নেয় ওই ব্যাংকের একাউন্টগুলোতে। যার শেষ গন্তব্য ছিল স্থানীয় ক্যাসিনো।

ফিপিপাইনের সংবাদপত্র ইনকোয়েরার জানিয়েছে, হ্যাকিং-এর মাধ্যমে এই অর্থ পাচারের ঘটনায় ছয়জনকে নজরদারিতে রেখে তদন্ত করছে এএমসিএল। ওই সন্দেহভাজনরা হলেন- মাইকেল ক্রুজ, জেসি ক্রিস্টোফার, আলফ্রেড ভারগারা, এনরিকো ভাসকুইজ, উইলিয়ার সোগো এবং কিম অং।

এরই মধ্যে ফিলিপাইনের চারটি ব্যাংকে থাকা তাদের সংশ্লিষ্ট সব ব্যাংক এ্যাকাউন্ট ৬ মাসের জন্যে জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির আদালত। সেই সঙ্গে সন্দেহভাজন গো কোম্পানি ও সেঞ্চুরিটেক্স ট্রেডিং নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের একাউন্টও জব্দ করা হয়েছে। আদালত তার আদেশে বলেছেন, ‘এএমসিএল-এর তদন্ত অনুসারে, এসব একাউন্ট অনধিকার সুইফট কোড ব্যবহার করে বিশাল অংকের অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িত ছিল।’

আদালত আরও জানিয়েছেন, ওই অর্থপাচারের সঙ্গে ব্যাংক একাউন্টগুলো জড়িত থাকার বেশকিছু প্রামাণ্য তথ্য রয়েছে। আদালত আরও উল্লেখ করেছেন, ক্রুজ, ভারগারা, ভাসকুইজ এবং গো কোম্পানির আয়ের কোনও বৈধ উৎস নাই, যার মধ্য দিয়ে এতো বিশাল অংকের আর্থিক লেনদেনের যথার্থতা পূরণ হয়।  

তিন সন্দেহভাজন ক্রুজ, ভারগারা এবং ভাসকুইজ- প্রত্যেকেই ৫০০ ডলার জমা দিয়ে আরসিবিসি-তে ২০১৫ সালের ১৫ মে তারিখে একাউন্ট খোলেন। চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ওই একাউন্টগুলোতে আর কোনও লেনদেন হয়নি। ওই দিন বাংলাদেশ ব্যাংকের কোড নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে হ্যাকাররা ৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থ চুরি করে। তারা ওই অর্থ সন্দেহভাজনদের একাউন্টে স্থানান্তর করে।

১৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর অ্যামান্দো তেতাংকোকে এক চিঠিতে জানিয়েছেন, সুইফট কোড ব্যবহার করে আরসিবিসি-তে অর্থ স্থানান্তরের ঘটনাটি একটি আর্থিক জালিয়াতি।

৮১ মিলিয়ন ডলারের বেশিরভাগই ফিলিপাইনের স্থানীয় মুদ্রা পেসোতে রূপান্তরিত করা হয় ফিলরেম নামক একটি রেমিটেন্স ফার্মের মাধ্যমে। গো কোম্পানি ওই অর্থ ওয়েইকাং জু-এর একাউন্টে স্থানান্তর করে। ধারণা করা হয়, ওয়েইকাং জু গ্যামিং ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। ষষ্ঠ সন্দেহভাজন ব্যক্তি কিম সিন অং এদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নন। তবে তিনি ক্যাসিনো ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।    

এএমসিএল জানিয়েছে,পাচারকৃত অর্থ ইস্টার্ন হাওয়াইয়ান এবং সোলেয়ার ক্যাসিনোতে ব্যবহার করা হয়। ফিলিপাইনে ক্যাসিনো অ্যান্টি মানি লন্ডারিং আইনের আওতায় না থাকায় ৮১ মিলিয়ন ডলার কিভাবে আদায় হবে তা এখনও নিশ্চিত হয়নি।

ধারণা করা হচ্ছে, ওই অর্থ পুনরায় কোনও বৈদেশিক মুদ্রায় রূপান্তর করে কোথাও পাচার করা হয়েছে। কিন্তু এই যুক্তির পেছনে এখনও পর্যন্ত কোনও প্রমাণ নেই।

