পর্যটনে আমাদের জার্নি

Send
জনি হক
প্রকাশিত : ১৫:৫৩, মে ১৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫৩, মে ১৩, ২০১৯

পর্যটনে আমাদের জার্নি-সুন্দরবনপর্যটন এখন দেশের বৃহৎ শিল্প। দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করার সবচেয়ে বড় মাধ্যম এই খাত। পর্যটনই যে কোনও দেশের টেকসই উন্নয়নের হাতিয়ার। ফলে টেকসই পর্যটন শিল্প গড়ে তোলার বিকল্প নেই। সমৃদ্ধ, বৈচিত্র্যপূর্ণ ও দৃষ্টিনন্দন নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশে তা হওয়ার অপার সম্ভাবনা আছে।
দেশকে পর্যটনে সম্ভাবনার জায়গায় নিয়ে যেতে বন্ধু হিসেবে এখন ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে ডিজিটাল প্রযুক্তি। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ভার্চুয়াল ট্রাভেল এজেন্ট তথা বিভিন্ন ওয়েব টুলস, মোবাইল অ্যাপ ও পর্যটন স্পটভিত্তিক ম্যাপ তৈরি হচ্ছে।

এখন ঘরে বসে বিমান ও ট্রেনের টিকিট বুকিং, হোটেল বুকিং, জাদুঘরের টিকিট কেনা, ভ্রমণের গন্তব্য সম্পর্কে জানাসহ বিভিন্ন সেবা অতিদ্রুত ও সহজেই পাচ্ছেন ভ্রমণপিপাসুরা। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে পর্যটকরা সহজেই গন্তব্য নির্বাচন করতে পারছেন। লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, ভ্রমণে দিনে দিনে আগ্রহ বাড়ছে নানান বয়সী মানুষের। ফুরসত মিললেই দলবেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তারা। দেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে বেড়াতে যায় বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। ঢাকার আশপাশ ছাড়াও বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সমু সৈকত কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, সিলেট, কুয়াকাটাসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থানে তাদের ভিড় দেখা যায়।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির প্রসার সাম্প্রতিক সময়ে দেশের পর্যটন খাতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। ভ্রমণপিপাসুদের জন্য বাণিজ্যিক ট্রাভেল এজেন্সির বাইরে গড়ে উঠেছে এমন কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। পর্যটন খাতের উন্নয়ন ও প্রসারে তথ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে অন্যতম নিয়ামক এখন সামাজিক গণমাধ্যম। ফেসবুকে ভ্রমণ বিষয়ক বেশকিছু পেজ আছে। এগুলোতে পর্যটকরা নিজেদের ভ্রমণ কাহিনি লিখছেন। প্রায় প্রতি মাসে ফেসবুক গ্রুপগুলো থেকে বিভিন্ন জায়গায় ট্যুরের আয়োজন করা হচ্ছে। ফলে ফেসবুক ভিত্তিক গ্রুপ রূপ নিয়েছে ট্রাভেল এজেন্সিতে। ভ্রমণ বিষয়ক ফেসবুক পেজ ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশ-ভ্রমণকন্যার চারজন স্কুটিতে চেপে সারাদেশ চষে বেড়াচ্ছেন। শুধু নারীদের নিয়ে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ট্যুরের আয়োজনও করছেন তারা। ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) আয়োজনে ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ফেয়ার (বিটিটিএফ) ও দি বাংলাদেশ মনিটরের ঢাকা ট্রাভেল মার্টের মতো আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলায় অনলাইন ভিত্তিক ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো।

প্রতি বছর ২৭ সেপ্টেম্বর উদযাপন করা হয় ‘বিশ্ব পর্যটন দিবস’। গতবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘পর্যটন শিল্পের বিকাশে তথ্যপ্রযুক্তি’। বেসরকারি উদ্যোগে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে ভ্রমণপিপাসুদের আকৃষ্ট করতে অনেক ওয়েব পোর্টাল তৈরি হয়েছে। ফলে বেড়েছে কর্মসংস্থান। সরকারিভাবেও ডিজিটাল প্রযুক্তি কাজে লাগানো হচ্ছে। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ও পর্যটন বোর্ডের ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজ আরও পর্যটকবান্ধব আর তথ্যবহুল করা হচ্ছে।

