ফিলিপাইনে শুনানিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত‘আমরা টাকা ফেরত পেলাম কোথায়, টাকাতো এখনও ফিলিপাইনের ভল্টে’

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৬:২৪, এপ্রিল ০৬, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৫৩, এপ্রিল ০৬, ২০১৬

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের একাউন্ট থেকে ফিলিপাইনের মাধ্যমে পাচার হওয়া অর্থের একাংশ ফেরত নিতে এ মাসের শুরুতে বাংলাদেশের তদন্তকারী এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধিরা ম্যানিলা গেলেও সেই অর্থ পুনরুদ্ধার নিয়ে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। ফিলিপাইনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জন গোমেজ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, রশিদে স্বাক্ষর করিয়ে দুই ধাপে তাদের হাতে চীনা বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ী কিম অংয়ের ফেরত দেওয়া অর্থ তুলে দেওয়া হলেও পরে তা ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে রেখে দেওয়া হয়েছে। তবে বুধবার এএমএলসি এবং বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের বৈঠকের পর ব্লু রিবন কমিটির চেয়ারম্যান সিনেটর তেওফিস্তো গুইনগোনা জানান, দেওয়ানি বাজেয়াপ্তকরণের মামলার মাধ্যমে কিম অংয়ের ফেরত দেওয়া অর্থ বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।

বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে ফিলিপাইনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জন গোমেজ (বামদিক থেকে তৃতীয়)

উল্লেখ্য, চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেম হ্যাকড করে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে হ্যাকাররা ৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থ চুরি করে ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশনের (আরসিবিসি) চারটি অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করে। সেখান থেকে ওই অর্থ ফিলিপিনো পেসোতে রূপান্তরের পর দুটি ক্যাসিনোতে পাঠানো হয়। পরে জানা যায়, চুরি হওয়া ওই অর্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে চীনা ব্যবসায়ী কিম অংয়ের। সিনেট শুনাতিতে সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকারও করেন তিনি।

৪ এপ্রিল (সোমবার)কিম অং ফিলিপাইনের আর্থিক দুর্নীতি তদন্তকারী সংস্থা অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং কাউন্সিলের (এএমএলসি) কাছে ৮ লাখ ২৮ হাজার ৩৯২ ডলার ফেরত দেন। এর আগে ৩১ মার্চ (বৃহস্পতিবার) তিনি ৪৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার ফেরত দেন। তবে গতকাল মঙ্গলবারের শুনানিতে এএমএলসি নির্বাহী পরিচালক জুলিয়া বাকে-আবাদ জানান, অং ওই অর্থ কেবল ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রেখেছেন। অং এএমএলসি-কে ওই অর্থ বাংলাদেশ সরকারের কাছে ফেরত দেওয়ার কথা বলেননি। তবে তারা এ বিষয়টি ফয়সালা করার চেষ্টা করছেন বলেও জানান আবাদ।

জুলিয়া বাকে-আবাদ

শুনানির পর এএমএলসি নির্বাহী পরিচালকের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জন গোমেজ সাংবাদিকদের কাছে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘এই বিষয়টি আমাদের কাছে একদমই নতুন। কারণ এর আগে আমাদের কাছে এএমএলসি একটি লিখিত বক্তব্য পাঠিয়েছিল, এএমএলসি অফিসে গিয়ে আমাদের অর্থ সংগ্রহ করার জন্য।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এর আগে একটি রসিদে স্বাক্ষর করে ৪.৬৩ মিলিয়ন ডলার গ্রহণ করেছিলাম। দূতাবাসের দ্বিতীয় সচিব ওই অর্থ গণনা করেন। গতকাল আমি এক রসিদে স্বাক্ষর করে ৩৮.২৮ মিলিয়ন পেসো (ফিলিপাইনের মুদ্রা) গ্রহণ করি। দূতাবাস প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের দুই কর্মকর্তা ওই অর্থ গণনা করেন। ওই অর্থ আমাদের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং আমরা তা গ্রহণও করি। কিন্তু এরপর ওই অর্থ গেল ভল্টে।’

গোমেজ জানান, আগামি ১৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে যে ৪৫০ মিলিয়ন পেসো জমা দেবেন বলে কিম অং জানিয়েছেন, তা গ্রহণের জন্যও বাংলাদেশ সরকার তৈরি রয়েছে। তিনি আরও জানান, ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষ ওই অর্থ বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করলে তা স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হবে। তবে আবাদ জানিয়েছেন, কিম অং-এর কাছ থেকে লিখিত স্বীকারোক্তি ছাড়া তারা কোনও অর্থ বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করতে পারবেন না। তিনি বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে কাজ করছি এবং আমি নিশ্চিত, আগামীকাল একটা সমাধান বের করা সম্ভব হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ওই অর্থ যেখানেই থাকুক না কেন, তা পুনরুদ্ধার করা হবে।’

