উড়ালসেতু বিপর্যয়ে উদ্ধার তৎপরতাকাল সারদিন ছিলেন মমতা, আজ আসবেন রাহুল

Send
বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক
প্রকাশিত : ০৭:৪৭, এপ্রিল ০২, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ০৭:৫৩, এপ্রিল ০২, ২০১৬

চলছে উদ্ধার তৎপরতাদু’জনে দুই বাহিনীর দায়িত্বে। কিন্তু তাদের কাজকর্মে আকাশ-পাতাল তফাৎ। একজনের বাহিনী উড়ালসেতু বিপর্যয়ের পরে মূল উদ্ধারকাজটা সামলেছে। তার জন্য তিনি নিজে কিন্তু লোক-লস্কর নিয়ে তাঁবু খাটিয়ে এলাকায় বসেননি। জলের বোতল, চায়ের কাপ টেবিলে সাজিয়ে মাইক হাতে নিয়ে একে-ওকে নির্দেশও দেননি। তিনি সেনাবাহিনীর বেঙ্গল এরিয়ার দায়িত্বে থাকা লেফটেন্যান্ট জেনারেল রাজীব তিওয়ারি।
কাজে কোনও অসুবিধা হচ্ছে কি না দেখতে যিনি বার দুয়েক অল্প সময়ের জন্য এসে ঘুরে যান।
অন্যজন রাজ্য প্রশাসনের মাথা। তার পুলিশ বা বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী অবশ্য উদ্ধারের কাজে পুরোপুরি ব্যর্থ এবং দিশাহারা বলেই অভিযোগ। তবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যথারীতি সারাদিন টেবিল পেতে রবীন্দ্র সরণিতে বসে ছিলেন। রাজ্য প্রশাসন ও পুলিশের বড় কর্তাদের ডেকে জড়ো করেছিলেন। মাইক হাতে সবাইকে শুনিয়ে কখনও মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়, কখনও পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারকে নানা রকম নির্দেশও দিয়েছেন। তাতে উদ্ধারকাজের ঠিক কী সুবিধা হয়েছে, সেটা অবশ্য কারও জানা নেই। তবে ভিআইপিদের তদারকি করতে গিয়ে গ্রাউন্ড জিরোতে যে বাড়তি অসুবিধা তৈরি হয়েছে, সেটাবাহিনীর অন্দরে অনেকেই স্বীকার করছেন।
কোনও একটা দুর্ঘটনা ঘটলেই সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে ছুটে যাওয়াটা ভারতীয় রাজনীতিতে বহু দিনের চল। অথচ তাতে যে পরিস্থিতি মেরামতির কাজে অসুবিধাই আখেরে বাড়ে, তা ঘোর বাস্তব। দিদি শুধু ছুটে গিয়েই ক্ষান্ত হন না, ঠায় পড়েও থাকেন। বিরোধী নেত্রী যখন ছিলেন, ঘটনাস্থলে রাত কাবার করে দিতেন। সঙ্গে ভিড় জমাতেন তার ‘ভাই’য়েরা। স্টিফেন কোর্ট অগ্নিকাণ্ডের সময় এমনও বলেছিলেন, সরকার পেছন-দরজা দিয়ে লাশ বের করে গুম করে দিচ্ছে!
সেই তিনি এখন অকুস্থলে দাঁড়িয়ে গোটা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন নিজের হাতে। মুহূর্তে ব্যবস্থা হয়ে যায় মাইকের। তারপর টেলি সম্মান অনুষ্ঠান বা কলকাতা পুলিশের বার্ষিক উৎসবে যে ভাবে মাইক হাতে ঘোরাফেরা করেন, বিপর্যয়স্থলেও তেমন করেই শুরু হয়ে যায় তাঁর ঘোরাফেরা, হাঁকডাক। আমরি হাসপাতালের দুর্ঘটনা থেকে শুরু করে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বা সুচিত্রা সেনের মৃত্যু চিত্রনাট্যের বদল নেই। গত বছর নিজে সারা রাত নবান্নে থেকে গিয়েছিলেন রাজ্যে বন্যা পরিস্থিতির দিকে নজর রাখবেন বলে। মেয়রকে রাত্রিবাস করিয়েছিলেন পুরসভার সদর দফতরে। নবান্নে রাত জেগে আলাদা করে বন্যা মোকাবিলার কী সুবিধা হবে, সে প্রশ্নের উত্তর অবশ্য কেউ পায়নি।
বৃহস্পতিবার বিবেকানন্দ উড়ালপুল যখন ভেঙে পড়ল, দিদি ছিলেন মেদিনীপুরে। বিকেল তিনটে নাগাদ শহরে ফিরে সেই যে বসলেন, উঠলেন রাত ন’টায়। ফুটপাথের ধারে চেয়ার পেতে মুখ্যমন্ত্রীর অস্থায়ী অফিস সাজানো হল। তাকে ঘিরে রইলেন মুখ্যসচিব বাসুদেব বন্দ্যোপাধ্যায়, স্বরাষ্ট্রসচিব মলয় দে। তারপর একে একে ডেকে নেওয়া হয় পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমার থেকে শুরু করে সোমেন মিত্র, সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়সহ শীর্ষ পুলিশ কর্তাদের। মুখ্যমন্ত্রী যখন মাইক হাতে ‘একে জল দাও, ওকে চা দাও’ বলে মিডিয়ার জন্য চেয়ারের ব্যবস্থা করছেন, পাশে অম্লান মুখে বসেছিলেন মুখ্যসচিব। ঘটনাস্থলে পৌঁছে কার্যত ভিড় ঠেকানোর কাজ ছিল পুলিশ কমিশনারের। বাকিদের তাও ছিল না। এতে লাভের লাভ কী হল? পুলিশের একাংশ জানাচ্ছেন, রবীন্দ্র সরণি পরিণত হল ভিআইপিদের যাতায়াতের পথে। দমকল, ক্রেন, পে-লোডার ঢুকতে বেগ পেল। নবান্নের এক আমলার কথায়, দিদির জো-হুজুরি ছেড়ে মুখ্যসচিব ও স্বরাষ্ট্রসচিব যদি নবান্নে থাকতেন, তা হলে বরং উদ্ধারকাজ আরও সুচারু ভাবে হতে পারত। কারণ, সে ক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রীকে জবাবদিহির দায় থাকত। মুখ্যমন্ত্রী প্রশাসনের কর্তাদের পাশে বসিয়ে রেখে সেই সুযোগটাই নষ্ট করে দিলেন, বললেন ওই আমলা। বাসুদেববাবু নিজে অবশ্য এর মধ্যে কোনও দোষ খুঁজে পাচ্ছেন না। শুক্রবার তিনি বরং বলেন, ‘ঘটনাস্থলে যাওয়াই তো উচিত। তাতে অনেক দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং ব্যবস্থা নেওয়া যায়!’ 

