ইউরোপজুড়ে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান জোরদার

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১১:১৩, মার্চ ২৭, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:৪৫, মার্চ ২৭, ২০১৬

ব্রাসেলস হামলায় জড়িত সন্ত্রাসীদের পাকড়াও করতে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে বেলজিয়ামের পুলিশ। এমন এক অভিযানে গত শুক্রবার এক সন্দেহভাজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এছাড়া বেলজিয়াম, ফ্রান্স ও জার্মানিতে অন্তত ১২ সন্দেহভাজনকে আটক করেছে পুলিশ। তবে কয়েকজনকে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

ফ্রান্স বলেছে, ব্রাসেলস হামলাকারীদের সঙ্গে যোগসাজশ থাকা একটি চক্র ব্রাসেলস ও প্যারিসে আবার বড় ধরনের হামলার ছক কষেছিল। সেই হামলার ছক ‘ভেস্তে দেওয়া’ সম্ভব হয়েছে। এরপর বেলজিয়ামসহ প্রতিবেশী দেশ ফ্রান্স ও জার্মানি এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশে তল্লাশি অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে।

গত মঙ্গলবার ব্রাসেলসে বিমানবন্দর ও মেট্রো স্টেশনে জোড়া হামলার ঘটনায় ৩৪ জন নিহত হন। নিহত ব্যক্তিদের গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে বেলজিয়ামবাসী। তবে একই সঙ্গে তারা ক্ষুব্ধও হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, সরকারের ব্যর্থতার কারণে সন্ত্রাসীরা নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

জাভেনতেম বিমানবন্দরে হামলার পর ব্রাসেলসের কেন্দ্রস্থলে সেনাদের সতর্ক প্রহরা।

এদিকে, ব্রাসেলসের ব্যস্ততম জাভেনতেম বিমানবন্দর আগামী মঙ্গলবারের আগে খুলছে না। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ গতকাল শনিবার এক বিবৃতিতে জানায়, নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ ও বিমানবন্দরের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতের পর আগামী মঙ্গলবার বিমানবন্দরের কার্যক্রম পুনরায় শুরু হবে। গত মঙ্গলবার ওই বিমানবন্দরে হামলা হয়।

তবে নতুন কী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কিছু জানায়নি। সন্ত্রাসী হামলার পর অভিযোগ ওঠে, বিমানবন্দরে নিরাপত্তাব্যবস্থা ঢিলেঢালা ছিল। বহির্গমন হল পর্যন্ত যাত্রী যাওয়ার ক্ষেত্রে নিয়মমাফিক তল্লাশি করা হয়নি বলেও সমালোচনা চলছে।

অন্যদিকে, ব্রাসেলস হামলা নিয়ে কোনো কথা বলতে রাজি নয় প্যারিস হামলার প্রধান সন্দেহভাজন সালাহ আবদেসলাম। এ হামলার ব্যাপারে প্রশ্ন করলে তিনি সাফ জানিয়েছেন, তিনি এ ব্যাপারে কোনও উত্তর সে দেবে না। বেলজিয়ামের কৌঁসুলিরা এ কথা জানিয়েছেন। বেলজিয়ামের বিচারমন্ত্রী কোয়েন গিনসও পার্লামেন্টে বলেছেন, ব্রাসেলস হামলা নিয়ে আবদেসলাম কোনো কথা বলতে রাজি হয়নি।

ব্রাসেলস হামলার প্রধান সন্দেহভাজনকে নিয়ে এর আগে নানা নাটকীয়তা হয়। বেলজিয়াম পুলিশের সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট ব্রাসেলসে একটি এলাকায় অভিযান চালিয়ে একজনকে গ্রেফতার করে। তবে তার পরিচয় গোপন রাখা হয়। এরপর স্থানীয় গণমাধ্যমে চাউর হয়, গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তির নাম নাজিম লাশরাউয়ি (২৫)। তিনিই হামলার প্রধান সন্দেহভাজন। তবে কৌঁসুলি ভন লিউ এমন খবর অস্বীকার করেন।

তিনি বলেন, হামলার প্রধান সন্দেহভাজন এখনো পলাতক। এ অবস্থায় নতুন আরেক সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে বেলজিয়াম।

ব্রাসেলসের জাভেনতেম বিমানবন্দরে হামলার পর ঘটনাস্থল ত্যাগ করছেন উদ্বিগ্ন লোকজন।

কর্তৃপক্ষ জানায়, নাজিম প্যারিস হামলার ঘটনায় পরোয়ানাভুক্ত আসামি। ওই হামলায় ব্যবহৃত অন্তত দুটি বিস্ফোরক বেল্টে তার ডিএনএ পাওয়া যায়। এ ছাড়া শুক্রবার ব্রাসেলসের যে গোপন আস্তানা থেকে আবদেসালামকে গ্রেফতার করা হয়, সেখানেও নাজিমের ডিএনএ পাওয়া গেছে।

