বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে বৃষ্টিতেও দর্শনার্থীদের সমাগম

Send
রায়হানুল ইসলাম আকন্দ, গাজীপুর
প্রকাশিত : ২১:১৬, আগস্ট ১৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৪১, আগস্ট ১৪, ২০১৯

বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে অভিভাবকের সঙ্গে শিশু-কিশোরদের ঈদ আনন্দঈদের দিন গাজীপুরের আকাশ ছিল অনেকটাই পরিষ্কার। কিন্তু পরদিন মঙ্গলবার সকাল থেকেই শুরু হয় ঝুম বৃষ্টি। তবে বৃষ্টি উপেক্ষা করেই গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে বেড়িয়েছেন দর্শনার্থীরা। ঈদের পরদিন হওয়ায় সাপ্তাহিক ছুটির দিন মঙ্গলবারও (১৩ আগস্ট) পার্কটি খোলা ছিল। এদিন ভ্রমণপ্রেমীদের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। আজ বুধবারও পার্কে ব্যাপক দর্শনার্থীর সমাগম চোখে পড়েছে।

মূলত ঈদের পরদিন থেকেই দর্শনার্থীদের ঢল নামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে। ওয়াইল্ড লাইফ সুপারভাইজার আনিসুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, বিশেষ দিনগুলো ছাড়া স্বাভাবিকভাবে প্রতিদিন গড়ে চার-পাঁচ হাজার দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে পার্কে। ছুটিতে সেই সংখ্যা বেড়ে যায়। আর ঈদের ছুটিতে তা হয়ে যায় কয়েকগুণ বেশি।

পার্কের ইজারাদার শেখ সফিকুর রহমান সফিক জানান, সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য পার্ক খোলা থাকে। ঈদের পরদিন মঙ্গলবার বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাজার হাজার দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে। বুধবারও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। তবে আবহাওয়ার কারণে ঈদুল আজহায় দর্শনার্থী সমাগম তুলনামূলক কম হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কটি পাঁচটি ভাগে বিভক্ত। এগুলো হলো কোর সাফারি, সাফারি কিংডম, বায়োডাইভার্সিটি পার্ক, এক্সটেনসিভ এশিয়ান সাফারি পার্ক ও বঙ্গবন্ধু স্কয়ার। ঈদে পাঁচভাগের সবটিতেই ছিল দর্শনার্থীদের সমাগম।

বরাবরের মতোই এবারের ঈদেও বন্যপ্রাণীর প্রতি দর্শনার্থীদের আগ্রহ ছিল বেশি। প্রাণীজগতের পাশাপাশি পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে উঠে সুবিশাল সবুজ প্রকৃতি উপভোগের জন্য ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। ময়ূর, ধনেশ, ক্রাউন্ট ফিজেন্টসহ দেশি-বিদেশি নানান জাতের পাখির পাখিশালা, প্রজাপতি কর্নার, বিভিন্ন প্রাণীর প্রজনন কেন্দ্র, মেরিন অ্যাকুরিয়াম, লেকজোন ও কুমির পার্ক সাফারি কিংডমের বৈচিত্র্য আনন্দ দিয়ে সবাইকে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পার্কের কোর সাফারিকোর সাফারিতে বাড়তি মাত্রা
বাঘ, সিংহ, সাদা সিংহ, ভালুক, চিত্রা, মায়া ও সাম্বার হরিণ, বিভিন্ন প্রজাতির বক, আফ্রিকার ওয়াইল্ড বিস্ট, অরিক্স, কমন অ্যালান্ড, থমসন গ্যাজেল, জেব্রা, জিরাফ পার্কের কোর সাফারিতে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে। এগুলো আলাদা আলাদা সীমানা প্রাচীরের ভেতর উন্মুক্তভাবে বিচরণ করছে। পার্কের নির্ধারিত মিনিবাস-গাড়িতে চড়ে এসব প্রাণী দেখতে হয়। এজন্য রয়েছে ২৮-৩০ আসনের ছয়টি মিনিবাস। গাড়ির আসন অনুযায়ী দর্শনার্থীরা বেড়ানোর সুযোগ পান।

প্রবেশমূল্যে নজরদারির দাবি
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কের প্রবেশমূল্য জনপ্রতি ৫০ টাকা, ১৮ বয়সীদের নিচে দর্শনার্থীদের জন্য ২০ টাকা। শিক্ষা সফরে আসা বা সাধারণ স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের প্রবেশমূল্য ১০ টাকা। গাড়িতে করে কোর সাফারি পার্ক পরিদর্শনে জনপ্রতি টিকিট ফি ১০০ টাকা, অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৫০ টাকা।

