behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

কলকাতায় ফ্লাইওভার ধসকালো তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয় ফ্লাইওভার নির্মাণের দায়িত্ব

বিদেশ ডেস্ক০৯:৪৭, এপ্রিল ০১, ২০১৬

কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার পরেও কলকাতার সেই ভেঙে পরা নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের কাজ দেওয়া হয় আইভিআরসিএল নামের প্রতিষ্ঠানটিকে। ওই প্রতিষ্ঠান রেলের খাতায় কালো তালিকাভুক্ত। হায়দ্রাবাদভিত্তিক ওই প্রতিষ্ঠান হলেও সেখানে শ্রমিক নিরাপত্তার প্রশ্নে তদন্তের মুখে পড়তে হয় তাদের। কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাদের কালো তালিকাভুক্ত করে উত্তরপ্রদেশ জল বিভাগ। আনন্দবাজার পত্রিকা জানিয়েছে, কার্যত দেউলিয়া হতে বসা ওই প্রতিষ্ঠান গত বছরের শেষ ছয় মাস প্রকল্পের কাজ প্রায় বন্ধ রাখতেও বাধ্য হয়। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ না নেওয়ায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার।
বৃহস্পতিবার দুপুরে নির্মাণাধীন ওই সেতুর ১০০ মিটার লম্বা একটি অংশ ভেঙে ২১ জনের মৃত্যু এবং অন্তত ২৭ জন আহত হওয়ার পরেই হঠাৎ যেন সম্বিৎ ফিরল! দায়ের হলো এফআইআর। আইভিআরসিএল-এর কলকাতার অফিসে হানা দিল লালবাজার পুলিশ। কর্মকর্তাদের কাউকে না পেয়ে সিল করা হল অফিস। পুলিশ সূত্রের খবর, কর্মকর্তাদের খোঁজে রাতে হায়দরাবাদ রওনা দিয়েছে গোয়েন্দা দল।
ফ্লাইওভার তৈরির কাজ অবশ্য প্রতিষ্ঠানটি পেয়েছিল ২০০৭-০৮ সালে বামফ্রন্ট আমলে। ইউপিএ সরকারের ‘জেএনইউআরএম’ প্রকল্পের আওতায় ২০০৯ সালে বামফ্রন্ট সরকার ওই ফ্লাইওভার নির্মাণের দায়িত্ব তুলে দেয় আইভিআরসিএল-এর হাতে। কথা ছিল হাওড়া ব্রিজ থেকে গিরিশ পার্ক ২.২ কিলোমিটার লম্বা এই ফ্লাইওভার ২০১১ সালের আগস্ট মাসের মধ্যে শেষ করে সরকারের হাতে তুলে দেবে তারা। ইতিমধ্যে রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদল হয়। শুরু হয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানা। ঘোষিত সময়ে কাজ শেষ হওয়া তো দূরের কথা, গত বছরের নভেম্বর মাস পর্যন্ত নয়বার সময়সীমা ছুঁতে ব্যর্থ হয় প্রতিষ্ঠানটি। জমি জটের কারণে সময়ে কাজ শেষ না হওয়ার জন্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় ২০১৪ সালে সরকারের কাছে ৭২ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণও দাবি করে তারা। সরকারি সূত্রের দাবি, ঋণের পুনর্বিন্যাস ঘটিয়ে গত ডিসেম্বর মাস থেকে ওই প্রকল্পের কাজে নতুন করে হাত দেওয়া হয়।

২০০৭-০৮ সালে দরপত্রের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ওই প্রতিষ্ঠান কাজের দায়িত্ব পেয়েছিল। কেন্দ্রীয় সরকারও অনুমোদন দেয় তাতে। কিন্তু পরের দুই বছর ঠিকঠাক কাজ করা যায়নি। ২০১১ সালে উত্তরপ্রদেশ জল বিভাগ নির্মাণ কাজে খারাপ মাল ব্যবহারের অভিযোগে তাদের কালো তালিকাভুক্ত করে। তার দুই বছর আগে শ্রমিক আইন না মানায় হায়দ্রাবাদ কর্তৃপক্ষ ওই প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করার সুপারিশ করে অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার। এখানেই শেষ নয়, খারাপ কাজ করা ও সময়ে কাজ শেষ করতে না পারার কারণে রেল বিকাশ নিগম লিমিটেড ২০১৩ সালে তিনটি প্রকল্প থেকে সরিয়ে দেয় আইভিআরসিএল-কে। ২০১৩ সালে তিনটি প্রকল্পে ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে আরভিএনএল। কেএমডিএ-র একাংশ জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি তেল সরবরাহের লাইন এবং জলের লাইনের কাজ করতেই অভ্যস্ত। ওই কাজ পাওয়ার আগে ফ্লাইওভার বানানোর তেমন অভিজ্ঞতাও ছিল না।

‘কালো তালিকাভুক্ত’ হওয়ার বিষয়টি জানার পর প্রতিষ্ঠানটিকে সরানো হলো না কেন? কেনই বা রাজ্য সরকারের বদলের পরেও প্রতিষ্ঠানটির ‘ইতিহাস’ যাচাই করা হয়নি? এ সব প্রশ্নে রাজনীতির চাপান উতোরকেই ঢাল করছেন প্রাক্তন ও বর্তমান সরকারের কুশীলবেরা।