ব্রাসেলসে হামলায় নিহত ৩৪ ব্যক্তি ১২টি দেশের নাগরিক। তাদের মধ্যে জার্মানি, স্পেন, মরক্কো, পেরু, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসের নাগরিকও রয়েছেন।

২০১৫ সালের ১৩ নভেম্বর ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে একযোগে কয়েকটি স্থানে আইএসের হামলায় নিহত হন ১৩০ জন। ওই হামলার অন্যতম সন্দেহভাজন সালাহ আবদেসালামকে গত ১৮ মার্চ ব্রাসেলস থেকে গ্রেফতার করা হয়। তাকে গ্রেফতারের পর থেকেই সতর্ক অবস্থায় ছিল বেলজিয়ামের কর্তৃপক্ষ। কিন্তু আবদেসালামকে গ্রেফতারের মাত্র চার দিনের মাথায় জোড়া হামলায় রক্তাক্ত হলো ব্রাসেলস। ২২ মার্চ ২০১৬ মঙ্গলবার ব্রাসেলসের ব্যস্ততম জাভেনতেম বিমানবন্দর ও একটি মেট্রো স্টেশনে (পাতালরেল) এক ঘণ্টার ব্যবধানে জোড়া হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। এতে নিহত হন ৩৪ জন।

ভয়াবহ ওই সন্ত্রাসী হামলার পর বেলজিয়ামের পাশে দাঁড়িয়েছেন বিশ্বনেতারা। এ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন, জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদ, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ানসহ বিশ্বনেতারা।

বেলজিয়ামের শোকে সংহতি প্রকাশ করে নিউ ইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র ভবনে এবং প্যারিসের আইফেল টাওয়ারে মঙ্গলবার রাতে বেলজিয়ামের পতাকার রঙে আলোকসজ্জা করা হয়।

ব্রাসেলস হামলায় নিহতদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করছেন এক ব্যক্তি

জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন এ হামলাকে ‘অত্যন্ত জঘণ্য’ বলে মন্তব্য করে বলেছেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও শান্তি অক্ষুন্ন রাখতে বেলজিয়াম ও ইউরোপ তাদের অঙ্গীকার রক্ষায় সঠিক পথেই কাজ করবে।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, ‘জাতীয়তা-বর্ণ-ধর্মবিশ্বাস নির্বিশেষে আমাদের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বিশ্বজুড়ে যারা মানুষের নিরাপত্তার প্রতি হুমকি সৃষ্টি করছে, আমরা তাদের পরাজিত করতে পারি; তাদের পরাজিত করবই।’

তিনি বলেন, ‘তারা যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করতে পারবে না। তারা কিছু সৃষ্টি করতে পারবে না। গোটা দুনিয়ার মুসলমানদের, কিংবা গোটা বিশ্বের মানুষদের দেওয়ার মতো কোনও বার্তা তাদের নেই। তারা কেবল মানুষের জন্য ভীতি তৈরি করতে পারে। তারা আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে অসহনীয় করে তুলতে পারে, আমাদের বিভক্ত করতে পারে। আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত সেটা করতে দেব, সন্ত্রাসীরা তাদের কাজ চালিয়ে যেতে পারবে।’

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেছেন, আমরা কখনোই সন্ত্রাসকে বিজয়ী হতে দেব না।

২২ মার্চের হামলার তিনদিনের মাথায় ২৫ মার্চ ফের ব্রাসেলসে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, সন্ত্রাসের কোনো সীমানা নেই। সন্ত্রাসীরা বিশ্বময় মানুষের জন্য হুমকি। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভিত্তিতে এদের মোকাবেলা করতে হবে।

জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল বলেছেন, এ হত্যাযজ্ঞ হৃদয়বিদারক। সন্ত্রাস মোকাবেলায় আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদ বলেছেন, ইউরোপ আক্রান্ত হয়েছে। সন্ত্রাস মোকাবেলায় আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

বেলজিয়ামের রাজা ফিলিপ লিওপোল্ড-এর কাছে এ ফোন করে এ ঘটনায় দেশটির জনগণের প্রতি সহমর্মিতা জানান তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান। তিনি বলেন, ব্রাসেলসে যারা সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়েছে, তাদের মানবিক ও নৈতিক কোনো মূল্যবোধ নেই। সূত্র: আল জাজিরা, বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান।

/এমপি/

লাইভ

টপ