ট্রাভেলগ এমসিসি ক্রিকেট জাদুঘরের বাংলাদেশ কর্নারে কিছুক্ষণ

Send
রবিউল ইসলাম, লন্ডন থেকে
প্রকাশিত : ০০:০০, জুলাই ১৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:১০, জুলাই ১৮, ২০১৯

বিশ্বকাপ ক্রিকেট নিয়ে লিখতে ইংল্যান্ডে যাওয়ার ভাবনা অনেক স্বপ্ন দেখাচ্ছিল। সবচেয়ে বেশি ভেবেছি লর্ডস নিয়ে। মেরিলেবোন ক্রিকেট ক্লাব (এমসিসি) ক্রিকেট জাদুঘর দেখার ইচ্ছে ছিল খুব। সেটি পূরণ হলো ৬ জুলাই। বাংলাদেশ ও পাকিস্তান ম্যাচের প্রিভিউ ডেতে লর্ডসে পা রেখেই জাদুঘরে পা মাড়াতে ছুটলাম।

মনে রোমাঞ্চ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। প্রেসবক্সের ঠিক উল্টো পাশে জাদুঘরটি অবস্থিত। ডেস্কে গিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই জানানো হলো, ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়ানোর পাশাপাশি ছবিও তোলা যাবে। জাদুঘরের ম্যানেজার উইলিয়ামস থমাস বলেন, ‘আমাদের এখানে ক্রিকেটের অনেক পুরনো স্মৃতি জমা রয়েছে। কিন্তু এক ভবনে সব একসঙ্গে রাখা সম্ভব নয়। তাই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে এগুলো প্রদর্শন করা হয়।’

এমসিসি জাদুঘরে ক্রিকেটের ইতিহাসএমসিসি জাদুঘর বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো ক্রীড়া জাদুঘর। ক্রিকেটের বিবর্তনের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে এটি। সুনসান জাদুঘরে ঢুকতেই ডানপাশে চোখে পড়বে একটি স্প্যারো। ১৯৩৬ সালের ৩ জুলাই লর্ডসে বলের আঘাতে মারা গিয়েছিল পাখিটি। মিডিয়া সেন্টারের স্থাপত্যশৈলীর নকশা দৃষ্টিনন্দন। ১৯৩০ সালে ডন ব্রাডম্যানের ২৫৪ ও টেস্টে ব্রায়ান লারার রেকর্ড ৪০০ রানের প্রতিটি বলের বিবরণ আছে এখানে। ১৮২৬ থেকে ১৮৭৩, এমিসিসির যতো সভা হয়েছে সেগুলোর প্রতিটির হাতে লেখা কার্যবিবরণী রয়েছে ভবনটিতে।

এমসিসি জাদুঘরে ক্রিকেটের ইতিহাসজাদুঘরটি দোতলা। নিচতলায় টিভি চলছে। সেখানে ইংল্যান্ডের জিতে যাওয়া ম্যাচগুলোর হাইলাইটস একটার পর একটা দেখা যাচ্ছে। নিচতলায় একপাশে ক্রিকেটের অমর বুড়ো ডব্লিউ জি গ্রেসের প্রথম ম্যাচের স্কোরকার্ড। সেই ম্যাচের স্মৃতি হিসেবে লেখা চিরকুট আর পত্রিকায় প্রকাশিত ম্যাচ রিপোর্ট স্থান পেয়েছে এতে। কাঁচঘেরা শোকেসের ভেতরে রাখা গ্রেসের ব্যাট, জুতা, প্যাড, গ্লাভসসহ বিভিন্ন জিনিস।

একটু এগোতেই বিশাল এক ভাণ্ডার। যারা ক্রিকেট ভালোবাসেন, তারা এতে কিছুক্ষণের জন্য স্রেফ হারিয়ে যাবেন! কী নেই এখানে? কেবল ক্রিকেটের তীর্থভূমির নয়, প্রতিটি দেশের বিশেষ কিছু ম্যাচের মুহূর্ত ধরে রাখা হয়েছে এই জাদুঘরে।

নিচতলার ভেতরের একটি কক্ষে মিনি ক্রিকেট স্টেডিয়াম তৈরি করে ক্রিকেট খেলার ব্যবস্থা রেখেছে কর্তৃপক্ষ। যে কেউ চাইলে খেলতে পারে ক্রিকেট ম্যাচ! আমার সঙ্গে বাংলাদেশি সাংবাদিক সাকেব সোবহান। তিনি বোলিং করলেন, আমি ব্যাটিং। দু’জন মিলে ১০ মিনিট ক্রিকেট খেললাম। চার-ছক্কার ফুলঝুরিতে চারপাশে উচ্ছ্বাস ছড়ালো। তখন তাকিয়ে দেখি কয়েক জোড়া চোখ আমাদের খেলা উপভোগ করছে!

