পথে পথে বেড়ানো, কাজ ও ক্লাস করা একটি ব্যাকপ্যাক পরিবার

Send
নুসরাত টিসা
প্রকাশিত : ১৩:২২, মে ০২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:২২, মে ০২, ২০১৯

কোস্টারিকার কোয়েপোসে দুই সন্তানকে নিয়ে বুশ ও ভিঞ্জে দম্পতিমধ্য আমেরিকার দেশ কোস্টারিকায় সন্তানদের নিয়ে ক্লিন্ট বুশ ও অ্যাস্ট্রিড ভিঞ্জের বেড়ানোর ইচ্ছে ছিল অনেকদিনের। এর নেপথ্যে আছে কষ্টের ঘটনা। ২০০৯ সালে বিয়ের পর কোস্টারিকার প্রশান্ত মহাসাগর তীরবর্তী কোয়েপোস শহরে মধুচন্দ্রিমা উদযাপন করেন তারা। ভালোই ছিল সব।

ভ্রমণের শেষ দিন ঘরে ফেরার ফ্লাইটের জন্য বিমানবন্দরে যেতে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন এই দম্পতি। হঠাৎ চুরি হয়ে যায় তাদের একটি ব্যাকপ্যাক। এতে অন্যান্য দরকারি জিনিসের সঙ্গে ছিল বুশের ফোন, ক্যামেরা ও একটি ট্রাভেল জার্নাল। ভাগ্য ভালো পাসপোর্ট আর ওয়ালেট খোয়া যায়নি। ব্যাকপ্যাক চুরি হওয়া ও বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে বাসে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় তাদের হানিমুনের আনন্দ ঢাকা পড়ে যায়।

এ ঘটনার একদশক পর ক্লিন্ট বুশ ও অ্যাস্ট্রিড ভিঞ্জে দম্পতি তিন সন্তানের দু’জনকে নিয়ে বেড়াতে আবারও কোস্টারিকায় যাওয়ার মনস্থির করেন। পুরনো দুঃখের ঘটনা ভুলে দেশটি থেকে সুখের স্মৃতি নিয়ে ফেরার বাসনা জন্মে তাদের মনে। কিন্তু এই ১০ বছরে শুধু তাদের পরিবারেই পরিবর্তন আসেনি, বদলে গেছে কোয়েপোস শহরের চিত্র। সেখানে নিরিবিলি সময় কাটানোর আর সুযোগ নেই। এটি হয়ে গেছে জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য। তাদের মধ্যে আমেরিকান পর্যটকের সংখ্যা বেশি। সুশি ক্যাফে, ওয়াই-ফাই হটস্পটসহ অনেক কিছু যুক্ত হয়েছে নতুন।

কোয়েপোসে মধুচন্দ্রিমা উদযাপনের সময় ম্যানুয়েল অ্যান্টোনিও ন্যাশনাল পার্কে অনেকটা সময় কাটিয়েছিলেন এই দম্পতি। এখন সেখানে প্রতিদিন প্রায় ৬০০ ভ্রমণপিপাসুর সমাগম ঘটে। সপ্তাহের শনিবারে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭০০। প্রতিদিন পর্যটকেরা ভোর থেকে লাইন ধরে পার্কের এন্ট্রি পাসের জন্য অপেক্ষা করেন। দেখে মনে হবে যেন বিয়ন্সের কনসার্ট দেখবেন তারা!

দুই সন্তানকে ঘিরে জীবনকে ব্যাকপ্যাকে সাজিয়েছেন ক্লিন্ট বুশ ও অ্যাস্ট্রিড ভিঞ্জেআমেরিকার অনেক পরিবারের জন্যই দেশের বাইরে একবার হলেও বেড়াতে যাওয়া বিলাসিতা। কিন্তু বুশ-ভিঞ্জে দম্পতি ব্যাপারটাকে দেখতেন অন্যভাবে। সিয়াটল নিবাসী এই যুগল বেশ কিছুদিন থেকেই লক্ষ্য করছিলেন, দৈনন্দিন ব্যস্ততা আর প্রতিদিনের ভিড়ভাট্টা-হট্টগোল তাদের একান্ত ব্যক্তিগত সময় কেড়ে নিচ্ছে। একইসঙ্গে ডে-কেয়ারে দিন কাটানো সন্তানদের সঙ্গে তাদের দূরত্ব বেড়ে চলেছে। একসময় তারা ভাবলেন, পথে পথে থাকার সঙ্গে গোটা পৃথিবীকে নিজেদের অফিস আর ক্লাসরুম বানিয়ে নিলে কেমন হয়?

