‘সেন্টমার্টিন আইসেন কিন্তু আবার...’

Send
মোঃ খালিদ রহমান
প্রকাশিত : ১৭:৪৫, ডিসেম্বর ০৭, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৫, ডিসেম্বর ০৮, ২০১৭
 

বাসে উঠে ফোন করলাম দ্বীন মোহাম্মদ ভাইকে, যার সঙ্গে পরিচয় ২০১৫ সালে প্রথমবার সেন্টমার্টিন দ্বীপে গিয়ে। জানালা খুললেই সমুদ্র তার বিশালতা আর সাদা বালুকাবেলা নিয়ে হাজির হয়, সৈকতের এতোটাই ধারঘেঁষা এক হোটেলের কেয়ারটেকার দ্বীন ভাই বোধহয় ভেবেছিলেন তার সাথে রসিকতা করা হচ্ছে। ‘সইত্য আসতেছেন? সইত্য কইরা কইয়েন কইলাম!’ দ্বীন ভাইয়ের এমন বিস্ময়ের জবাবে তাকে আশ্বস্ত করলাম যে আমরা সত্যিই আসছি।

অফিস থেকে পনেরো দিনের ছুটি পেয়েছিলাম। কর্মব্যস্ততা থেকে একটুখানি স্বস্তিতে নিঃশ্বাস ফেলার অবসর। আবারও সেন্টমার্টিনে ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছেটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। রাতে বাসে চলে আসলাম টেকনাফ। দ্রুত চলায় আমরা টেকনাফ গিয়ে যখন নামলাম তখনও চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার। নিরাপত্তা নিয়ে মনে একটু শঙ্কা থাকলেও তা আসলে অমূলকই ছিলো। অতঃপর কেয়ারি ঘাটে দাঁড়িয়ে ভোর হতে দেখা । নাগরিক জীবনে অভ্যস্ত আমাদের কয়জনেরই বা এমন ভোর দেখার সুযোগ হয়? টেকনাফের সাগর থেকে ভেসে আসা ফুরফুরে বাতাসে ও কুয়াশায় মোড়া যে অপার্থিব সৌন্দর্য নিয়ে সকাল হলো, আমাদের শহুরে সকাল যদি তার সিকিভাগ সুন্দরও হয়ে থাকে, তাহলে আমি প্রতিদিন সূর্যোদয় দেখতে বিছানা ছাড়তে রাজি! বরাবরের মতোই জাহাজ ছাড়লো সকাল সাড়ে নয়টায়। নাফ নদী হয়ে জাহাজ সমুদ্রের যতো নিকটবর্তী হয় পানির রং ঘোলাটে থেকে ততোই নীল হতে থাকে। আসা-যাওয়ার যাত্রাপথে প্রায় স্পর্শের দূরত্বে উড়ে উড়ে সঙ্গ দেয় এক ঝাঁক সিগাল। দ্বীপের জেটিতে জাহাজ ভিড়ল বেলা বারোটার আগেই। তারপর হোটেলে চেকইন করেই চলল সমুদ্রের নীল জলরাশিতে লুটোপুটি। সেন্টমার্টিনের অদ্ভুত সুন্দর পানির রং মুগ্ধ করবেই । সৈকতে সারবেধে রাখা অসংখ্য ইজি চেয়ার। পানিতে লাফঝাঁপের ফাঁকে ওগুলোর একটাতে একটু গা রাখতেই ছুটে এলো বছর দশেক বয়সের ওমর ফারুক। সে আমাকে জানায় চেয়ারে বসতে হলে তাকে প্রতি ঘণ্টা বাবদ দিতে হবে চল্লিশ টাকা। বিপুল উৎসাহে তার সাথে দরাদরিতে নামি। শেষে রফা হয় ঘণ্টা ২৫ টাকায়। ওমর ফারুককে জিজ্ঞেস করেছিলাম জীবনের বড় হয়ে সে কী হতে চায়। এক মুহূর্ত দেরি না করে সে জানায় বড় হয়ে সে নিজের চেয়ার নিয়ে ব্যবসা করে অনেক টাকা রোজগার করবে।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামার পর যখন রোদের উত্তাপ কমে আসে, তখন সৈকতে হাঁটার সময় । অনেকে নেমে পড়েন ভাড়ায় জোগাড় করা সাইকেল নিয়ে বা নাটাই হাতে ঘুড়ি ওড়াতে। ছোট ছোট শিশুরা এসে হাজির হবে নানা রকম মালা নিয়ে । দেখবেন সৈকতে চলছে বারবিকিউ করার আয়োজন, কেউ বসেছেন ডাব বা ঝালমুড়ি নিয়ে। একটু নির্জনতা প্রেমীদের কাছে হয়তো পশ্চিম দিকের সৈকত বেশি ভালো লাগবে। সমুদ্র সেখানে অপেক্ষাকৃত শান্ত এবং নির্জন। সেন্টমার্টিনের পশ্চিম সৈকতে দাঁড়িয়ে দেখা সন্ধ্যার রূপ আজীবন মনে রাখার মতো।