বামফ্রন্ট সরকারের নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অশোক ভট্টাচার্যের দাবি, তাদের আমলে এই সংস্থার বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য, ‘বর্তমান সরকার এই প্রতিষ্ঠানকে সরাল না কেন? আসলে ওই প্রতিষ্ঠানের নামে কাজ হলেও কারা কাজ করছিল, তা খোঁজ করে দেখা দরকার। ঠিকঠাক তদন্ত হলে সেটাই সামনে আসতে পারে। যদিও তা আসবে কি না সন্দেহ।’ এই ফ্লাইওভার তৈরির জন্য দীর্ঘদিন নানাভাবে উদ্যোগী হয়েছিলেন সিপিএমের প্রাক্তন সাংসদ ও স্থানীয় নেতা সুধাংশু শীল। তার অভিযোগ, প্রকল্পের সর্বশেষ বরাত দেওয়ার সময় চরম দুর্নীতি হয়েছে। তার উপর দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য মাত্রাতিরিক্ত রাজনৈতিক চাপ ছিল। কম টাকায়, দ্রুততার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে নিরাপত্তা, সতর্কতা – এ সবের উপর ঠিকাদার নজর দেয়নি। গুরুত্ব দেয়নি কেএমডিএ-ও। গতকাল (বৃহস্পতিবার) রাত সাড়ে এগারোটা নাগাদ ঘটনাস্থলে যান সিপিএম-এর রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র। তিনি বলেন, ‘পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন। তবে সরকারের তদন্তের উপরে নির্ভর করি না।’ তার পরেই তার সংযোজন, ‘এটা রাজনীতির জায়গা নয়, তাই আর কিছু বললাম না। মানুষ আছেন, সব দেখছেন। কোনও কিছুই চাপা থাকবে না।’ কিন্তু ফ্লাইওভারের টেন্ডার তো তাদের সময়েই হয়েছিল। তার জবাব, ‘বাম আমলে কী এই আমলে তা বলার জন্যে অনেক মঞ্চ রয়েছে।’

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বর্তমান নগরোন্নয়ন মন্ত্রী ফিরহাদ (ববি) হাকিম কিন্তু দোষ দিচ্ছেন পূর্বতন বামফ্রন্ট সরকারকেই। ববির দাবি, ‘এখানে ফ্লাইওভার করা যে অনুচিত আমরা সেটা বুঝেছিলাম। কিন্তু বামফ্রন্টের আমলেই দরপত্রের মাধ্যমে বরাত পেয়ে এই প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করে দিয়েছিল। বহু টাকা খরচও হয়ে গিয়েছিল। সেই অবস্থায় কাজ বন্ধ করতে আমরা চাইনি। প্রতিষ্ঠানটি অন্য কোথাও কালো তালিকাভুক্ত হয়েছিল কি না সে সম্পর্কেও নির্দিষ্ট খবর আমাদের কাছে নেই। এখন এই ঘটনার পরে অবশ্যই প্রতিষ্ঠানটির কাজ করার প্রশ্ন ওঠে না। কেন এই ঘটনা তারও তদন্ত হবে।’ বছর দুয়েক আগে এক মার্চের ভোরে উল্টোডাঙা ফ্লাইওভারও এভাবে ভেঙে পড়েছিল। সেই প্রসঙ্গ তুলে কেন্দ্রীয় নগরোন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় বলেন, ‘অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নির্মাণ কাজ চলছিল। রাজ্য যে উল্টোডাঙার ঘটনা থেকে  শিক্ষা নেয়নি তা এই ঘটনা থেকেই স্পষ্ট।’

ফ্লাইওভারের নকশা

দুর্ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বিশেষজ্ঞেরা যা বলছেন, তাতে গাফিলতির প্রশ্নটাই উঠে আসছে। তারা বলছেন, ফ্লাইওভারের কাজে পর্যাপ্ত সতর্কতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাবেই এতো বড় বিপর্যয় ঘটলো। গড়িয়াহাট, পার্ক স্ট্রিট আর নাগেরবাজার – এই তিনটি ফ্লাইওভার নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান কাজল সেনগুপ্ত বলেন, ‘সেতু বা ফ্লাইওভার তৈরির ক্ষেত্রে নজরদারির বিষয়টিই সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা তিনটি ফ্লাইওভার তৈরির ক্ষেত্রেই চূড়ান্ত সতর্কতা নিয়েছিলাম। নজরদারি ছিল ষোলো আনা।’ তিনি আরও বলেন, ‘নাগেরবাজার ফ্লাইওভার তৈরির সময় পুলিশ যান-নিয়ন্ত্রণের পর্যাপ্ত সুযোগ পাচ্ছে না। অথচ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে হবে। এই উভয় সংকটের মধ্যেও কাজ চালাতে হয়েছে। ২৪ ঘণ্টা নজরদারি রেখে কোনও দুর্ঘটনা ছাড়াই কাজটা শেষ করেছি।’ অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, নকশা এবং নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মান নিয়েও। সেতুতে যে পিয়্যারক্যাব হুইল থাকে, কংক্রিটের ওজন নেওয়ার পক্ষে তা কতোটা উপযুক্ত ছিল, সে ব্যাপারেও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