ভ্রমণ সম্পর্কিত খবরের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। এখন কম সময়ে বেশি তথ্য চাই তাদের। পর্যটনের প্রসারে গণমাধ্যমের ভূমিকা তাই অপরিসীম। পর্যটকেরা কোথাও ভ্রমণ করতে চাইলে মূলত গণমাধ্যম থেকে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে থাকেন। সেই সূত্র ধরে ২০১৮ সালের ১০ জুলাই বাংলা ট্রিবিউনের নতুন বিভাগ ‘জার্নি’র পথচলা শুরু হয়। এর মাধ্যমে পাঠকরা পর্যটন খাতের চমকপ্রদ সব তথ্য পাচ্ছেন। সারাবিশ্বে বাংলাদেশের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমৃদ্ধ ইতিহাস, ঐতিহ্য, বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি, দৃষ্টিনন্দন জীবনাচার ছড়িয়ে পড়ছে।

পর্যটন খাতের প্রসারের বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনের জার্নির ফেসবুক পেজে ভ্রমণপ্রেমীদের অনেকে নানান পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তাদের মধ্যে আরমান খান নামের একজনের মন্তব্য, বাংলাদেশের ৬৪ জেলার প্রবেশপথে সংশ্লিষ্ট জেলার পর্যটন স্থানগুলোর নাম ও ভ্রমণ নির্দেশনা সংবলিত বোর্ড স্থাপন করলে ইতিবাচক ফল পাওয়া যেতে পারে। তার মতো অনেকে দেশের পর্যটন গন্তব্যগুলো সঠিক ও সুন্দরভাবে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন বলে মনে করেন।

ইউনেস্কোর বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় মঙ্গল শোভাযাত্রা স্থান করে নেওয়ায় বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ নিয়ে বিদেশি ভ্রমণপিপাসুদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তাই পহেলা বৈশাখকে ঘিরে বাংলাদেশকে বিশ্বের সামনে আরও ব্যাপকভাবে তুলে ধরতে ১০ দেশের ২৬ জন সাংবাদিক ও ট্যুর অপারেটরকে আমন্ত্রণ জানায় পর্যটন বোর্ড। তারা বর্ষবরণ উপভোগের পাশাপাশি বাংলাদেশের দর্শনীয় কিছু স্থান ঘোরার অভিজ্ঞতা বিদেশি সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরবেন। এর মধ্য দিয়ে সেসব দেশে বাংলাদেশ নিয়ে নিঃসন্দেহে আগ্রহ বাড়বে।

বর্ষবরণসহ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের বাংলাদেশের জাতীয় আয়োজনগুলোতে বিদেশি পর্যটকদের উপস্থিতি বাড়ছে। এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে পর্যটন খাত হতে পারে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম উৎস। তবে পর্যটক খাতের উন্নয়নে গবেষণা ও সঠিক পরিকল্পনা দরকার। এজন্য পর্যটকদের তথ্য প্রয়োজন। পর্যটকদের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পদক্ষেপ না নিলে এই খাতে বিনিয়োগ লাভজনক হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বিদেশ থেকে প্রতি বছর বাংলাদেশে কতজন পর্যটক আসেন, এর সঠিক তথ্য জানে না সংশ্লিষ্ট কেউ! কতজন পর্যটক আসেন ও তারা কোন দেশ থেকে আসেন, সেই সঠিক পরিসংখ্যান নেই পর্যটন বোর্ডের কাছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য ও অনুমানের ভিত্তিতেই দেশি-বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা নির্ধারণ হয়। বিদেশি নাগরিকদের আগমনের তথ্য সব স্থলবন্দর ও বিমানবন্দরে সংরক্ষণ করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। তারা সহায়তা করলেই কেবল পর্যটকদের ডাটাবেজ তৈরি করা সম্ভব। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে পর্যটকদের সঠিক পরিসংখ্যান তৈরির জন্য ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট (টিএসএ) চালুর উদ্যোগ নেয় পর্যটন বোর্ড। কতজন বিদেশি পর্যটক দেশে আসেন, তারা কী পরিমাণ অর্থ খরচ করেন, কোথায় বেড়াতে যান; হোটেল, পরিবহন ও অন্যান্য খাতে কী পরিমাণ আয় হয়— এসব তথ্য উঠে আসবে টিএসএ’র মাধ্যমে। কিন্তু তথ্য সরবরাহ না থাকায় কাজটি শুরু করা যায়নি।

