সুনামগঞ্জে প্রকৃতির অবিশ্বাস্য মুগ্ধকর সৌন্দর্য

ট্রাভেলগ সুনামগঞ্জে প্রকৃতির অবিশ্বাস্য মুগ্ধকর সৌন্দর্য

Send
রবিউল ইসলাম
প্রকাশিত : ২২:৪০, নভেম্বর ১০, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:৪৭, নভেম্বর ১০, ২০১৮

কম করে হলেও দশবার সিলেটে এসেছি। তবুও বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব এই অঞ্চলের সৌন্দর্য পুরোপুরি উপভোগ করা হয়নি। বহুবার কেবল বেড়াতে এলেও এই যাত্রায় কাজের সুবাদে সিলেটে আসা। চোখ মেলে সুনামগঞ্জের সৌন্দর্যে ডুবে থাকার সিদ্ধান্ত তাই নেওয়া হয়েছে হুট করে। একবার বলতেই রাজি হয়ে গেলেন দুই ক্রীড়া সাংবাদিক ইয়াছিন হাসান ও অম্লান মোস্তাকিম হোসেন।

সিলেট স্টেডিয়ামের অভিষেক টেস্টের (বাংলাদেশ বনাম জিম্বাবুয়ে) আগের দিন থেকেই এই ম্যাচ তিন-চার দিনে শেষ হওয়া নিয়ে কথা হচ্ছিল! অবশ্যই সেটা বাংলাদেশের জয়ের কথা ভেবেই। বাস্তবতা যাই হোক, ম্যাচ চতুর্থ দিনে শেষ হওয়ায় আমাদের তিনজনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথটা সহজ হয়ে গেলো। স্থানীয় সাংবাদিক কাইয়ুম ভাইকে সুনামগঞ্জ যাওয়ার ইচ্ছের কথা জানাতেই তিনি পথ বাতলে দিলেন। শুধু তাই নয়, আগ বাড়িয়ে সুনামগঞ্জের আরেক স্থানীয় সাংবাদিক সাদি ভাইকে ফোনে আমাদের সহযোগিতা করার অনুরোধও জানিয়েছেন।

এরপর পুরো রাতে টাঙ্গুয়ার হাওর, নীলাদ্রি লেক, যাদুকাটা নদী, বারিক্কা টিলা ও শিমুল বাগান দেখার রোমাঞ্চ নিয়ে প্রায় নির্ঘুম রাত কাটিয়েছি। এমন সৌন্দর্যের মোহময় হাতছানিতে কারই ঘুমই আসে!

সিলেট টেস্টের পঞ্চম দিন যেহেতু অফুরান অবসর নিয়ে হাজির হলো, তাই একটু সময়ও নষ্ট না করার চেষ্টা ছিল আমাদের। ভোরেই সুনামগঞ্জ যাওয়ার উদ্দেশে কুমারগাঁও বাস্টস্ট্যান্ডে গেলাম। আধো ঘুম আর আধো জাগরণের অদ্ভুত অনুভূতিতে চলছিল বাস ভ্রমণ।

দেড় ঘণ্টার জার্নি শেষে সুনামগঞ্জে পৌঁছাই আমরা। ততক্ষণে ক্ষুধায় পেটে শুরু হয়েছে প্রজাপতির ওড়াওড়ি! নাশতার ফরমায়েশ দিয়েই সাদিক ভাইকে ফোন দিলাম। তিনি ফোনেই তাহিরপুরে সব ধরনের ব্যবস্থা করে দিলেন। সেই সঙ্গে তার ছোট ভাই চয়নকে আমাদের খেয়াল রাখতে বলে দিলেন।

শুরু হলো আমাদের তাহিরপুর যাত্রা। সুনামগঞ্জের আব্দুর জহুর সেতু থেকে সিএনজিতে চড়ে ৩৫ কিলোমিটার দূরে তাহিরপুরে পৌঁছালাম। এজন্য আমাদের গুনতে হয়েছে ৪৫০ টাকা। তাহিরপুর বাজারে পৌঁছেই চয়ন ভাইকে ফোন দিলাম। তিনি বাজারে আমাদের অপেক্ষাতেই ছিলেন। চয়ন ভাই আগে থেকেই আমাদের জন্য একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা ঠিক করে রেখেছিলেন। পর্যাপ্ত শুকনো খাবার ও ১০০ টাকায় দুটি লাইফজ্যাকেট নিয়ে নৌকায় উঠে পড়ি।