গনজালো দেলাভিউ
এদিকে, কিম অং-এর আইনজীবী ইনোসিও ফেরার বলেন, ‘সঠিক প্রক্রিয়া অবলম্বন না করে এএমএলসি-র ওই অর্থ ফেরত দেওয়া উচিৎ নয়।’ শুনানিতে আবাদ বলেন, ‘এই বিষয়টি ওঠে এসেছে যে, তারা কেবল ওই অর্থ এএমএলসি-র কাছে জমা রাখতে ইচ্ছুক, কিন্তু আমরা তা বাংলাদেশের কাছে ফেরত দিতে চাইছি। আমি মনে করি সকলেই তা জানেন। আমরা এই বিষয়টি পরিষ্কার করতে চাই যে, বাংলাদেশের কাছে ওই অর্থ ফেরত দেওয়াতে তার (কিম অং) কোনও আপত্তি নাই। শুধুমাত্র বস্তুগতভাবে ওই অর্থ বাংলাদেশের কাছে ফেরত দেওয়া বাকি রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে তিনি (গোমেজ) রসিদে স্বাক্ষর করে ওই অর্থ গ্রহণ করে নিয়েছেন।’ তবে চলমান প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রদূত গোমেজ যে সন্তুষ্ট নন, তা তার বক্তব্যেই ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, “কিন্তু আপনি (আবাদ) আমাকে ফোন করে বলেছিলেন, ‘আধ-ঘন্টার মধ্যে অর্থ আসছে। আপনাকে তা গ্রহণ করতে হবে, আপনাকে রসিদে স্বাক্ষর করে ওই অর্থ গ্রহণ করতে হবে।’ আপনি আরও বলেছিলেন, ‘আপনাকে প্রতিটা ডলার গোনার সময় সামনে থাকতে হবে।’”

এই অবস্থায় মঙ্গলবার ব্লু রিবন কমিটির চেয়ারম্যান সিনেটর তেওফিস্তো গুইনগোনা বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমি মনে করি আপনাদের কোনও পক্ষের মধ্যেই কোনও চুক্তি নেই। দেখি, আমরা কিভাবে এই সমস্যার সমাধান করতে পারি।’ তার মধ্যস্থতায় আজ বুধবার এএমএলসি এবং বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের মধ্যে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।  বুধবার ওই বৈঠকের পর সিনেটর গুইনগোনা জানান, এএমএলসি আদালতের আদেশ চেয়ে একটি দেওয়ানি বাজেয়াপ্তকরণের মামলা দায়ের করবে। এর মাধ্যমে ক্যাসিনো ব্যবসায়ী কিম অং-এর কাছ থেকে ফেরত পাওয়া অর্থ বাজেয়াপ্ত করে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হবে।

তেওফিস্তো গুইনগোনা

সাংবাদিকদের সঙ্গে টেলি-সাক্ষাৎকারে সিনেটর বলেন, ‘এএমএলসি এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের মধ্যকার বৈঠকে এএমএলসি সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, কিম অং লিখিত অনাপত্তি না দিলেও তারা দেওয়ানি বাজেয়াপ্তকরণের মামলা দায়ের করে অর্থ হস্তান্তর প্রক্রিয়া এগোতে আদালতের আদেশ নিবে।’ আদালতের আদেশ পাওয়ার পর বাংলাদেশ সরকারের কাছে অর্থ হস্তান্তরে আর কোনও আইনি বাধা থাকবে না বলে জানান তিনি।

গুইনগোনা আরও বলেন, ‘সাধারণত আদালতের এ ধরনের আদেশ পেতে খুব একটা সময় লাগে না। এমন মামলায় যদি কেউ ওই অর্থকে তার নিজের অর্থ বলে দাবি করে, তাহলে কিছুটা সময় লাগে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এমনটা হচ্ছে না। তাই পুরো বিষয়টি ফয়সালা করতে সম্ভবত এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।’ তিনি সাংবাদিকদের আরও বলেন, ‘আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে, এই মুহূর্তে প্রধান কাজ হলো একটি বাজেয়াপ্তকরণের মামলা দায়ের করা। কারণ এটাই সঠিক আইনি প্রক্রিয়া, যা অনুসরণ করতেই হবে। এখানে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, যার ভিত্তিতে আদালতে যাওয়া হচ্ছে – এক. ওই অর্থ বাংলাদেশের, দুই. ওই অর্থ বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো উচিত এবং তিন. তা বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো আদেশ প্রদান করতে হবে।’ সূত্র: ফিলস্টার, ইনকোয়ারার।

/এসএ/বিএ/

লাইভ

টপ