পর্যটন শিল্পে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ভূমিকা অনেক। কারণ পর্যটনের সঙ্গে এভিয়েশন, হোটেল-রিসোর্ট ও ঐতিহ্যবাহী খাবার সম্পর্কিত। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ বিশ্ববাসীকে আকৃষ্ট করার মতো। এক্ষেত্রে ইলিশের কথাই ধরা যাক। এই রূপালি মাছ পর্যটনে ভূমিকা রাখতে পারে। গত বছরের একটা কথা ঘটনা— আড়াই কেজি ওজনের ইলিশ মাছ সঙ্গে নিতে এয়ার ইন্ডিয়ার ঢাকা-কলকাতা রুটের একটি ফ্লাইট প্রায় এক ঘণ্টা দেরিতে ছেড়েছেন পাইলট!

কিছুদিন আগে বিদেশি একটি অনলাইনে পড়লাম, পর্যটকদের আকর্ষণ করতে জাতীয়ভাবে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে সৌদি সরকার। এর অংশ হিসেবে সৌদি আরবের বিভিন্ন প্রদেশ ও অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো নিবন্ধনের কার্যক্রম চলছে। এগুলো পর্যটকদের মুগ্ধ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো অনেক বৈচিত্র্যময়। এগুলোর সঠিক পরিচর্যার সময় এসেছে। সারাদেশে অনেক দর্শনীয় ও প্রাচীন মসজিদ আছে। এগুলো মুসলিম সমাজ ও ইসলামি সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে। অনেক মসজিদ ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এসব মুসলিম স্থাপত্যে মেলে চোখধাঁধানো নির্মাণশৈলী। গত বছর চাঁদপুরে জঙ্গলের ভেতরে কয়েকশ’ বছর আগের সুলতানি আমলের প্রাচীন একটি মসজিদের সন্ধান পাওয়ার খবর পেয়ে ভিড় জমায় দর্শনার্থীরা। সিলেটে হজরত শাহজালালের মাজারকে ঘিরে পর্যটনের বিকাশ হতে পারে। ধর্মীয় স্থানের তালিকায় হিন্দু মন্দির, গির্জা আর বৌদ্ধ মন্দিরকে কাজে লাগানো যায়। পৃথিবীজুড়ে অসংখ্য সেতু দেখতে আগ্রহী পর্যটকরা। এর মাধ্যমে চারপাশের প্রকৃতির সৌন্দর্যের উপভোগ করা যায়। বাংলাদেশেও যমুনা সেতুসহ কিছু মনোরম সেতু আছে।

সুখবর হলো, বিমান ও পর্যটন খাতে উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবনা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী। তার আশ্বাস, বাংলাদেশের প্রকৃতির সঙ্গে পর্যটকদের পরিচয় করিয়ে দিতে ইকো-ট্যুরিজমকে অগ্রাধিকার দিয়ে পর্যটন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে আগামী বাজেটের প্রস্তাবনা পেশ করা হবে। পর্যটকদের যাতায়াত সহজলভ্য করতে সড়ক, রেল ও আকাশপথ উন্নত করতে সব বিভাগকে একসঙ্গে নিয়ে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করছে সরকার। দেশের পাঁচতারকা মানের হোটেলগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ করে বিমানবন্দরগুলোকে নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তার আওতায় আনা হয়েছে। এভিয়েশন খাতের উন্নয়নে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যটনে আমাদের এসব জার্নি সুফল বয়ে আনবে, এই প্রত্যাশা সবার।

/এম/
টপ