প্রথম থেকেই নিরাপত্তার উপর জোর দিলে এত বড় দুর্ঘটনা এড়ানো যেত বলে মনে করেন কেএমডিএ-র প্রাক্তন ডিরেক্টর জেনারেল দেবদাস ভট্টাচার্যও। প্রায় চার দশক কেএমডিএ-র ইঞ্জিনিয়ার থাকার সুবাদে তিনি বেশ কিছু ফ্লাইওভার তৈরির কাজ করেছেন। তিনি বলেন, ‘নির্মাণকাজ চলাকালীন ফ্লাইওভার ভেঙে পড়ার ঘটনা অতীতেও হয়েছে। বিদ্যাসাগর সেতু তৈরির সময় এপারে, মানে খিদিরপুরের দিকে প্রায় ৩০ মিটার দীর্ঘ একটা অংশ (‘ডেক’) ভেঙে পড়ে। ঢালাইয়ের গণ্ডগোলের জন্য ওরকম হয়েছিল। ফাঁকা জায়গা ছিল বলে কেউ হতাহত হয়নি। কিন্তু ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল হওয়ায় বিবেকানন্দ রোড প্রকল্পের কাজে আরও অনেক সতর্ক হওয়া উচিত ছিল।’

ফ্লাইওভার তৈরির এই কাজে নজরদারির দায়িত্ব ছিল কেএমডিএ-র ওপর। সেখানে কোনও অনিয়ম বা গাফিলতির কথা মানতে চাননি ববি। তার বক্তব্য, ‘এই ফ্লাইওভারের নকশা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদিত অভিজ্ঞ এক প্রতিষ্ঠানের তৈরি। তদারকির দায়িত্বে ছিলেন কেএমডিএ-র অভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার প্রিয়তোষ ভট্টাচার্য। কংক্রিটের মিশ্রণ, ‘কাস্টিং কিউব’ – এসব কাজ অভিজ্ঞরাই করেছেন। নিরপেক্ষ নজরদার হিসাবে কাজ করেছে ইন্ডিয়ান রেজিস্ট্রার ফর শিপিং (‘আই আর ক্লাস’)।’

যদিও কেএমডিএ-র অভ্যন্তরেই অভিযোগ উঠেছে, স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী পোস্তায় জগদ্ধাত্রী পুজোর উদ্বোধনে গিয়ে ফেব্রুয়ারির মধ্যে সেতুর কাজ শেষ করতে বলার পরেই উঠে পড়ে লেগেছিলেন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ও সরকারি কর্তারা। দ্রুত কাজ করতে গিয়ে মান নিয়ে সতর্কতা শিকেয় উঠেছিল। কেএমডিএ-র এক কর্মকর্তা জানান, যে ধরনের সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছে, তা ওই রকম উড়ালপুল নির্মাণের ক্ষেত্রে উচিত হয়নি। এই বিষয়টা কেএমডিএ-র কর্তাদের অনেকেই জানতেন। কেএমডিএ সূত্রের খবর, কাজ কেমন চলছে, তা এ দিনই দেখতে যাওয়ার কথা ছিল তাদের ইঞ্জিনিয়ারদের। তার আগেই দুর্ঘটনা। নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অবশ্য যুক্তি দেন, ‘সময়ে এবং দ্রুত কাজ শেষ করার কথা অনেক সময়েই বলা হয়। তার মানে এই নয় যে কাজের ক্ষেত্রে মান বজায় না রেখে তা করতে হবে। এ সব অহেতুক অভিযোগ।’

কী বলছে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানটি? ওয়েবসাইটে ওই প্রতিষ্ঠানটির কলকাতার তিনটি ঠিকানায় গিয়ে তাদের সন্ধান মেলেনি। কলকাতায় সংস্থার প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে যার নাম দেওয়া হয়েছে, তার ফোনের লাইন মেলেনি। তবে হায়দ্রাবাদ থেকে সংস্থার এক কর্মকর্তা পাণ্ডুরঙ্গ রাও বলেন, ‘আমরা এই ঘটনায় হতবাক। এটা ভগবানের মার ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রায় ২৭ বছর কাজ করছি। কোথাও এ রকম হয়নি। সেতুর প্রায় ৭০ শতাংশ কাজও হয়ে গিয়েছিল। ফলে খারাপ মানের জিনিস দিয়ে কাজ হয়েছে এমনটাও নয়। তদন্তে প্রশাসনকে সাহায্য করা হবে।’ তবে একই সঙ্গে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধেও অভিযোগ করে রাওয়ের দাবি, ‘আমাদের জমি একসঙ্গে দেওয়া হয়নি। তাই গোটা কাজও একসঙ্গে করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।’

সৌজন্য: আনন্দবাজার পত্রিকা।

/এসএ/

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