সেই ভাবনা থেকে কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রদেশে ফ্যামিলি ট্র্যাভেল কনফারেন্সে অংশ নেন বুশ-ভিঞ্জে দম্পতি। যারা সবসময় ভ্রমণ করে এমন কয়েকটি পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করেন তারা। তখন নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা সম্ভব বলে মনে হয় তাদের।

লক্ষ্যটা তাহলে কী? পুরোপুরি তিন বছর ছোট দুই সন্তানকে নিয়ে পথে পথে দিন কাটানো! ক্লিন্ট বুশের আগের সংসারে আরেক ছেলে আছে। ভিঞ্জের সঙ্গে তার সন্তানেরা হলো মিরা (৮) ও জুলিয়ান (৫)। দু’জনের মধ্যে জুলিয়ান খুব ছোট হওয়ায় তাকে একরকম বয়ে বেড়াতে হয়েছে।

পরিবারটি একসময় পথচলা শুরু করে। তারা চষে বেড়ান যুক্তরাষ্ট্র। এরপর মেক্সিকো পাড়ি দেন। সেখান থেকে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়ে পৌঁছান কোস্টারিকায়। দেশটির রাজধানী সান হোজে থেকে ১৬৫ কিলোমিটার  (১০৩ মাইল) দূরে প্রশান্ত মহাসাগর তীরবর্তী উপকূলে পুন্তারেনাস প্রদেশের কোয়েপোস শহরে দুই সন্তানকে নিয়ে যেতে পেরে আনন্দ পান এই দম্পতি। সেখানকার জনপ্রিয় আকর্ষণ তিন বর্গমাইল জুড়ে সংরক্ষিত ম্যানুয়েল অ্যান্টোনিও ন্যাশনাল পার্ক বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর নিবিড় আবাসস্থল। এছাড়া আছে শতাধিক প্রজাতির পাখি। সেখানে রয়েছে সবুজের নয়নাভিরাম সমারোহ। পার্কের অভ্যন্তরীণ  চারটি বেলাভূমিতে ঘুরে বেড়ানো ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে বেশ উপভোগ্য।

কোস্টারিকার ম্যানুয়েল অ্যান্টোনিও ন্যাশনাল পার্কে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণীদীর্ঘ সময়ব্যাপী ভ্রমণের বন্দোবস্ত করতে এই দম্পতিকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। ক্লিন্ট বুশের পেশা হলো বিভিন্ন কোম্পানি ও ব্র্যান্ডের ওয়েবসাইট তৈরি করা। এই কাজ যেখানে-সেখানে করা তার জন্য বাঁ-হাতের খেল! অন্যদিকে তার স্ত্রী অ্যাস্ট্রিড ভিঞ্জে ‘দ্য ওয়্যান্ডারিং ডটার’ নামে একটি পারিবারিক ব্লগ পরিচালনা করেন, পাশাপাশি ফ্রিল্যান্স লেখালেখির কাজ করে দেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে।

ফ্যামিলি ট্র্যাভেল কনফারেন্সের অংশ হিসেবে এক রাতে কয়েকজনের সঙ্গে বিয়ার তৈরির কারখানা দেখতে যান বুশ। মেক্সিকোতে বহুদিন কাটানো দুই ব্যক্তির সঙ্গে সেখানে তাদের পরিচয় হয়। ভ্রমণ সম্পর্কিত বিভিন্ন অনুষঙ্গ প্রসঙ্গে তাদের কাছে জানতে চেয়েছি। যেমন, ‘কাজের জন্য আপনারা কী করেন?’ ‘কীভাবে বসবাস করেন?’, ‘সন্তানদের স্কুলের ব্যবস্থা করেন কীভাবে?’