আগেভাগে নৌকা বা ট্রলার ঠিক করা না থাকলেও পর্যটকদের চিন্তার কোনও কারণ নেই। তাহিরপুর বাজারে সবসময়ই নৌকার মাঝিরা ভ্রমণপিপাসুদের জন্য অপেক্ষায় থাকেন। যে যার মতো দেখেশুনে নৌকা ঠিক করে নিতে পারবেন দেড় হাজার টাকা থেকে ছয় হাজার টাকার মধ্যে।

এরপর সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বেলা ১১টায় আমরা টাঙ্গুয়ার হাওরের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লাম। টাঙ্গুয়ার হাওরের স্বচ্ছ নীল জলরাশির বুক চিরে চলছিল ইঞ্জিনচালিত নৌকা। নৌকার ছাদে বসে আমরা ডুবে যাচ্ছিলাম আশপাশের প্রকৃতির অবিশ্বাস্য মুগ্ধকর সৌন্দর্যে। কতোদিন পর চোখে এমন আরামের দৃশ্য ধরা দিলো!

যতই এগোচ্ছি ততোই চলে যাচ্ছিলাম অকূল পানির দুনিয়ায়। যতোদূর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। দূর দিগন্তের দিকে মনে হচ্ছিল আকাশও মাথা নিচু করে ডুবে যাচ্ছে জলের অতলে। আমরা তিনজন গান ধরলাম, ‘এই পথ যদি শেষ না হয়।’ জলরাশিকে আমরা পথই বানিয়ে ফেললাম! অম্লান উদাস মনে গান ধরলো। তাতে প্রভাবিত হয়েই কিনা ইয়াসিনও গান শুরু করলো, ‘তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দিবোরে।’ আমাদের সঙ্গে কোরাসে মাতলেন দুই মাঝি।

নিজেকে হারিয়ে ফেলছিলাম প্রাকৃতিক সৌর্ন্দযঘেরা সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা ও তাহিরপুর উপজেলার মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত টাঙ্গুয়ার হাওরের মাঝে। যেখানে মেঘালয় পাহাড় থেকে ৩০টিরও বেশি ঝরনা এসে মিশেছে। স্বচ্ছ টলমলে জলের নিচে দেখা যায় জলজ উদ্ভিদ।

আমরা হাওরের শেষপ্রান্তে পৌঁছে ওয়াচ টাওয়ারে গিয়ে উঠি। সেখান থেকে মেঘালয়ের পুরো পাহাড়ি পরিসর দেখা যায়। ওয়াচ টাওয়ারের পাশে ঘন জঙ্গল অনেকটা সিলেটের রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্টর মতো। বর্ষাকালে এই জায়গায় কিছু পয়সা খরচ করে ছোট ছোট নৌকায় চড়ে ঘুরে বেড়ানো যায়।

ঘড়ির কাঁটায় তখন বেলা আড়াইটা। ততক্ষণে পেট বাবাজি ক্ষুধার কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল। মাঝি জানালেন, কিছুক্ষণের মধ্যে টেকেরঘাটে নৌকা ভিড়বে। সেখানে পাওয়া যাবে দুপুরের খাবার। টেকেরঘাটের নীলাদ্রি হোটেলে দেশি মুরগি, রুই মাছ, কই মাছ ও ভর্তা-ভাজি দিয়ে মাত্র ১৩০ টাকায় পেট ভরে খেলাম। হোটেল মালিক জয়নাল চাচা মুখে হাসি রেখে বললেন, ‘আপনার আসেন বলেই তো আমরা বেঁচে আছি!’

খাওয়া-দাওয়া শেষে খুব আয়েশ করে এককাপ চা খাওয়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সেই ইচ্ছে দমন করে আবারও যাত্রা শুরু করতে হলো। তখনও সুনামগঞ্জের অনেক কিছু দেখার বাকি। টেকেরঘাট থেকে আমরা দুটি মোটরসাইকেল ঠিক করলাম ৮০০ টাকায়। তারা নীলাদ্রি লেক, বারিক্কা টিলা, যাদুকাটা নদী ও শিমুল বাগান ঘুরিয়ে আমাদের সুনামগঞ্জে নিয়ে যাবেন।

মোটরসাইকেল ছুটলো নীলাদ্রি লেকের দিকে। এটি টেকেরঘাট চুনাপাথরের পরিত্যক্ত খনির লাইমস্টোন লেক। স্থানীয় লোকজন একে ‘নীলাদ্রি লেক’ বলেই জানে। এর নামটা যেমন সুন্দর, রূপও তেমনই মোহনীয়। পানির রঙ সেখানে স্বচ্ছ নীল। মাঝের টিলা আর ওপারে পাহাড়ের নিচের অংশ বাংলাদেশের শেষ সীমানা। বড় উঁচু পাহাড়টিতে সীমানা কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া আছে।

