ট্রাভেলগ ভরা বর্ষায় বাঁশবাড়িয়া ও গুলিয়াখালি সৈকতে কিছুক্ষণ

Send
কাউসার রুশো
প্রকাশিত : ০৮:০০, জুলাই ০৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:০০, জুলাই ০৬, ২০১৯

বাঁশবাড়িয়া সৈকতঅনেকেরই হয়তো জানা নেই, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড যেন নৈসর্গিক সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়ে বসে আছে! সমুদ্র সৈকত, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ, সবুজ বনানী, প্রাকৃতিক লেক আর ঝরনায় পরিবেষ্টিত এই উপজেলায় রয়েছে কম জনপ্রিয় বা অচেনা দারুণ সব দর্শনীয় স্থান। তেমনই মুগ্ধকর দুটি জায়গা দেখার সৌভাগ্য হলো।

এবার অফিসের কাজে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ফিরছিলাম। আমার বস আল-আমিন ভাই ভ্রমণপিপাসু মানুষ। গাড়িতে তিনি জানালেন, যাওয়ার পথেই পড়বে এমন দুটি সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে নিয়ে যাবেন। অফিসের কাজের চাপে এমনিতেই ত্রাহি অবস্থা ছিল। ভালো লাগছিল না কিছু। এমন সময় ঘুরে বেড়ানোর লোভনীয় সুযোগ চলে আসা মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির মতো!

বাঁশবাড়িয়া সৈকতবাঁশবাড়িয়া বাজার থেকে আঁকাবাঁকা পথ পেরোনোর পর চোখের সামনে এলো অপূর্ব সুন্দর এক সমুদ্র সৈকত। নাম ‘বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত’। এর মূল আকর্ষণ একটি লোহার সাঁকো। এটি দিয়ে সমুদ্রের ভেতর অনেকখানি হেঁটে যাওয়া যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের! জোয়ার থাকায় সাঁকোটি তখন পানিতে ডুবে ছিল।

বাঁশবাড়িয়া সৈকতপুরো সৈকতে আমরা আর ক’জন জেলে ছাড়া অন্য কেউ নেই। দূরে বহুদূরে মাছ ধরার ট্রলারগুলোকে ছোট ছোট বিন্দুর মতো লাগছিল। ঝাউবাগানের সারি সারি ঝাউ গাছ আর বিশাল বালির মাঠ বাঁশবাড়িয়াকে যেন পূর্ণতা দিতে জেগে উঠেছে।
বাঁশবাড়িয়া সৈকতবড় বড় ঢেউ দেখে সমুদ্রের নোনা জলে একটু গা ভিজিয়ে নিতে মনে অভিলাষ জাগলো। এরই মাঝে আকাশে মেঘ থমথম। স্থানীয়রা জানালো, এই সমুদ্র সৈকতে বসে সূর্যাস্ত দেখা দারুণ এক অভিজ্ঞতা। কিন্তু আমাদের হাতে অত সময় ছিল না। অগত্যা বৃষ্টির ছোঁয়া নিয়েই ফিরতি পথ ধরলাম।

গুলিয়াখালি সৈকতপরবর্তী গন্তব্য গুলিয়াখালি সমুদ্র সৈকত। গুগল ম্যাপের সহায়তা নিতে গিয়ে পথ হারালাম। স্থানীয়দের জিজ্ঞেস করে করে অবশেষে কাছাকাছি পৌঁছাতে পারলাম। এরপর আর গাড়িতে যাওয়ার পথ নেই। ট্রলারে করে বাকিটা পথ যেতে হলো। মিনিট দশেক পরেই দেখা মিললো কাঙ্ক্ষিত গুলিয়াখালির। সমুদ্র সৈকত যে এমন হতে পারে ধারণা ছিল না আগে। একদিকে দিগন্তজোড়া সুউচ্চ জলরাশি, অন্যদিকে কেওড়া বন। ভাটার সময় কেওড়া বনের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া খালের চারদিকে কেওড়া গাছের শ্বাসমূল দৃষ্টিগোচর হয়। এই বন সমুদ্রের অনেক গভীর পর্যন্ত চলে গেছে। অনেকটা সোয়াম্প ফরেস্ট আর ম্যানগ্রোভ বনের মতো।