কিন্তু অত্যন্ত জটিল উদ্ধারকাজের যে দায়িত্ব সেনাবাহিনীর হাতে দেওয়া হয়েছে, সেখানে মুখ্যমন্ত্রী সশরীরে বসে থেকে কী সিদ্ধান্ত এবং কী ব্যবস্থা নেবেন? গ্যাস-কাটার দিয়ে কোথায়, কতটা কাটতে হবে সে ধারণা তাঁর থাকার কথা নয়। কংক্রিটের চাঙড়ও তিনি সরাবেন না। তা হলে ভিড় বাড়িয়ে সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করা ছাড়া আর কী লাভ হল, সেটাই প্রশ্ন। কলকাতার প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার তুষার তালুকদার যেমন বলছেন, ‘দুর্ঘটনাস্থলে মুখ্যমন্ত্রীর একটিবার ‘টোকেন উপস্থিতি’র একটা ব্যাখ্যা থাকে। কিন্তু অতক্ষণ বসে থাকাটা লোক দেখানো ছাড়া কিছুই নয়! বরং যে অফিসারেরা হাতেকলমে কাজটা করছেন, মুখ্যমন্ত্রী বসে থাকলে তাঁদের অসুবিধাই হওয়ার কথা!’ ভিআইপিদের তদারকি পুলিশের বাড়তি কাজ হয়ে দাঁড়ায়। 

ঘটনা হল, বিপর্যয় শুধু এদেশেই হয় এমন নয়। কিন্তু তাই নিয়ে এমন কাণ্ডের নজির অন্যত্র চট করে মিলবে না। শাসক দলেরই একটি সূত্র জানাচ্ছেন, দিদি এই ধরনের ‘মাইক্রো ম্যানেজমেন্ট’ বরাবরই ভালবাসেন। নিজেকে মাটির মানুষ হিসেবে তুলে ধরা, প্রশাসনকে মাটির কাছাকাছি নামিয়ে আনা হচ্ছে বলে দেখানো এবং সর্বোপরি হাঁকডাক করে প্রমাণ করা যে আসল কাজটা একা তিনিই সামলাচ্ছেন এ সবই তাঁর রাজনীতির জরুরি অঙ্গ। তবে ভোট বাজারে উড়ালসেতু বিপর্যয় তাঁর এই চিরকেলে অভ্যাসকে মরিয়া তাগিদে পরিণত করেছে। বিরোধীদের বক্তব্য, ভোটের আগে কলকাতার বুকে এত বড় ঘটনা যে সারদা-নারদাজর্জর শাসক দলকে আরও বিপাকে ফেলবে, সেটা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিলক্ষণ বুঝেছেন। ফলে ছুটে এসে টেবিল সাজিয়ে বসে পড়া ছাড়া তাঁর তরফে ‘ড্যামেজ কন্ট্রোলে’র আর কোনও রাস্তা ছিল না। সিপিএম সাংসদ মহম্মদ সেলিমের কথায়, ‘তৃণমূলের কোনও নেতা-মন্ত্রীর শোকার্ত, প্রতারিত মানুষদের মুখোমুখি হওয়ার সাহস পাননি। মুখ্যমন্ত্রী কর্তা-পুলিশ পরিবেষ্টিত হয়ে সেই পরিস্থিতি সামাল দিতে চেয়েছেন। তাঁর সপার্ষদ উপস্থিতির জন্য উদ্ধারকাজ ব্যাহত হয়েছে।’ 

কিন্তু প্রশ্ন হল, মুখ্যমন্ত্রী তো একা নন! দিদির পাশাপাশি কাল সদলে অকুস্থলে পৌঁছেছিলেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী। দফায় দফায় যান সুজন চক্রবর্তী, অনাদি সাহু, সুধাংশু শীল, সূর্যকান্ত মিশ্র, রাহুল সিংহ। শনিবার আসবেন রাহুল গান্ধী। 

রাজ্যবাসীর কাতর প্রশ্ন, এই নাটক থেকে নিস্তার কবে? 

 

সূত্র: আনন্দবাজার

 

/এমএসএম /

লাইভ

টপ