নীলাদ্রি লেকের রূপ দর্শনের পর আমাদের গন্তব্য বারিক্কা টিলা। যাদুকাটা নদীর পাশেই অবস্থিত প্রায় ১৫০ ফুট উচ্চতার এই টিলা। স্থানীয়রা একে ‘বারিক টিলা’ বলে থাকে। এর পিলারের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। সুন্দর গ্রামের পাকা রাস্তা দিয়ে হাতের বাম পাশে মেঘালয় রেখে ছুটে চলছিল মোটরসাইকেল। একসময় মোটরসাইকেল খাড়া রাস্তা ধরে ওপরে উঠে গেলো। তখন ভয়ই পাচ্ছিলাম পড়ে যাই কিনা! যদিও আমরা হেঁটেই টিলায় উঠলাম। টিলা থেকে মেঘালয়ের অপরূপ সৌন্দর্যে ডুবে গেলো মন। টিলার ওপরে খ্রিস্টানদের একটি ছোট চার্চ চোখে পড়লো। দেখতে পেলাম টিলার ওপরে একদল ছেলে ক্রিকেট খেলায় মত্ত। ক্রিকেট যেন আমাদের ছাড়ছিলই না!

বারিক্কা টিলা হয়ে আমরা এগিয়ে গেলাম যাদুকাটা নদীর দিকে। তখন সূর্যের গায়ে মরা রঙ। দেখা দিয়েছে গোধূলির রক্তিম আভা। এখানে এত সুন্দর জায়গার দেখা পাবো স্বপ্নেও ভাবিনি। যাদুকাটা নদীর স্বচ্ছ জলে ঝাঁপিয়ে পড়তে ইচ্ছে হলো। বারিক্কা টিলার ওপর দাঁড়িয়ে থেকেই যাদুকাটার নদী পুরো সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। ঝকঝকে আকাশের সঙ্গে পুরো এলাকাকে মনে হবে যেন রঙিন ক্যানভাস। বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে অম্লান তো বলেই দিলেন, এত সুন্দর কী করে হয়! অতিমুগ্ধতা প্রকাশের সময় মানুষ একরকম অদ্ভুত অসহায়ত্ব বোধ করে। কিছুক্ষণের জন্য আমাদের অবস্থাও সেই রকমই। ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না!

শীতকালে বেড়াতে গেলে মাইলজুড়ে বিস্তৃত বালুময় তীর দেখে বর্ষাকালে নদীর উন্মত্ততা সম্পর্কে ধারণা পেয়ে যাবেন। যাদুকাটা নদীর স্বচ্ছ নীল জলের স্বচ্ছতা এতই যে, তীর থেকেই নদীর তলদেশ দেখা যায়।

যাদুকাটার পূর্বে শাহ আরেফিনের (র.) আস্তানা ও লাউড়েরগড় গ্রামে প্রতি বছর চৈত্র মাসে প্রায় একই সময়ে দুই ধর্মালম্বীদের ওরস ও নদীতীরে পুণ্যস্নান হয়। দুই উৎসব ঘিরে তখন নদীতীরে বসে দুই ধর্মের মানুষের মিলনমেলা। এই মিলনমেলার খোঁজখবর নেওয়ার সময় ঘড়ি জানাচ্ছিল যাদুকাটার সঙ্গে আমাদের মিলন আপাতত ভাঙতে হবে।

এবার আমাদের যেতে হবে শিমুল বাগানে। যাদুকাটা নদীর তীরে ১০০ বিঘারও বেশি জায়গাজুড়ে গড়ে উঠেছে শিমুল বাগান। বসন্তে সেখানে একসঙ্গে দুই হাজার গাছে পাপড়ি মেলে শিমুল। নদীর ওপারে মেঘালয়ের পাহাড়, মাঝে যাদুকাটা নদী আর এপারে রক্তিম ফুলের সমারোহ, অগুণতি পাখির কলকাকলি। এর চেয়ে মোহময় আর কী হতে পারে! বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে এই শিমুল বাগানে সারি সারি গাছের সবুজ পাতার সুনিবিড় ছায়া পর্যটকদের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়। বর্ষা, বসন্ত কিংবা হেমন্ত; একেক ঋতুতে এর একেক রূপ।

শিমুল বাগান দর্শন শেষে আমাদের গন্তব্য এখন সুনামগঞ্জে। মোটরসাইকেলে চড়ে ফিরে এলাম আব্দুর জহুর সেতুতে। এরপর দুই ঘণ্টার বাস জার্নির পর সিলেট। রাতে সিলেটের প্রসিদ্ধ রেস্তোরাঁ পানসীতে জম্পেশ খাওয়া-দাওয়া শেষে রাতের বাসে আবারও ঢাকায় ফেরার জার্নি।

/জেএইচ/
টপ