লালবাগ কেল্লা: মুঘল স্থাপত্যের ঐতিহাসিক নিদর্শন

Send
নাকিবুল আহসান নিশাদ
প্রকাশিত : ০৯:০০, নভেম্বর ০৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৯:০০, নভেম্বর ০৮, ২০১৯

লালবাগ কেল্লা (ছবি: সংগৃহীত)ঢাকায় ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে পছন্দের স্থাপনাগুলোর মধ্যে অন্যতম লালবাগ কেল্লা। এটি দেশের অমূল্য সম্পদ। প্রতিদিন শত শত দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখর থাকে লালবাগ এলাকার এই দুর্গ। বাংলাদেশে এটাই মুঘল আমলের একমাত্র ঐতিহাসিক নিদর্শন। যদিও প্রথমে এর নাম ছিল ‘কেল্লা আওরঙ্গবাদ’।

মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের ছেলে মুঘল সম্রাট আজম শাহ ১৬৭৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রাসাদটি নির্মাণের উদ্যোগ নেন। যদিও তিনি খুব কম সময়ের জন্য সিংহাসনে ছিলেন। লালবাগ কেল্লার নির্মাণ শুরুর প্রায় একবছরের মাথায় বাবার ডাকে দিল্লি চলে যেতে হয় তাকে। এ কারণে দুর্গের কাজ সাময়িক বন্ধ ছিল। আদৌ আর এটি সম্পন্ন হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দেয়।

কিন্তু সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে কাজ থেমে যাওয়ার একবছর পর তৎকালীন সুবেদার শায়েস্তা খাঁ’র উদ্যোগে পুনরায় লালবাগ কেল্লার নির্মাণ শুরু হয়। পুরো উদ্যমে আবারও দুর্গের কাজ চলতে থাকে। তবে ১৬৮৪ খ্রিষ্টাব্দে তা ফের বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আর এগোয়নি। অসমাপ্ত অবস্থায় রাখায় দুর্গটি পরিত্যক্ত হয়।

মেয়ে পরীবিবির মৃত্যুর পরই মূলত প্রাসাদ নির্মাণ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেন শায়েস্তা খাঁ। তখন এই দুর্গ নিয়ে বিরূপ ধারণা জন্ম নেয় সবার মধ্যে। কেল্লাটিকে অপয়া ভাবা হতে থাকে।

পরীবিবির আরেক নাম ইরান দুখত রাহমাত বানু। তার সঙ্গে শাহজাদা আজম শাহের বিয়ে ঠিক হয়েছিল ১৬৬৮ সালের ৩ মে। ১৬৮৪ সালে পরীবিবির অকালমৃত্যুর পর তাকে নির্মাণাধীন দুর্গের দরবার হল ও তিন গম্বুজ বিশিষ্ট একটি মসজিদের ঠিক মাঝে সমাহিত করা হয়। এরপর থেকে জায়গাটি ‘পরীবিবির সমাধি’ নামে আখ্যা পেয়েছে অনেকের মুখে। আজম শাহ দিল্লি চলে যাওয়ার আগেই মসজিদটি তৈরি করে গিয়েছিলেন। তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদ সবার দৃষ্টি কাড়ে। এতে জামায়াতে নামাজ আদায় করা হয়। ঢাকায় এত পুরনো মসজিদ খুব কমই আছে।

‘লালবাগ কেল্লা’র একটি ছবি বেশ পরিচিত। এটি মূলত পরীবিবির সমাধি। এখানে তিনটি বিশাল দরজা আছে। এর মধ্যে বর্তমানে জনসাধারণ কেবল একটি ফটক ব্যবহার করতে পারেন। এখান দিয়ে ঢুকে সোজা তাকালে চোখে পড়ে পরীবিবির মাজার। তার সমাধিসৌধের কেন্দ্রীয় কক্ষের ওপরের গম্বুজ একসময় স্বর্ণখচিত ছিল। কিন্তু এখন আর তা তেমন নেই। তামার পাত দিয়ে মুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে পুরো গম্বুজ। স্থাপনাটির অভ্যন্তর সাদা মার্বেল পাথরে ঢাকা।

পরীবিবির সমাধিটি চতুষ্কোণ। মার্বেল পাথর, কষ্টি পাথর ও বিভিন্ন রঙের ফুল-পাতা সুশোভিত চাকচিক্যময় টালি দিয়ে অভ্যন্তরীণ নয়টি কক্ষ অলঙ্কৃত করা হয়েছে। মাঝের একটি ঘরে পরীবিবির সমাধিস্থল দেখা যায়। এছাড়া আছে আটটি ঘর। স্থাপনাটির ছাদ করবেল পদ্ধতিতে কষ্টি পাথরে তৈরি এবং চারকোণে চারটি অষ্টকোণ মিনার ও মাঝে একটি অষ্টকোণ গম্বুজ রয়েছে।