নতুন বন্ধুদের কাছ থেকে ভ্রমণকালীন টাকা-পয়সা কীভাবে বাঁচাতে হবে সেই সম্পর্কে নানান পরামর্শ পান ক্লিন্ট বুশ। যেমন— মেক্সিকোর মতো অপেক্ষাকৃত কম ব্যয়সাপেক্ষ দেশে দীর্ঘ সময় থাকা, ভ্রমণের জন্য অফ-সিজনকে বেছে নেওয়া, খরচ কমাতে রেস্তোরাঁর পরিবর্তে ঘরে তৈরি খাবার খাওয়া, হোটেলের পরিবর্তে অ্যাপার্টমেন্টে থাকা। ভ্রমণে নিজেদের পূর্ব অভিজ্ঞতাও পরিবারটির জন্য সহায়ক হয়েছে।

ভিঞ্জে একসময় মার্কিন সরকার পরিচালিত স্বেচ্ছাসেবী প্রকল্প পিস কর্পসের অধীনে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ টোগোতে কাজ করেন। তার আদিবাড়ি ইন্দোনেশিয়ায়, বুশের পূর্বপুরুষেরা ফিলিপাইনের। ফলে তাদের সন্তানদের শিশুকাল থেকেই এশিয়ায় আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে আসার দীর্ঘ ভ্রমণের অভ্যাস আছে।

বুশ-ভিঞ্জে দম্পতির মতে, বিরামহীন ভ্রমণে সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা হলো— সপ্তাহের সাত দিনই ২৪ ঘণ্টা ঘুরে বেড়ানো। তাদের মূলমন্ত্র হলো ‘ধীরে চলো’। এর ফলে একটি জায়গায় অনেকদিন বসবাস করে সেখান থেকে কর্মজীবন ও সন্তানদের শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখা। পাশাপাশি ধীরে ধীরে সেখানকার সব দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখা। নতুন নতুন গন্তব্যে ছোটাছুটির চেয়ে এটাই ঢের ভালো বলে মনে করেন তারা।

স্ত্রীর সঙ্গে মিলে সাজানো রুটিন প্রসঙ্গে বুশ বলেন, ‘সপ্তাহের মাঝামাঝি সাধারণত আমার কাজ করি। একই সময় আমার স্ত্রী বাচ্চাদের পড়াশোনা করায়। ভিঞ্জেকে তার কাজে মনোযোগী হওয়ার সুযোগ দিতে সোম ও শুক্রবার আমিই সন্তানদের পড়াই। আমেরিকায় চিত্রটা ছিল এমন— সারা সপ্তাহ আমরা কাজ করতাম। সাধারণত ছুটির দিনে বেড়াতাম।’

মেক্সিকোর সান মিগুয়েল দে আইয়েন্দে, গুয়ানোহুয়াতো, পুয়ের্তো এসকন্দিদো ও লা পাজে এই পরিবার এক মাস করে বেড়িয়েছেন। ভ্রমণসূচি সাজানোর সময় প্রত্যেক সদস্য ঘুরে দেখার জন্য নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী তিনটি করে দেশ বেছে নেন। চীনে যেতে মুখিয়ে ছিল মিরা। বুশের পছন্দ হয় মেক্সিকো। ভিঞ্জে নির্বাচন করেন নরওয়ে। পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য জুলিয়ানের পছন্দের তালিকায় ছিল নিউ ইয়র্ক সিটি, আফ্রিকা ও একটি সমুদ্র সৈকত। বেড়ে ওঠার সঙ্গে ভূগোল-সম্পর্কিত জ্ঞানার্জন হচ্ছে তার। তাই আফ্রিকান দেশগুলোর মধ্যে মাদাগাস্কারকে ভ্রমণের জন্য বেছে নিয়েছে সে।