আরসিবিসি তাদের মাকাতি ব্রাঞ্চের ম্যানেজারের বিরুদ্ধেও তদন্ত করছে। ওই ব্রাঞ্চ থেকেই আন্তর্জাতিক অর্থ পাচারের ঘটনাটি ঘটেছিল। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ওই ম্যানেজারের বিরুদ্ধে একটি শোকজ নোটিশ জারি করেছে। তবে গো কোম্পানি ওই ব্যাংক একাউন্ট তাদের নয় বলে দাবি করেছে। তারা ওই ব্যাংক ম্যানেজারের বিরুদ্ধে ভুয়া বাণিজ্যিক দলিল তৈরির  অভিযোগ করেন। সেই সঙ্গে চেঞ্চুরিটেক্স কোম্পানির একাউন্টও ভুয়া বলে অভিযোগ করা হয়। ওই বিশাল অর্থের পেসোতে রূপান্তরের কাজটুকুও ওই একাউন্ট থেকেই করা হয়।

উল্লেখ্য, হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেম এবং সুইফট কোড নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের সিস্টেমে ৩০টি পেমেন্ট অ্যাডভাইজ পাঠায় ফিলিপাইনের স্থানীয় ব্যাংকে টাকা স্থানান্তরের জন্য। আর এটি একটি সয়ংক্রিয় ব্যবস্থা। এর মধ্যে ৫টি অ্যাডভাইজ অনার করে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক। আর এই পাঁচটি অ্যাডভাইজে মোট ১০ কোটি ডলার (১০০ মিলিয়ন) হ্যাকারদের হাতে চলে যায়। এর মধ্যে ১৯ মিলিয়ন উদ্ধার করা গেছে।

এদিকে, বাংলাদেশ সরকার এই আর্থিক দুর্নীতির জন্য ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংককে দায়ী করেছে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, ‘আমরা ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে অর্থ গচ্ছিত রেখেছি। কোনও অনিয়ম ঘটলে এটা তাদেরই তদারকি করতে হবে। তাদের অবশ্যই যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে হবে।’

তবে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক জানিয়ে দিয়েছে, তাদের তরফে কোনও অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তারা তাদের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এগোবে বলে জানায়। ফেডারেল ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সুইফট কোডের নিয়ন্ত্রণ নিতে হলে ব্যবহারকারীর নাম এবং পাসওয়ার্ডের দরকার পড়ে। যা হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নিয়েছিল। আর ফেডারেল ব্যাংকের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এর মাধ্যমেই প্রকৃত ব্যবহারকারীকে চিনতে সক্ষম হয়। তিনি এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সাইবার দুর্বলতাকেই দায়ী করেন।

ফেডারেল ব্যাংকের মুখপাত্র আন্দ্রে প্রিস্ট বলেন, ‘অনলাইন লেনদেন ব্যবস্থা সুইফট ম্যাসেজিং সিস্টেমের ওপর নির্ভর করে। যথাযথ সুইফট কোড ও এর নিয়ন্ত্রণ ছাড়া তা গ্রহণ করা হয় না।’ তবে স্বয়ংক্রিয় পেমেন্ট ব্যবস্থায় সুইফট কোড প্রতারণা রোধের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে, তিনি বলেন, ‘এ সম্পর্কে আমি কিছু জানি না।’

উল্লেখ্য, গত বছর রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, চীন, ইউক্রেন, কানাডাসহ বিশ্বের ৩০টি দেশের প্রায় একশো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সাইবার আক্রমণের শিকার হয়েছে। ‘কারবানাক’ নামের একদল হ্যাকার অনলাইনে ওইসব প্রতিষ্ঠান থেকে ১০০ কোটি মার্কিন ডলার হাতিয়ে নেয়। তখন ক্যাস্পারেস্কি ল্যাবের ডিজিটাল ক্রাইম সেন্টারের পরিচালক সঞ্জয় বার্মানি বলেছিলেন, ‘এ ধরনের হামলা আমাদের বুঝিয়ে দেয়, অপরাধীরা যে কোনও নিরাপত্তা দেওয়ালই ভাঙতে সক্ষম। তাই, আমাদের আরও সতর্ক হতে হবে।’

সূত্র: ইনকোয়েরার, ক্যাস্পারস্কি, নিউ ইয়র্ক পোস্ট, রয়টার্স, ব্লুমবার্গ।  

/এসএ/এপিএইচ/

লাইভ

টপ