লালবাগ কেল্লার অভ্যন্তরে হাম্মামখানাসহ একটি সুরমা দ্বিতল দরবার হল আছে। এর মধ্যে নিচতলার আকর্ষণ হলো হাম্মামখানা। এটি মূলত সুবেদারদের বাসভবন হিসেবে ব্যবহার হতো। ওপরের তলায় বসতো দিওয়ানে আমির (বিচারালয়)। শায়েস্তা খাঁ এখানে থাকতেন ও সমস্ত রাজকার্য পরিচালনা করতেন। লালবাগ কেল্লার তিনটি স্থাপনার মধ্যে এটি অন্যতম। এখানেই পরীবিবি সমাহিত আছেন। মেয়ের স্মরণে এই মনোমুগ্ধকর মাজার নির্মাণ করেন শায়েস্তা খাঁ। ১৬৮৮ সালে তিনি অবসরের পর আগ্রায় যেতে দুর্গের মালিকানা উত্তরাধিকারীদের দান করেন। তার চলে যাওয়ার পর বিভিন্ন কারণে লালবাগ কেল্লার গুরুত্ব কমতে থাকে।

শায়েস্তা খাঁ’র বাসভবনটি এখন দর্শনার্থীরা জাদুঘর হিসেবে দেখে। এতে অনেক কিছু আছে। এর মধ্যে মুঘল আমলের হাতে আঁকা বিভিন্ন ছবি মুগ্ধকর। শায়েস্তা খাঁ’র ব্যবহার্য নানান জিনিসপত্র, তৎকালীন বিভিন্ন যুদ্ধাস্ত্র, পোশাক, সেই সময়ের প্রচলিত মুদ্রা সযত্নে রয়েছে জাদুঘরে।

কেল্লার আরেক আকর্ষণীয় নিদর্শন দক্ষিণ-পূর্ব তোরণ। এতে রাজকীয় জৌলুস বিদ্যমান। তিনতলা তোরণটির সম্মুখভাগের শীর্ষে দু’দিকে দুটি সরু মিনার সুশোভিত। ভেতরের দিকে দু’পাশে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার ব্যবস্থা আছে। তোরণের ওপরের দিকে প্রবেশের জন্য রয়েছে বড় আকারের খিলান দরজা। এর ছাদের তলদেশ অর্ধগম্বুজ আকৃতির। ভেতরের অংশ কক্ষের আদলে বানানো। দু’পাশে ছোট ছোট প্রহরী কক্ষ। চূড়ার চারকোণায় চারটি মিনারের ওপর ছোট আকৃতির গম্বুজ ছিল। এর মধ্যে বর্তমানে দুটির অস্তিত্ব আছে।

লালবাগ কেল্লার এদিক-ওদিক বেশ কয়েকটি ফোয়ারা দেখা যায়, যা শুধু ঈদের মতো বিশেষ উপলক্ষে চালু থাকে। দুর্গে সুড়ঙ্গপথও আছে। জনশ্রুতি রয়েছে, আগে সুড়ঙ্গপথে যাওয়া যেতো। তবে এখন সেই ব্যবস্থা নেই। অবশ্য সুড়ঙ্গপথে যেতে পারার ঘটনা নিতান্তই শোনা কথা, এর কোনও সত্যতা পাওয়া যায়নি।

১৮৪৪ সালে ঢাকা কমিটি নামে একটি আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠান দুর্গ উন্নয়নের পদক্ষেপ নেয়। অনেকের মতে, লালবাগে অবস্থিত বলেই তখন এটি ‘লালবাগ কেল্লা’ নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৯১০ সালে সংরক্ষিত স্থাপত্য হিসেবে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধীনে আনা হয় দুর্গের প্রাচীর। অবশেষে নির্মাণ শুরুর ৩০০ বছর পর গত শতকের আশির দশকে এর যথাসম্ভব সংস্কারের মাধ্যমে আগের রূপ ফিরিয়ে আনা হয়।

টিকিট
লালবাগ কেল্লায় ঢুকতে হলে মূল দরজার ডানপাশের কাউন্টার থেকে টিকিট কিনে নিতে হবে। প্রতিটির মূল্য ২০ টাকা। তবে পাঁচ বছরের নিচে শিশুদের টিকিট দরকার নেই। বিদেশি পর্যটকদের বেলায় প্রবেশমূল্য ২০০ টাকা।

সময়সূচি
গ্রীষ্মকালে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত লালবাগ কেল্লা খোলা থাকে। শীত মৌসুমে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীরা দুর্গ ঘুরে দেখতে পারেন। দুটি ঋতুতেই দুপুর ১টা থেকে ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয় দর্শনীয় জায়গাটি। আর সবসময়ের জন্য শুক্রবারে জুমার নামাজের জন্য সাড়ে ১২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত বন্ধ থাকে কেল্লা। এছাড়া রবিবার সাধারণ ছুটি ও সোমবার দুপুর ২টা থেকে ফটক খোলা হয়। সরকারি যেকোনও বিশেষ দিবসে কেল্লা বন্ধ থাকে।

যেভাবে যাবেন
ঢাকার আজিমপুর বাসস্ট্যান্ডে নেমে রিকশায় চড়ে লালবাগে যাওয়া যায়। ভাড়া ১৫-২০ টাকা। দর্শনার্থীরা ইচ্ছে হলে হেঁটেও যেতে পারেন। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে বাবুবাজার হয়ে লালবাগের পথ ধরার সুযোগ আছে।

/জেএইচ/
টপ