ট্রাভেলগ হেঁটে হেঁটে মায়াবতী ঝরনার দেশে

Send
মতিউর রহমান
প্রকাশিত : ২২:৩০, অক্টোবর ২২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:৫৭, অক্টোবর ২২, ২০১৯

সিলেটের মনোরম প্রকৃতিপান্থুমাই! ধরা হয়, এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম। সিলেটের পাহাড়ঘেঁষা গ্রামটির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ছবির মতো সুন্দর নদী। এটি গিয়ে মিশেছে পান্থুমাই ঝরনার জলে। স্থানীয়রা এর নাম দিয়েছেন মায়াবতী ঝরনা। সেখানে বিভিন্নভাবে যাওয়া যায়। আমরা বেছে নিলাম হাঁটাপথ। সিলেটের গোয়াইনঘাটের জল-পাথরের নদী বিছনাকান্দি থেকে জাফলং পর্যন্ত হাঁটাপথ দারুণ বলেই এমন সিদ্ধান্ত।

সিলেট থেকে বিছনাকান্দি পর্যন্ত এলাম লেগুনায় চড়ে। মূলত বিছনাকান্দি থেকে হাঁটা শুরু। রাতে জার্নি করে আসায় সবাই মোটামুটি ক্লান্ত। বিছনাকান্দি পৌঁছে শীতল জলে আধঘণ্টা দাপাদাপি করতেই ক্লান্তি উড়ে গেলো।

দূরত্ব সম্পর্কে ধারণা পেতে স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো, নৌকা ছাড়া হাঁটা পথে জাফলং যাওয়া অসম্ভব। আর গেলেও পাঁচ-ছয়দিন তো লাগবেই! যারা তথ্য দিলেন, তারা ১০ টাকার জিনিস ২০ টাকায় বিক্রি করে অভ্যস্ত। আর মাঝিরা ১০ মিনিটের পথ পার করে দিতে ৮০০ টাকা গুনে নেন। সুতরাং চোরে চোরে মাসতুতো ভাই! তাদের কথায় কান না দিয়ে গুগল ম্যাপ বের করে দূরত্ব অনুমান করে একটা শিক্ষা নিলাম– সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত কারও কথায় কখনও বিশ্বাস করবো না।

এবার হাঁটার পালা। কপালগুণে যাত্রা শুরু করার ঠিক আগমুহূর্তে বিছনাকান্দির পাশের গ্রাম লক্ষণছড়ার একজন শ্রমিকের দেখা পেলাম। তিনি প্রতিদিন পায়ে হেঁটে বিছনাকান্দিতে শশা দিয়ে যান ফেরিওয়ালাদের। বাসায় ফেরার মুহূর্তেই আমাদের সঙ্গে তার দেখা। অমায়িক এই ভদ্রলোক পথ দেখিয়ে নিয়ে চললেন।

সিলেটে ফসলের ক্ষেতবাঁ-দিকে পাহাড়, ডানে নদী। মাঝে মধ্যে ছোট ছোট বসতি। কখনও ক্ষেতের আইল ধরে, কখনোবা পায়ে হাঁটা পথ ধরে এগিয়ে চললাম। অনভ্যস্ত হওয়ায় আমরা পিছিয়েই থাকি। এ কারণে ভদ্রলোক একটু পরপর দাঁড়িয়ে পড়ছিলেন। আমরা হয়ে গেলাম তার কাছে উটকো ঝামেলা! অবশ্য সময় নষ্ট করলেও কোনও বিরক্তি দেখা গেলো না তার চেহারায়। স্বতস্ফূর্তভাবে রাস্তাঘাট চিনিয়ে চললেন, ‘বাঁ-পাশ দিয়ে গেলে খালে ভিজতে হবে, কিন্তু তাড়াতাড়ি যাওয়া যাবে। আর ডানপাশ দিয়ে একটা বাঁশের সাঁকো পাবেন। কোনদিক দিয়ে যাবেন?’ এ ধরনের নানান আলাপচারিতায় এগিয়ে চললাম আমরা। পথে যেতে যেতে পড়লো ছোট চায়ের দোকান। রোদে হেঁটে সবারই কিছুটা জিরিয়ে নেওয়া দরকার ছিল। তাই চা বিরতি নিলাম।