প্রথম টেস্টে এই জার্সি পরে সেঞ্চুরি করেছিলেন আমিনুল ইসলাম বুলবুলএমসিসি জাদুঘরের নিচতলায় তন্নতন্ন করে বাংলাদেশের কর্নার খুঁজেছি। শেষমেষ দোতলায় এক কোণে পাওয়া গেলো। কাচে সংরক্ষিত ১৯৯৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের একটি জার্সি। পাশেই রাখা আমিনুল ইসলাম বুলবুলের অটোগ্রাফ সংবলিত একটি ব্যাট ও হেলমেট। ২০০০ সালের ১১ নভেম্বর ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টে বুলবুলের বিশ্বরেকর্ড গড়া সেঞ্চুরি এসেছিল এই ব্যাটেই, মাথায় ছিল হেলমেটটি। শচীন টেন্ডুলকারের ১০ নম্বর জার্সির ঠিক পাশেই আছে বুলবুলের জার্সি।

জাদুঘরটিতে তামিম ইকবাল ও শাহদাত হোসেনের নামও চোখে পড়লো। লর্ডসে যারা সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন কিংবা পাঁচ উইকেট নিয়েছেন তাদের নামগুলো এখানে একটু পরপর ভেসে ওঠে।

এমসিসি জাদুঘরে ক্রিকেটের ইতিহাসক্রিকেট জাদুঘরে স্যার ডন ব্রাডম্যান থাকবেন না তা কী করে হয়! দোতলায় বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এই কিংবদন্তির ব্যবহৃত সব জিনিস। আরেক স্যার ভিভিয়ান রিচার্ডসও আছেন। ছোটবেলায় অ্যান্ডি রবার্টসকে সঙ্গে নিয়ে এই লর্ডসে স্যার অ্যালস গ্রোভারের ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে এসেছিলেন ভিভ। কিন্তু অযোগ্য বলে তাদের দু’জনকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। এরপর অপমানিত ভিভ ও রবার্টস অ্যান্টিগায় ফিরে দেখিয়ে দেন তারা কোন ধাতুর ক্রিকেটার!

ছোটবেলায় লর্ডসের আবেদন ফরমের সঙ্গে ভিভ রিচার্ডস যে ছবি পাঠিয়েছিলেন সেটি সযত্নে সংরক্ষিত আছে জাদুঘরে। এর বাইরে বিভিন্ন খেলোয়াড়ের ব্যবহৃত জার্সি, ব্যাটসহ অনেক কিছুই আছে এখানে। শেন ওয়ার্ন, কুমার সাঙ্গাকারা, সৌরভ গাঙ্গুলিসহ বিখ্যাত সব ক্রিকেটারের ক্রিকেট সরঞ্জাম দেখা যায়। তবে ব্র্যাডম্যানের পর সবচেয়ে বেশি ক্রিকেট সরঞ্জাম রয়েছে শচীন টেন্ডুলকারের। এর মাধ্যমে আলাদা করে সম্মান জানানো হয়েছে এই ‘লিটল মাস্টার’কে। ক্রিকেটের বরপুত্র ব্রায়ান লারার ৪০০ রানের স্কোর বোর্ড সুন্দরভাবে বাঁধিয়ে রাখা আছে শোকেসে।

এমসিসি জাদুঘরে ট্রফি স্ট্যান্ডদোতলায় সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা হলো ট্রফি স্ট্যান্ড। ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের বিভিন্ন ট্রফির পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী অ্যাশেজের সবচেয়ে পুরনো ছোট্ট ট্রফিটি রয়েছে এখানে। এটিকে বলা হয় উর্ন অর্থাৎ ছাইদান। এর নামেই অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডের টেস্ট সিরিজের নামকরণ হয়েছে ‘অ্যাশেজ’। যদিও টেরাকোটার তৈরি ৬ ইঞ্চি ট্রফিটি আনুষ্ঠানিক ট্রফি নয়। তবে এর ভেতরেই ছিল অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডের মধ্যকার প্রথম টেস্ট ম্যাচের বেইলসের ছাই।

এছাড়া ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে কিংবা তারও পরে ক্রিকেট মাঠের স্কোরবোর্ড কেমন ছিল, তা দেখার জন্য এমসিসি জাদুঘরের বিকল্প নেই। কর্তৃপক্ষের দাবি, ক্রিকেটের প্রথম স্কোরবোর্ড একমাত্র তাদের সংগ্রহশালায় রয়েছে।

এমসিসি জাদুঘরে ক্রিকেটের ইতিহাসলর্ডসে মিডিয়া সেন্টারটি পৃথিবী বিখ্যাত। জে.পি. মর্গান মিডিয়া সেন্টার নামে ডাকা হয় এটিকে। ১৯৯৯ সালে ক্রিকেট বিশ্বকাপ উপলক্ষে বিশেষ মিডিয়া সেন্টারটি নির্মাণ করা হয়। এর রেপ্লিকাও রয়েছে জাদুঘরে।

ক্রিকেটের রত্নভাণ্ডার দেখে বেরিয়ে আসতেই চোখে পড়ে একটি স্থিরচিত্র। ২০১৮ সালের ২ মার্চ বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ ও মেরামতের ডকইয়ার্ডে ব্যাট-বল দিয়ে ক্রিকেট খেলেছিল চার কিশোর শ্রমিক। শৌখিন ফটোগ্রাফার সৈয়দ মাহবুবুল কাদেরের তোলা সেই ছবি জাদুঘরের বাইরের দেয়ালে স্থান পেয়েছে।

এমসিসি জাদুঘরে ক্রিকেটের ইতিহাসআইসিসির অনুমোদিত সংবাদকর্মী হিসেবে জাদুঘরে বিনামূল্যে প্রবেশ করা গেছে। তবে সাধারণ মানুষকে টিকিট কাটতে হয়। আবেদন ও কিছু পয়সা খরচ করে যেকোনও ক্রিকেট ভক্ত বেড়াতে পারবেন ক্রিকেট ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা এই ভবনে।

ছবি: লেখক

/জেএইচ/
টপ