লাহোর হামলায় সংশ্লিষ্টদের খোঁজে সর্বাত্মক অভিযান

Send
বিদেশ ডেস্ক১৭:২০, মার্চ ২৮, ২০১৬

পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাজধানী লাহোরে চালানো আত্মঘাতী বোমা হামলায় জড়িতদের ধরতে সর্বাত্মক অভিযানের ঘোষণা দিয়েছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। এরইমধ্যে হামলাকারী আত্মঘাতীকে শনাক্ত করা হয়েছে বলে দাবি করেছে পুলিশ। ওই হামলায় অন্তত ৭২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও তিন শতাধিক মানুষ।

পাকিস্তানের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ডন সেনা সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, সেনাবাহিনী এবং আধা-সামরিক পাকিস্তান রেঞ্জারস যৌথ অভিযান চালাতে যাচ্ছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান রাহিল শরীফের সভাপতিত্বে সেনা সদর দফতরে উচ্চস্তরের এক বৈঠকে ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

লাহোরে হামলাস্থলে তদন্ত করছেন কর্মকর্তারা

সোমবার সকালের দিকে আইএসপিআর-এর মহাপরিচালক অসীম বাজওয়া জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত পাঞ্জাবের বিভিন্ন স্থানে পাঁচটি অভিযানে বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, এসব অভিযানে প্রচুর আগ্নেয়াস্ত্রও আটক করা হয়েছে। তবে সর্বাত্মক অভিযানের বিষয়ে তিনি তখন কিছু উল্লেখ করেননি।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, লাহোরের আত্মঘাতী হামলাকারীকে শনাক্ত করা হয়েছে। তিনি মুজাফফরনগরের গোলাম ফরিদের ছেলে ইউসুফ। তার বাড়ির সামনে নিরাপত্তা বাহিনী অবস্থান করছে এবং তার পরিবারের তিন জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে বলে জানা গেছে।    

এদিকে, ওই হামলার দায় স্বীকার করেছে তেহরিকে তালেবান পাকিস্তানের একাংশ জামাতুল আজহার। রবিবার সন্ধ্যায় আল্লামা ইকবাল টাউনের গুলশান-এ-পার্কে ওই আত্মঘাতী হামলাটি চালানো হয়। নিহতদের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নিহত ৭২ জনের মধ্যে ২৯ জনই শিশু। হামলার পরপরই স্থানীয় সবগুলো হাসপাতালে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে।

আশেপাশের হাসপাতালগুলোতে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা যায়। বিশেষত জিন্নাহ হাসপাতাল, শেখ জায়েদ হাসপাতাল এবং লাহোর জেনারেল হাসপাতালে আহত, নিহত এবং দর্শণার্থীদের ভীড়ে এক মর্মান্তিক পরিস্থিতি তৈরি হয়। হামলার এক ঘন্টার মধ্যে জিন্নাহ হাসপাতালে নেওয়া হয় ২০ জন নিহতের লাশ, যার মধ্যে কয়েকজনের শরীর ছিন্ন-ভিন্ন, আহত আরও ৭০ জনকে সেখানে নেওয়া হলে আরও করুণ পরিস্থিতি সামনে আসে। শিশু সহ অনেক খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীও নিহত হয়েছেন।

শেহনাজ নামের খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী এক নারী বলেন, ‘আমি অনেক অ্যাম্বুলেন্স দেখতে পেয়েছি। কিন্তু আমি আমার ভাইকে খুঁজে পাচ্ছি না। তিনি পার্কে গিয়েছিলেন।’

জিন্নাহ হাসপাতাল পরিদর্শনকালে পাঞ্জাবের খাদ্যমন্ত্রী বিলাল ইয়াসিন বলেন, ‘আমরা এখনও নিশ্চিত করে বলতে পারছি না, হামলায় ঠিক কতোজন খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী মারা গেছেন বা আহত হয়েছেন। আমাদের প্রথম কর্তব্য আহতদের জীবন বাঁচানো।’  