সিলেটে সাঁকোআবারও হাঁটা শুরু। লক্ষণছড়া পৌঁছে গেলাম ঘণ্টাখানেকের মধ্যে। লক্ষণছড়াকে দু’ভাগে ভাগ করে দিয়েছে একটা খাল। পাহাড়ি ঝরনা থেকে স্বচ্ছ খালে পানি নেমে আসছে। এতে গোসল করছেন গ্রামের মানুষজন। ভরদুপুরে বিদায় নেওয়ার আগমুহূর্তে আমাদের আটজনকে বাসায় দুপুরের খাবারের জন্য নেমন্তন্ন করলেন নিঃস্বার্থ গাইড হয়ে ওঠা ভদ্রলোক। সচরাচর পর্যটকরা ওই এলাকায় যায় না। তাই এখনও ব্যবসায়ী হয়ে উঠতে পারেননি স্থানীয়রা। আমরা সংকোচ ফেলে ঠিকই খাবারের জন্য লাইন ধরতে পারতাম। তবুও ক্ষুধার্ত আটটা মানুষকে দুপুরের খাবার খেতে নিমন্ত্রণ জানাতে বুকের পাটা লাগে, এই দিনমজুরের সেটা ছিল। তার আপত্তি থাকা সত্ত্বেও হাতে কিছু টাকা দিয়ে বিদায় নিলাম। ফোন নম্বর রেখেছিলেন তিনি। পথে দু’বার ফোন করে খোঁজ নিলেন আমাদের।

সিলেটে চোখ জুড়ানো সবুজের সমারোহলক্ষণছড়া গ্রামের শেষ মাথায় গাছে ঝুলে থাকা জাম্বুরা চোখে পড়লো। গাছমালিকের বাসায় ঢুকে আবদার করে বসলাম। তিনি জাম্বুরা পেড়ে দিলেন চারটা। আগেই বলেছি, এখানকার বাসিন্দারা এখনও ব্যবসায়ী হয়ে উঠতে পারেননি। তাই গাছমালিকের ছেলে টাকা নিতে চাইছিলেন না। তবে মা নিতে রাজি হলেন। সংসার দেখাশোনা যে মায়েদেরই করতে হয়!

সিলেটে বাদেশ্বর গ্রামের নদীপান্থুমাইয়ের আগের গ্রাম বাদেশ্বর। সত্যিকার অর্থেই সবুজঘেরা একটি গ্রাম। রাস্তার দু’পাশে লম্বা নাম না জানা গাছ। বাঁ-দিকে নদী। অল্প কিছুদূর পরপর পায়ে হাঁটার পথ নেমে গেছে নদীতে। এটি গিয়ে মিশেছে পান্থুমাই ঝরনায়। এই নদীই বাদেশ্বর আর আমাদের মাঝে বাধা! ওই গ্রামে যেতে নদী পেরোতে হবে। স্থানীয়রা জানালেন, তারা নাকি হেঁটেই পার হন। সাহস নিয়ে তাদের মতো পার হতে গিয়ে বুঝলাম, বড় ভুল হয়ে গেছে। মোটামুটি কোমর সমান পানি। ভিজে চুপসে পাড়ে গিয়ে উঠলাম। একটু কষ্ট করে নৌকা খুঁজলেই আর ভিজতে হতো না।

পান্থুমাই ঝরনাঅবশেষে গন্তব্যে পৌঁছালাম। আগে থেকেই জানতাম– পান্থুমাই ঝরনার কাছাকাছি যাওয়ার অনুমতি নেই। ভারতের সীমানায় পড়েছে এটি। দূর থেকে দেখে একটু আক্ষেপ থেকেই গেলো। ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর, বিছনাকান্দি অথবা পান্থুমাইয়ের যেসব জায়গা বেশি টানে সেগুলোতেই আমাদের যাওয়ার সুযোগ নেই। কাঁটাতার তা কেড়ে নিয়ে বসে আছে।