সেন্টমার্টিনের ঝিলমিল তারায় শোভিত রাতের আকাশও অসম্ভব সুন্দর। রাতে ওড়াতে পারেন ফানুস। নারকেল বাগান দেখতে পারেন, দেখতে পারেন জেলেদের মাছধরা, কোরাল, প্রবাল, স্থানীয় বাজার, কোস্ট গার্ডের অফিস, হুমায়ূন আহমেদের প্রিয় বাড়ি সমুদ্র বিলাস। কোরাল, লবস্টার, রূপচাঁদা, টেকচাঁদা, টুনা মাছ, কাঁকড়া, সামুদ্রিক ইলিশ, হরেক রকমের শুঁটকি, আচারসহ আপনার রসনা মেটাতে আছে আরও বহু কিছু । বিশেষত সুন্দরি মাছের ভর্তার স্বাদ মুখে লেগে থাকবে অনেকদিন । প্রবাল দ্বীপের সৌন্দর্য কেবল এর সমুদ্র সৈকত আর নীল জলরাশিতেই নয়, পর্যটকদের পুরো দ্বীপটাই আসলে ঘুরে দেখা উচিত। জেটিতে ভাতের দোকান চালানো বৃদ্ধ সিরাজ দাদুর সঙ্গে কথা হলো। পরম আপ্যায়নে খাওয়ানোর সময় কথার ফাঁকে জানলাম তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা, কিন্তু তার কোন সনদ নেই। কারণ কি জানতে চাইলে গভীর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ করছি দেশের লাইগা, হের আবার সনদ কী? আল্লায় যেমুন রাখছে ভালা রাখছে। বউ, পোলাপান নিয়া চইল্লা যায় ধইরা বাইন্ধা একরহম।’

বিকেলে সেন্টমার্টিন সংলগ্ন জনবিরল ছেঁড়া দ্বীপে যেতেও ভুলবেন না। যেতে হবে ট্রলার বা স্পিড বোটে করে।

ছেড়া দ্বীপ

এবার ঘুরতে গিয়ে একটা ব্যাপার দেখে অবশ্য বেশ মন খারাপ হল। অযত্ন আর অসচেতনতায় দ্বীপটা বেশ অপরিচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। সৈকত জুড়ে ছড়ানো ছিটানো প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট, সিগারেটের ফিল্টারসহ নানা রকম আবর্জনা । এরজন্য পর্যটকরা যেমন দায়ী, তেমনই স্থানীয়দের উদাসীনতাও লক্ষণীয়। দ্বীপকে পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের তেমন কোন উদ্যোগ চোখে পড়েনি । সন্ধ্যায় এ নিয়ে কথা হয়েছিল দিনে ভ্যান চালিয়ে আর সন্ধ্যায় বারবিকিউ করে জীবন চালিয়ে চলা ইউনুস ভাইয়ের সাথে। তার থেকে জানলাম উদ্যোগ বলতে মাঝেমধ্যে বাইরে থেকে কিছু স্বেচ্ছাসেবক এসে দ্বীপ পরিষ্কার করার চেষ্টা করেন, এটুকুই। স্থানীয় কার্যকর কোন উদ্যোগ নেই।
অবশেষে বাড়ি ফেরার পালা । জাহাজ ছাড়বে বেলা ৩টায় । ব্যাগ কাঁধে জেটিতে এগিয়ে দিতে আসেন দ্বীন মোহাম্মদ ভাইসহ বেশ কয়েকজন অনাত্মীয় আত্মীয়রা । জাহাজে ব্যাগটা তুলে দিয়ে তারা আমাদের একটু যেন ধরা গলায় বলেন, ‘সেন্টমার্টিন আইসেন কিন্তু আবার...।’








জেনে নিন

সাগরের বুকে এক বিন্দু মুক্তোর মতো জেগে থাকা নয়নাভিরাম সেন্টমার্টিনে বসবাস প্রায় ছয়-সাত হাজার বাসিন্দার। সংখ্যাটা পর্যটন মৌসুমে ওঠানামা করে। অক্টোবর থেকে মার্চ/এপ্রিল পর্যন্ত পর্যটন মৌসুমে টেকনাফ, কক্সবাজার এমনকি ঢাকা, কুমিল্লা, নোয়াখালী, বরিশাল থেকেও অনেকে এখানে জীবিকার সন্ধানে চলে আসেন। দ্বীপের বাসিন্দাদের আয়ের উৎস মৎস্য আহরণ ও পর্যটনকেন্দ্রিক নানা ব্যবসা। ঘুরতে যাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় নভেম্বর থেকে জানুয়ারি। ঢাকা থেকে আসা যাওয়ার জাহাজের টিকেট ঢাকা থেকেই একবারে কেটে নেওয়া যায়। আর ফিরতি পথের বাস টিকেট কেয়ারি ঘাট থেকে বা সেন্টমার্টিন থেকে সংগ্রহ করতে পারবেন। ঢাকা টু টেকনাফ নন এসি বাসে আসা যাওয়ার খরচ পড়বে ১ হাজার ৮০০ টাকা,  আর টেকনাফ টু সেন্টমার্টিন আসা যাওয়ার জাহাজ ভাড়া সিট ভেদে ৫৫০ টাকা থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা। থাকার জন্য সেন্টমার্টিন গিয়ে নিজের পছন্দমতো হোটেল খুঁজে নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। ওতে খরচ যেমন অনেক কম পড়ে,  তেমনি সৈকতের আশেপাশে দেখেশুনে পছন্দমতো রুম রিজার্ভ করা যায়। পর্যটকদের জন্য পুরো সেন্টমার্টিন জুড়ে অসংখ্য আবাসিক হোটেল গড়ে উঠেছে যাদের ভাড়া সিজন ও টুরিস্টের সংখ্যার সাথে তাল মিলিয়ে ওঠানামা করে। দৈনিক ৫০০ টাকা ভাড়ায় যেমন রুম পাবেন,  তেমনি কিছুটা বিলাসবহুল আবাসিক হোটেলও আছে যেখানে প্রতিদিন থাকার খরচ পড়বে ৩ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। 

ছবি: নওরিন আক্তার

/এনএ/

লাইভ

টপ