ট্রাভেলগ বগা লেকে মাছের স্পা!

Send
রিয়াসাদ সানভী
প্রকাশিত : ১৮:২১, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:২৪, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৯

বগা লেকপ্রথমে দূরে ভেসে থেকে ভীতু চোখে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ। বিপদের শঙ্কা নেই টের পেয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। প্রথমে একটা-দুটো, তারপর ঝাঁকে ঝাঁকে। কিছুক্ষণ পর তাদের আলতো ছোঁয়া। তারপরও পা দুটোর নড়াচড়া না দেখে শুরু হলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ঠোকর। ওদিকে আমার হাসি পেলো বলে! অনুভূতিটা কাতুকুতুর মতো। বগা লেকের ঘাটলায় পা ডুবিয়ে বসে থেকে এমন অভিজ্ঞতা হলো। চারপাশে অসংখ্য তেলাপিয়া ও পুটির ছানা আলতো কামড়ে পায়ের পাতার চামড়া থেকে খাদ্য খুঁটিয়ে নিচ্ছে। একটু ধাতস্ত হওয়ার পর ব্যাপারটি দারুণ আরামদায়ক মনে গেলো। কেউ যেন আলতো করে পা জোড়া টিপে দিচ্ছে। শহুরে কায়দায় বললে স্পা!

বগা লেকে মাছের স্পা!এবার বান্দরবান আসার পর থেকে আরামের পর আরাম। এতটা বিলাসী বান্দরবান সফর এর আগে হয়নি। গতকাল সন্ধ্যায় কমলাবাজার থেকে বগা লেক পর্যন্ত উঠে আসতে যা একটু বেগ পেতে হয়েছে। রওনা দিয়েছিলাম সেই সাতসকালে। বিশাল ছাদখোলা জিপে আমরা মাত্র চারজন। এই পরিবেশে কয়েকজন আমুদে লোক একত্র হলে যা হয় আর কী! চারপাশের বাঁধনহারা পাহাড়ি প্রকৃতি আর আমাদের হাসির উচ্ছ্বাস মিলে জিপের কর্কশ ইঞ্জিনের শব্দকে ছাপিয়ে গেয়ে উঠলো ঘর পালানো ডাকের সুর। এ যেন চিরায়ত জীবনের আনন্দ। শহুরে জীবনের গণ্ডি কারই বা ভালো লাগে। এখানেই তো প্রকৃত জীবন। শহরে যা যাপন তার সবই যেন ছায়া। প্রাণহীন কঙ্কাল যেন। প্রতিবার রুমা কিংবা থানচি যাওয়ার সময় এমন অনুভূতি হয়। হয়তো এটাই বাঁচার রসদ।

বগা লেকরুমা এসে পেয়ে গেলাম সাদেককে। তৌহিদ খুব ব্যস্ত। তার বড় ভাই সাদেক আমাদের সঙ্গী। তিনি দারুণ মজার মানুষ। আমরা ১১ মাইল পেরিয়ে শৈরতন পাড়ার কাছ পর্যন্ত গিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। হালকা বৃষ্টি শুরু হলো এর মধ্যে। মিনিট কয়েক চলার পর সেও বিদায় নিলো। শেষ বিকালে একটানা হেঁটে ভরসন্ধ্যায় যখন বগা লেকে সিয়ামদির কাছে পৌঁছালাম, এলাকা মোটামুটি সুনসান। পর্যটকদের খুব একটা ভিড় নেই। দলের বাকিরা কেউ এর আগে কখনও ট্রেক করেনি। এ কারণে সবাই ক্লান্ত। সিয়ামদির হাতে গরম ভাত, আলু ভর্তা, ডিম ভাজি ও ডাল দিয়ে ভরপেট খেয়েই যে যার মতো ঘুমের দেশে।