কোস্টারিকায় ভ্রমণের দিনগুলোতে জুলিয়ানকে পড়াচ্ছেন অ্যাস্ট্রিড ভিঞ্জেবিশ্বকে জানার পাশাপাশি ভ্রমণের মাধ্যমে জীবনকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ হয়। ব্যাকপ্যাকের আকার যেন বেড়ে না যায় সেজন্য সাধারণত উষ্ণ আবহাওয়ার অঞ্চলগুলোর মধ্যে নিজেদের ঘোরাফেরা সীমাবদ্ধ রাখে এই পরিবার। কাজ করার বিষয়টি মাথায় রেখে ইউরোপ ভ্রমণের জন্য গ্রীষ্ম বা বসন্তকাল উপযুক্ত বলে মনে করেন তারা। মোটা পাঠ্যপুস্তকের পরিবর্তে তাদের ছেলেমেয়েরা স্কুলের বেশিরভাগ কাজ করে ল্যাপটপ ও ট্যাবলেটে। মিরার ‘হ্যারি পটার’ সিরিজের বই একমাত্র ব্যতিক্রম। পরিবারের সব সদস্য মিলে এগুলো পড়ে। পড়া শেষ হলে এসব বই অন্য কোনও পরিবারের জন্য রেখে যান।

বুশ-ভিঞ্জে দম্পতির কাছে, ভ্রমণের উদ্দেশ্য শুধু সন্তানদের নতুন নতুন জায়গা দেখানো নয়। তারা মনে করেন, হাইস্কুলের লেখাপড়ার চাপ ও খেলাধুলা মিলিয়ে দ্রুত গতির জীবন শুরুর আগে শৈশবের এই সময়গুলোতে ভ্রমণকালীন অভিজ্ঞতা তাদের পারিবারিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করবে।

ভিঞ্জে বলেন, ‘আমি সত্যিই আনন্দিত, সন্তানদের সঙ্গে বন্ধন মজবুত করার এত সুন্দর একটা সুযোগ পেয়েছি। কারণ বয়ঃসন্ধিতে পড়লে তারা হয়তো নিজেদের মতো করে জীবনযাপন করতে চাইবে। আমার মনে হয়, এখনকার ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ভাইবোনের সম্পর্ককে অটুট রাখতে সহায়ক হবে।’

বুশের কাছেও পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় ও কিছু স্মরণীয় স্মৃতি তৈরি করাই ছিল দীর্ঘকালীন ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ার মুখ্য উদ্দেশ্য। খুব অল্প বয়সেই বাবা ও বোনকে হারান তিনি। এক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন উভয়ে। স্বজন হারানোর বেদনা ও পারিবারিক বন্ধনের গুরুত্ব ভালোই বোঝেন। ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, ‘প্রতি মুহূর্তে উপভোগ করতে শিখেছি আমি।’

ম্যানুয়েল অ্যান্টোনিও ন্যাশনাল পার্কে গিরগিটি, প্রজাপতিসহ অনেক প্রাণী দেখেছে বুশ-ভিঞ্জে পরিবারকোস্টারিকার ম্যানুয়েল অ্যান্টোনিও ন্যাশনাল পার্কে গাইডের সহযোগিতায় হাইকিং করে পরিবারটি। তখন বানর, গিরগিটি, প্রজাপতি আর ধীরগতির আমেরিকান স্তন্যপায়ী প্রাণী দেখে বেশ আনন্দ পেয়েছে মিরা ও জুলিয়ান। পার্কে ঘুরতে আসার এক সপ্তাহ আগে দুই সন্তানকে প্রকৃতি বিষয়ক একটি ডকুমেন্টারি দেখিয়েছিলেন ভিঞ্জে, যাতে তারা বিভিন্ন প্রাণীর নাম আগে থেকেই জেনে নিতে পারে।

পার্কে ঘোরার সময় ট্যুর গাইড পরিবারটিকে জানান, সপ্তাহে শুধু একবারই গাছ থেকে নেমে আসে এই স্তন্যপায়ী প্রাণী। মিরা ও জুলিয়ান হা হয়ে সব শুনছিল। ট্যুরগাইডের কাছ থেকে জানা কিছু তথ্য তাকেই ফের জানায় জুলিয়ান।

সেদিন রাতে হোটেলে ফেরার পর মিরা ও জুলিয়ান একসঙ্গে ইউটিউবে ভিডিও দেখছিল। ভিঞ্জে মৃদু হেসে বলেন, ‘বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ওরা একজন অন্যের দেখাশোনা করে।’ বুশও তার সঙ্গে একমত, ‘ওরা একে অপরের খুব ভালো বন্ধু।’

চারজনের দলটির নতুন স্মৃতি বেশ সুখকর। বুশ-ভিঞ্জে এমনটাই চেয়েছিলেন!

সূত্র: সিএনএন

/জেএইচ/
টপ