গুলিয়াখালি সৈকতগুলিয়াখালি দেখে রাতারগুল আর সুন্দরবনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। সৈকত জুড়ে সবুজ ঘাসের বিস্তীর্ণ গালিচা আর নীলাভ আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে সুদূরে দাঁড়ানো পাহাড়গুলো টাঙ্গুয়ার হাওরের স্মৃতিকে বাবার সামনে নিয়ে এসেছে আমার। জল আর সবুজের মেলামেশায় আশ্চর্যময় সৌন্দর্যের অদ্ভূত সমাবেশ যেন! মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকলাম দীর্ঘক্ষণ। এখানেও মেঘ আমাদের সঙ্গী হলো। কিন্তু খানিক সময় পরেই সূর্যের সঙ্গে মেঘের বোঝাপড়াতেই কিনা ঝলমলিয়ে উঠলো রোদ।

গুলিয়াখালি সৈকতসতর্কতা
বাঁশবাড়িয়া কিংবা গুলিয়াখালি সৈকতে বেড়াতে যাওয়ার সময় দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। প্রথমত, এগুলোতে গোসল করতে নামা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। স্থানীয়দের বরাতে ও পত্র-পত্রিকা মারফত জানা যায়, অনেকেই এখানে গোসল করতে গিয়ে তলিয়ে গেছেন। তার ওপর এখন আবার বর্ষাকাল। তাই পানিতে নামার আগে সতর্কতা অবলম্বন জরুরি। সমুদ্রের পানিতে না ভিজেও কিন্তু সমুদ্রের সর্বগ্রাসী রূপ উপভোগ করা যায়।

দ্বিতীয়ত, ঘুরতে গিয়ে ময়লা আবর্জনা ফেলে পরিবেশ দূষণ করা থেকে বিরত থাকুন। বাঁশবাড়িয়া ও গুলিয়াখালিতে এখন পর্যন্ত পর্যটকদের আনাগোনা তুলনামূলকভাবে কম। তাই হয়তো রক্ষা। কিন্তু এমন পরিবেশ ক’দিন থাকবে সেটা দেখার বিষয়।

যেভাবে যাবেন
বাঁশবাড়িয়া কিংবা গুলিয়াখালিতে ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে দিনে গিয়ে বেড়ানোর পর রাতের মধ্যে ফিরে আসা যাবে চাইলে। সেক্ষেত্রে রাতে থাকার ভাবনা নিয়ে ঝক্কি পোহাতে হবে না।

ঢাকা থেকে বাসে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া বাজারে নামতে হবে। সেখান থেকে সিএনজিতে চড়ে মিনিট পনেরো দূরেই বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত। সিএনজি ভাড়া জনপ্রতি ২০-৩০ টাকা। সিএনজি রিজার্ভও নেওয়া যায়। এক্ষেত্রে ভাড়া আলোচনা সাপেক্ষ। তবে কম-বেশি ৩০০ টাকার মতো পড়বে।

চট্টগ্রাম শহর থেকে বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকতে যাওয়ার জন্য পাড়ি দিতে হবে প্রায় ২৫ কিলোমিটার পথ। শহরের অলংকার মোড় থেকে সীতাকুণ্ড যাওয়ার যেকোনও বাস বা টেম্পুতে করে বাঁশবাড়িয়া নামতে হবে। ভাড়া ৫০ টাকার মতো।

বাঁশবাড়িয়া ঘুরে রিজার্ভ করা বা লোকাল সিএনজি নিয়ে যাওয়া যাবে গুলিয়াখালি। এরপর ট্রলারে ভেসে যেতে হবে সমুদ্র সৈকতে। এক্ষেত্রে ভাড়া পড়বে ৬০ টাকা। ট্রলার রিজার্ভ করলে ভাড়া অনেক বেশি। বর্ষাকালে ট্রলারে পার হতে হয়। তবে অন্য মৌসুমে হেঁটেই যাওয়া যায়।

ছবি: লেখক

/জেএইচ/
টপ