এক ঘুমে সকাল সাতটা। মিষ্টি আলোয় ভাসছে গোটা বগা লেক। আজ আমাদের কেওক্রাডং যাওয়ার কথা। চটপট নাশতা সেরে ক্যামেরা হাতে ঘাটলায় এসে বসলাম। তখনই মাথায় এলো মাছদের দিয়ে বিনামূল্যে মজাদার স্পা করানোর বুদ্ধিটা। আমার দেখাদেখি বাকিরাও দৌড়ে এলো। বাইরের দেশে যদি সাপসহ আরও কত কী দিয়ে স্পা করানো যায়, আমরা আর পিছিয়ে থাকি কেন! ইচ্ছে করলে প্রকৃতি থেকেই আমাদের সিংহভাগ চাহিদা মেটানো সম্ভব। এমন সব ভাবতে ভাবতে সময় কতটা কেটে গেছে টের পাইনি। দেখা গেলো পায়ের পাতা একেবারে ফরসা করে দিয়েছে প্রাকৃতিক স্পার অক্লান্ত শ্রমিকেরা (মাছ)! ঠাণ্ডা স্বচ্ছ টলটলে পানি থেকে পা তুলতে মন চায়নি। আরামটা ততক্ষণে পেয়ে গেছি। উঠতে হলো শেষ পর্যন্ত।

বগা লেকে মাছের স্পাশর্ত একটাই— লেকের পানিতে সাবধানে নামতে হবে। এর আগে দুর্ঘটনার নজির আছে কিনা। তাই বগা লেকে কখনোই স্নান করা ঠিক নয়। একান্তই নামার ইচ্ছে থাকলে কয়েকজন একসঙ্গে নামা সুবিধাজনক। প্রয়োজন হলে লাইফ জ্যাকেট পরে নেওয়া যায়। যেকোনও সমস্যা গাইড ও সেনা ক্যাম্পে অবহিত করতে হবে। যেহেতু আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা, তাই তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি অবমাননা হয় এমন কিছু বলা ও করা থেকে বিরত থাকা বাঞ্ছনীয়। বণ্যপ্রাণী ও পরিবেশের সমস্যা হয় এমন কিছু করা যাবে না। বিশেষ করে অনেকের মধ্যে প্লাস্টিকের অপচনশীল দ্রব্য ফেলার প্রবণতা আছে। এ কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে।

বগা লেকমনে রাখবেন
বগা লেক যেতে হলে প্রথমে আসতে হবে বান্দরবান শহরে। ঢাকা থেকে বান্দরবানের বাস ভাড়া নন-এসি ৬২০ টাকা। এসি ১১০০ টাকা। হানিফ, শ্যামলী, এস আলম, দেশ ট্রাভেলস, সেন্টমার্টিনসহ বেশ কয়েকটি বাস চলাচল করে ঢাকা-বান্দরবান রুটে। বান্দরবান বাসস্ট্যান্ড থেকে অটোতে চড়ে সরাসরি যেতে হবে রুমা বাসস্ট্যান্ড। ভাড়া ১৫ টাকা। সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত প্রতি ঘণ্টায় রুমার বাস ছেড়ে যায়। ভাড়া ১২০ টাকা।

রুমা বাজার থেকে স্থানীয় প্রশাসন অনুমোদিত গাইড নিতে হবে। দিন হিসেবে তার পারিশ্রমিক ৬০০ টাকা। রুমা বাসস্ট্যান্ডে কিছু আনুষ্ঠানিকতা পালন করতে হয়। উপজেলা প্রশাসন থেকে নেওয়া একটি ফর্ম পূরণ করে জমা দিতে হবে স্থানীয় সেনা ক্যাম্পে। এছাড়া রুমা থানায় নাম লিপিবদ্ধ করতে হয়। রুমা থেকে এখন সরাসরি জিপ যায় বগা লেক পর্যন্ত। ওয়ান-ওয়ে ভাড়া ২৫০০ টাকা। একেকটি জিপে আট থেকে দশজন বসতে পারে। দলবেঁধে গেলে খরচ কিছুটা কম পড়ে।

বগা লেকে মাছের স্পাবগা লেকে থাকা-খাওয়ার পর্যাপ্ত সুবিধা রয়েছে। স্থানীয় আদিবাসীদের তৈরি কটেজে থাকতে পারেন। খরচ পড়বে ১৫০ থেকে ২২০ টাকার মধ্যে। খাবারেও আইটেম ভেদে দামের পার্থক্য হয়। তবে দেড়শো থেকে দুইশো টাকার মধ্যে ভরপেট খেতে পারবেন। বগা লেকেও সেনা ক্যাম্পে নাম লিপিবদ্ধ করতে হয়।

ছবি: লেখক

/জেএইচ/
টপ