নারী এবং শিশুরাই ছিল এই হামলার লক্ষ্যবস্তু

পাঞ্জাবের প্রাদেশিক সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা সালমান রফিক জানিয়েছেন, হাসপাতালে বেশ কয়েকজন আহত ব্যক্তিকে জরুরি ভিত্তিতে সার্জারি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘নিহতের সংখ্যা অনেক বাড়তে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করছি।’ 

এর আগে ইকবাল টাউনের পুলিশ সুপার ড. মোহাম্মদ ইকবাল জানান, রবিবার সন্ধ্যায় শিশু পার্কে আত্মঘাতী বোমা হামলা ঘটে। এ সময় সেখানে অনেক শিশু ও নারী উপস্থিত ছিলেন। বিস্ফেরণস্থলটি লাহোরের একটি অন্যতম আবাসিক এলাকা। বিস্ফোরণটি ঘটে পার্ক থেকে বের হওয়ার গেটের কাছেই। ইস্টার সানডে উপলক্ষে পার্কে ছিল প্রচুর মানুষের উপস্থিতি।

ওই হামলার দায় স্বীকার করেছে তেহরিকে তালেবান পাকিস্তানের একাংশ জামাতুল আজহার। এক বিবৃতিতে ওই অংশের মুখপাত্র এহসানুল্লাহ এহসান বলেন, ‘খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের লক্ষ্য করে ওই হামলা চালানো হয়। আমরা প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের কাছে এই বার্তা দিতে চেয়েছি যে, আমরা লাহোরে প্রবেশ করেছি। তিনি যা খুশি চান তা-ই করতে পারেন, কিন্তু তিনি আমাদের আটকাতে পারবেন না। আমাদের বোমা হামলাকারীরা এমন হামলা চালিয়ে যাবেন।’

ডিআইজি (অপারেশন) ক্যাপ্টেন (অব.) মুহাম্মদ উসমান আত্মঘাতী বোমা হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, হামলাকারীর বিচ্ছিন্ন মাথা খুঁজে পাওয়া গেছে। ঘটনাস্থল থেকে বল বেয়ারিংও উদ্ধার করা হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা ডন নিউজকে জানিয়েছেন, পার্কের ভেতর রক্ত আর রক্ত। চারদিকে মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছড়িয়ে আছে। যেদিকেই দেখা যাচ্ছে আহত ও নিহত মানুষ পড়ে আছেন। এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘আমরা আহতদের রিকশা ও ট্যাক্সিতে করে হাসপাতালে নিয়ে যাই।’

স্বজনদের আহাজারি

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ ওই হামলার নিন্দা জানিয়ে কর্তৃপক্ষকে আহতদের ‘বিশেষ স্বাস্থ্য সেবা’ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘ওই হামলায় আমার সন্তানদের, ভাই এবং বোনদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে।’ হামলার পরপরই পাঞ্জাব সরকার তিনদিনের শোক ঘোষণা করেছে। শহরজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

এদিকে, পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ওই হামলায় নিন্দা জানিয়েছে। হোয়াইট হাউজের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের মুখপাত্র নেড প্রাইস এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এই কঠিন সময়ে পাকিস্তানের জনগণ এবং সরকারের পাশে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আমরা পাকিস্তান এবং ওই অঞ্চলে আমাদের অংশীদারদের সঙ্গে সন্ত্রাসের শেকড় উপড়ে ফেলতে কাজ করে যাব।’

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ওই হামলার নিন্দা জানিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করেছেন। মোদি যে কোনও সহযোগিতায় পাশে থাকার আশ্বাসও দিয়েছেন বলে এক টুইটার বার্তায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বিকাশ স্বরূপ নিশ্চিত করেছেন।

পাকিস্তানে বোমা বিস্ফোরণ, গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বে সহিংসতায় হতাহতের ঘটনা নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। পাকিস্তানি তালেবানের একাংশ সরকারের সাথে আলোচনায় সম্মত হলেও কয়েকটি অংশ সম্প্রতি বেশ কিছু আত্মঘাতী বোমা হামলা চালিয়েছে দেশটিতে। সূত্র: রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান, এএফপি, বিবিসি, ডন। 

/এসএ/বিএ/ 

লাইভ

টপ