তবে ভাড়া নিয়ে আপত্তি জানালেন শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার খোকন মিয়া। গাজীপুরের এসএসআর সোয়েটার কারখানার নিটিং অপারেটর তিনি। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সাফারি পার্কে ঘুরতে এসেছেন। তার মন্তব্য, ‘কোর সাফারি পার্কে ১৮ বছরের নিচে সবার জন্য ১০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। এটা অতিরিক্ত। কর্তৃপক্ষের বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার।’

একই আপত্তি তুললেন চুয়াডাঙ্গার শাহরিয়াত হোসেন ফয়সাল। মেয়েকে বাঘ দেখাতে নিয়ে এসেছেন। তার অভিযোগ, ‘শিশু-কিশোরদের জন্য কোর সাফারি দেখার জন্য ১০০ টাকা করে টিকিট নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ঘোরাঘুরির সময় পার্ক কর্তৃপক্ষের কোনও লোক সঙ্গে না থাকায় আমার ছেলে ও সঙ্গী কেউ বাঘ বা কোনও প্রাণীর দেখা পায়নি। এটি দর্শনার্থীদের সঙ্গে পার্ক কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতামূলক আচরণ।’

গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে আসার অনেকদিনের ইচ্ছে ছিল মাদারীপুরের সোনিয়া আক্তারের। এবার অফিস ছুটি ও বাড়িতে ঝামেলা না থাকায় সেই সুযোগ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘দুই ঘণ্টা ঘুরে দেখলাম, ভালো লাগছে। তবে শিশুদের আলাদাভাবে বাঘ ও বিভিন্ন প্রাণী দেখানো গেলে অভিভাবকরা আরও উৎসাহ পেতেন।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কের প্রবেশপথপার্ক কর্তৃপক্ষকে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান
জামালপুরের সরিষাবাড়ি থেকে বন্ধু সোনিয়া আক্তারকে নিয়ে সাফারি পার্কে এসেছেন শফিকুল ইসলাম সুজন। তার অভিযোগ, পার্কের লোকজনের সঠিক তদারকি ও নিয়মশৃক্সখলা না থাকার কারণে অনেক দর্শনার্থী পরিবার নিয়ে এসেও না বেড়িয়ে ফিরে যাচ্ছে। তাই বন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের এদিকে নজর দেওয়া জরুরি বলে মনে করেন তিনি। পার্ক কর্তৃপক্ষকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান এই দর্শনার্থী।

কাপাসিয়া থেকে স্বামীকে নিয়ে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে এসেছেন আমরিনা হক। তিনি বলেন, ‘এখানে দর্শনার্থীদের গাইড করার মতো কাউকে পাওয়া যায় না। পার্ক কর্তৃপক্ষ শুধু দর্শনার্থীদের টিকিট দিয়েই খালাস, যেন তাদের কোনও দায়িত্ব নেই।’ এছাড়া বিভিন্ন প্রাণী দেখার জন্য ৩০ টাকা টিকিট নেওয়া হলেও তা চোখে পড়ে না বলে অভিযোগ তার। এক্ষেত্রে কচ্ছপের উদাহরণ দেন তিনি।

তবে সাফারি পার্কের ব্যবস্থাপনা দেখে খুশি বগুড়ার শেরপুরের ইসমাইল হোসেন। ঈদের ১৫ দিন আগে নতুন বিয়ে করেছেন তিনি। শ্বশুরবাড়ি থেকে নতুন গাড়ি পেয়ে বউকে নিয়ে সাফারি পার্কে এসেছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এই চাকরিজীবী।

পার্কের রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল মোতালেব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রত্যেক সাফারির প্রবেশদ্বার ও কোর সাফারির ভেতরের উল্লেখযোগ্য স্থানে প্রাণীবৈচিত্র্যের নানান বৈশিষ্ট্য সংবলিত ফেস্টুন রয়েছে। এগুলো দর্শনার্থীদের সংশ্লিষ্ট প্রাণীর ব্যাপারে প্রাথমিক জ্ঞান লাভে সহযোগিতা করে। একদিনে ও অল্প সময়ে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক ঘুরে প্রাণীবৈচিত্র্য সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান লাভ করা সম্ভব নয়। পার্কটি প্রাণীবৈচিত্র্য নিয়ে নিয়মিত চর্চার নিরাপদ জায়গা।’

/জেএইচ/
টপ