ট্রাভেলগ বসন্ত এসে গেছে...

Send
শাকিলা সিমকি
প্রকাশিত : ০০:০০, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:০৭, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০১৯

মস্কোতে বসন্তের রূপশীতের হিম চাদর সরিয়ে বসন্ত এসে গেছে। বাংলাদেশের মতোই রাশিয়ায় বসন্ত চলছে। এখানে বসন্তকে বলা হয় ‘ভেসনা’। কিন্তু দুই দেশের বসন্তে বিস্তর ফারাক। বাংলাদেশের মতো এখানকার বসন্তে নেই পলাশ ছাওয়া বন, কৃষ্ণচূড়া ঢাকা রাস্তা কিংবা কোকিলের কুহু কুহু ডাক। রাশিয়ায় শীত আর বসন্ত একই বলা চলে। ভিন্নতা খুব একটা চোখে পড়ে না। সাদা তুলতুলে বরফে ছাওয়া এখানকার বসন্ত।

গত সপ্তাহে ঠাণ্ডা কমে গিয়েছিল। রোদ হেসেছিল বলে বরফ গলতে শুরু করেছিল। আমিও খুশিতে বাকবাকুম করছিলাম! ভেবেছি এবার একটু স্বাভাবিক স্বস্তি মিলবে। কিন্তু কোথায় কী! পাগলা হাওয়ায় আবারও সব বরফে ছেয়ে গেছে। একদিন সকালে দেখি গাছপালা, বাড়ির ছাদ ও পথঘাট নরম তুলতুলে বরফ কনায় ভরে উঠেছে।

প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার লড়াই দেখে রুশদের জন্য এক ধরনের মায়া হয়। রাশিয়ায় বছরে নয় মাস শীত আর শৈত্যপ্রবাহ চলতে থাকে। ঋতু চারটি হলেও এখানে নয় মাস শীত থাকে। বরফ কিংবা তুষারপাতে বিলাস করার ব্যাপার থাকলেও দুর্ভোগ কম নয়। বরফে হাঁটাচলা করা বেশ কষ্টদায়ক। বরফ জমে জমে পথ পিচ্ছিল হয়ে থাকে। খুব সাবধানে না হাঁটলে যেকোনও সময় পিছলে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সাবধান থাকার পরও অনেককে পড়ে যেতে দেখেছি।

বরফ গলার সময়টা তো আরও বাজে। বরফ গলা জলে ময়লা জমে রাস্তাঘাটের সে কী কদাকার অবস্থা যে হয়! নয় মাস শীতে পুরো শহরই জরাজীর্ণ থাকে। গ্রাম আর অন্য শহরগুলোতে কেমন নিঃসঙ্গতা বিরাজ করে ভাবুন। সেইসব জায়গায় মস্কো এক মরীচিকা। দূরের শহরগুলোর জন্য মস্কো হলো আশার আলো। রাশিয়ার রাজধানীতে আসার আকাঙ্ক্ষা থাকে সবার। তারা ভাবে, মস্কো এলেই বুঝি সর্বসুখ ধরা দেবে! আন্তন চেখভের ‘থ্রি সিস্টার্স’ নাটকে তিন বোনের যেমন স্বপ্ন ছিল মস্কো আসার। এখানে এসে অনেক সিনেমা, গান, কবিতায় ও দেখেছি মস্কোতে আসার জন্য সবার ব্যাকুলতা। এর কারণও আছে।

গ্রামে চারপাশে বরফ আর বরফ। সন্ধ্যা নামে বিকালের মধ্যে। রাতে কনকনে ঠাণ্ডা। চারপাশে গুমোট নীরবতা। এমন পরিবেশে কতদিন থাকতে ভালো লাগবে ভাবুন তো। তবুও রুশদের থাকতে হচ্ছে। কাজের উদ্দেশে ঠাণ্ডার মধ্যেই বের হয় তারা।

রাশিয়ার কোনও কোনও জায়গায় মাইনাস ৩০ কিংবা এর নিচে তাপমাত্রা চলে যায় হরহামেশা। সাইবেরিয়ায় নাকি মাইনাস ৩০ নিয়মিত চিত্র। আমাদের ডর্মেটরিতে থাকা সাইবেরিয়ান এক ছেলের কাছে জেনেছি। এর মধ্যেই তারা স্বাভাবিক কাজ ও চলাফেরা করে। এছাড়া উপায় নেই। এত প্রতিকূলতা দমিয়ে রাখতে পারে না তাদের।

মস্কোতে শীত আর বসন্তের একই রূপরাশিয়ায় ছেলেদের চেয়ে মেয়ের সংখ্যা বেশি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এই অবস্থা। এখানে মেয়েরা সব ধরনের কাজ করে। বাস, ট্রেনও চালায়। ঠাণ্ডায় বৃদ্ধারাও বসে না থেকে কাজে বেরিয়ে পড়েন। বিশেষ করে বৃদ্ধারা লিফলেট বিলি করেন। আমার ইউনিভার্সিটিতে যাওয়ার পথে দেখলাম, এক বৃদ্ধা ঠাণ্ডা বরফের ওপর কুঁজো হয়ে বসে ভিক্ষা করছেন। জীবন এখানে বড়ই কঠিন।

মস্কোতে আরেকটা বিষয় খেয়াল করেছি— ‘সাদা রাত্রি’। এখানে রাতে ঘুটঘুটে অন্ধকার থাকে না। সন্ধ্যা নামে বিকাল পাঁচটা থেকেই। চারপাশে এত আলোকসজ্জা যে, রাত আর দিনের মধ্যে পার্থক্য খুব বেশি নয়। তাছাড়া সাদা বরফের প্রতিফলনের কারণে রাত আর রাত থাকে না। তাই আকাশে চাঁদ থাকলেও এখানে বাঙালিদের মতো জোছনা বিলাসের সুযোগ নেই।

মস্কোতে আসার পর মেলা দিন আকাশ ভরা তারা দেখিনি। কিন্তু হঠাৎ মাঝরাতে জানালা দিয়ে খোলা আকাশে দেখি মস্ত বড় চাঁদ উঠেছে। আবেগে মন ভেসে গেলো। চিরচেনা চাঁদটাকে মন ভরে দেখলাম। মনে হলো আমার দেশের চাঁদ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মস্কোতে বসে বরফের ভাঙাগড়ার খেলা দেখেই দিন কাটে। এর মধ্যে মনের মাঝে যাওয়া-আসা করে বাংলাদেশের বসন্ত বাতাস।
ছবি: লেখক

/জেএইচ/
টপ