পান্থুমাই ঝরনার পাশেই খেলার মাঠ। দুই গ্রামের মধ্যকার ফাইনাল খেলা হবে। খেলা উপলক্ষে খাবার দোকান বসেছে। আমরা আখনি (তেহারির মতো অনেকটা) খেতে বসলাম। খেলা উদ্বোধন করতে প্রধান অতিথি উপজেলা চেয়ারম্যান চলে এসেছেন। খাওয়া শেষ করে ১০ মিনিট বিরতি নিয়ে বিদায়ের সময়ও খেলা শুরু হলো না। এদিকে অপেক্ষা করার সময় নেই আমাদের। পথ আরও বাকি। যেতে হবে জাফলং।

বাকি পথ অটোরিকশা ও সিএনজিতে চড়ে এগোলাম। নদী পার হতে হলো দুটি। বিল পেরিয়েছি একটি। পাহাড়ের পাশে খোলা মাঠে বিশ্রামের জন্যে বসলাম। চারদিক সুনসান। সামনে পাহাড়ের অন্য পাশে মেঘালয়।

জাফলংয়ে খাসিয়া পল্লীপরের যাত্রাপথ বেশ সংক্ষিপ্ত। পথে দেখা মিললো খাসিয়া পল্লী আর খাসিয়া রাজার রাজপ্রাসাদ। খাসিয়াদের বাড়িগুলো বিশেষভাবে তৈরি। অনেকটা আধুনিক ডুপ্লেক্স বাড়ির মতো। নিচতলা গুদামঘর হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আর ওপরতলায় তারা নিজেরাই থাকেন। খাসিয়া পল্লীর আশেপাশে টিলায় প্রচুর পানের চাষ হয়। সমতলে মূলত পানের বরজে পান চাষ হয়। কিন্তু এখানে টিলার চারদিকে বড় বড় গাছ বেয়ে লতার মতো পানগাছ উঠে গেছে অনেক ওপরে। খাসিয়া পল্লীর পরই পিয়াইন নদী। রাত হয়ে গেছে। নদী পেরিয়ে তাই রওনা হই সিলেটের পথে। একরাশ নতুন অভিজ্ঞতা আর সুন্দর কিছু মুহূর্ত আমাদের সঙ্গী।

ঠিক সন্ধ্যা নামার আগে পাহাড় সামনে রেখে খোলা মাঠে বাড়ি ফেরা গরুর পাল ও অস্ত যাওয়া সূর্য দেখার জন্য হলেও আবারও আসতে চাই এই পথে।

সিলেটে নয়নাভিরাম সূর্যাস্তযেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে সিলেট যাওয়ার বাস ভাড়া ৪৭০ টাকা থেকে শুরু। সিলেট থেকে হাদারপাড় যেতে হবে লেগুনা অথবা সিএনজিতে। রিজার্ভ সিএনজি ভাড়া ৮০০ টাকা থেকে শুরু। হাদারপাড় থেকে নৌকা রিজার্ভ করে নিতে হবে, ভাড়া কমপক্ষে ১৫০০ টাকা গুনতে হবে। সবখানেই দর কষাকষি করা ভালো।

প্রচুর স্পৃহা থাকলে বিছনাকান্দি থেকে পান্থুমাই হেঁটে যেতে পারেন অথবা নৌকা ভাড়া করেও যাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে ভাড়া ২০০০ টাকার মতো লাগবে।

পান্থুমাই থেকে হাজীপুর বাজারের ঘাটে যেতে অটোরিকশা পাওয়া যাবে ঝরনার কাছে। ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ২০ টাকার মতো। ঘাটে নৌকা থাকে না, কারণ অল্প পানি। ১৫ মিনিট হেঁটে পার হয়ে যেতে হবে হাজীপুর বাজারে।

হাজীপুর বাজার থেকে সিএনজি পাবেন রাধানগর পর্যন্ত। ভাড়া নেবে জনপ্রতি ৩০ টাকা। সেখানেই মূলত জাফলং। জাফলং দেখে নদী পার হতে হবে, নৌকা ভাড়া জনপ্রতি ১০ টাকা। সিলেটে ফিরতে জাফলং বাসস্ট্যান্ড থেকে বাস পাবেন।

ছবি: লেখক

/জেএইচ/
টপ