ভিয়েতনাম ভ্রমণ- ২ যে শহর ঘুমায় না কখনও

Send
নওরিন আক্তার
প্রকাশিত : ১৯:০০, জুলাই ১৩, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২০, জুলাই ১৪, ২০১৮

পাহাড়ের মুগ্ধতা, সমুদ্রের বিশালতা, পুরনো শহরের মায়া আর নতুন শহরের ঝলমলে আলোয় ঘেরা চমৎকার দেশ ভিয়েতনাম। দেশটিতে পা দেওয়ার আগ পর্যন্ত আপনি ঠিক গুছিয়ে চিন্তা করতে পারবেন না যে কী অপেক্ষা করছে আপনার জন্য। অবশ্য পা দেওয়ার পর আরও বেশি এলোমেলো হয়ে যেতে পারেন! কোনটা ছেড়ে কোনটা দেখবেন এই চিন্তায়। অসম্ভব সুন্দর সাজানো গোছানো দেশটির পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে ভীষণ মুগ্ধতা। সম্প্রতি ভিয়েতনামের বেশ কয়েকটি শহর ঘুরে এসেছি। ভিয়েতনামবাসীরা খুবই অতিথি পরায়ন, অন্তত আমার অভিজ্ঞতা সেটাই বলে। হ্যাঁ, ভিয়েতনাম ভ্রমণের পর্বগুলোতে আমার অভিজ্ঞতাই ভাগ করবো পাঠকদের সঙ্গে। পাশাপাশি জানাবো কোথায় থাকবেন, কী খাবেন, কোথায় ঘুরবেন। প্রথম পর্বে জানিয়েছিলাম কীভাবে পাবেন ভিয়েতনামের ভিসা। এবার জানাচ্ছি রাজধানী হ্যানয় শহর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা।

প্রচুর বাইক চোখে পড়বে শহরে
রাতে রওনা দিয়ে মোটামুটি দীর্ঘ জার্নি শেষ করে ভিয়েতনাম পৌঁছতে পৌঁছতে বেজে গেল বারোটা। হ্যানয় এয়ারপোর্ট থেকে শহরে ঢুকতে লাগলো আরও ৪৫ মিনিট। তখন বৃষ্টি পড়ছে টিপটিপ। বাস থেকে নেমে হোটেলের খোঁজে ইতিউতি দেখছি। হঠাৎ চোখে পড়লো ঝুরিতে আনারস নিয়ে যাচ্ছেন এক বিক্রেতা। সদ্য ভিয়েতনামে পা দেওয়া আমাদের তখন ‘যা দেখি নতুন লাগে’ অবস্থা। আরফিন ভাই দৌড়ে গিয়ে আনারসের ঝুরি নিয়ে ছবি তোলার ইচ্ছা প্রকাশ করলো বিক্রেতার কাছে। বিক্রেতা তো মহা খুশি। ছবি-টবি তোলার পর যদিও সে প্রায় দ্বিগুণ দামে অনেকগুলো আনারস ধরিয়ে দিয়েছে আমাদের! কী আর করা! আনারস খেতে খেতে হ্যানয়ের পথে হেঁটে চলা। শেষ পর্যন্ত সন্ধান মিলল বুকিং ডটকম থেকে ঠিক করে রাখা হোটেলের। 

মার্কেট

আমরা ৭ বন্ধু এসেছি, সবার জন্যই ভিয়েতনাম ভ্রমণের অভিজ্ঞতা প্রথম। আমরা উঠলাম ব্যাকপ্যাকার্স হোস্টেলে। এ ধরনের হোস্টেলে এক রুমেই বেশ কয়েকটি বিছানা থাকে। দোতলা বিছানাগুলোতে দিব্যি হেসেখেলে, ঘুমিয়ে আর আড্ডা দিতে দিতে পার করে দেওয়া যায় রাত। একাকী ভ্রমণে গেলে আপনার খরচটা যেমন কমিয়ে দেবে এসব হোটেল, তেমনি বন্ধুদের দল একসঙ্গে ভ্রমণে গেলেও সময় কাটানো যাবে একসঙ্গে।

কোটি কোটি টাকার (ডং) হিসাব!
হোটেলে ব্যাকপ্যাক রেখে হাত মুখ ধুয়ে আমরা বের হলাম শহর ঘুরতে। ডলার ভাঙ্গানো এবং ভারি খাবার খাওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। মানি এক্সচেঞ্জ খুঁজে বের করে ভাঙ্গালাম ডলার। ব্যস! নিমিষেই আমরা কোটিপতি! হ্যাঁ, ভিয়েতনামে এক বোতল পানি খেতে চাইলেও আপনাকে গুণতে হবে ১০ থেকে ১৫ হাজার ডং! এখানে মোটামুটি ভালো রেস্তোরাঁয় একবেলা খেতে লাখখানেক চলে যাবে। ভিয়েতনামের মুদ্রার নাম ডং। ১০০ ডলার ভাঙালে ২২ লাখ ডং হাতে পাবেন। বাংলাদেশের ১ টাকা দিয়ে ভিয়েতনামের প্রায় ২৮৫ ডং পাওয়া যায়। ফলে হাতভর্তি ডং নিয়ে বেড়ে গেল আমাদের ঢঙ! নিজেকে মনে হতে লাগলো পুরনো দিনের সম্রাট! এক বন্ধু হাসতে হাসতে বলল, এখানে তো ব্যাগ ভর্তি করে টাকা নিয়ে গিয়ে ফিরতে হবে পকেট ভর্তি বাজার নিয়ে! 

সন্ধ্যা নামছে শহরে
ডং হাতে পাওয়ার পরই বার্গার খেয়ে হাপিশ করে দিলাম ৫ লাখ! ততক্ষণে সন্ধ্যা ঘনিয়েছে। রাস্তার দুধারে ঝুলন্ত নিয়ন আলোয় ঝলমলে হয়ে উঠছে শহর। দোকানে বিকিকিনি হচ্ছে হরেক রকমের পণ্য। বেশিরভাগ দোকানদারই নারী। অনেকে শিশু সঙ্গে নিয়েই কাজ করছেন।

হ্যানয় শহরের রিকশা

হ্যানয়ের রাস্তায় দেখা মিলল রিকশার। তবে এই রিকশা আমাদের মতো নয়। এখানে চালক পেছনে বসে যাত্রীকে সামনে রেখে টেনে নিয়ে যান গন্তব্যে। হ্যানয় জুড়ে অসংখ্য বাইক। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এখানে বাইক চালান।  

লেকের পাড়ে ওয়াকিং স্ট্রিট

রাতের কিয়েম লেক
হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম হুয়ান কিয়েম লেকে। শহরের ওল্ড কোয়ার্টারের পাশেই লেকটি। আলো- আধারিতে সেজে থাকা লেক পর্যটকের আনাগোনায় মুখর। বেঞ্চিতে বসে আড্ডা দিচ্ছেন কেউ, কেউবা হেঁটে চলেছেল লেক ঘেঁষে। লেকের পাড়ে দৃষ্টিনন্দন সব ফুলের সমাহার।   

আলো ঝলমলে কিয়েম লেক
কিয়েম লেক নিয়ে জনশ্রুতি আছে যে, ১৪২৮ সালে সম্রাট লি লুই এই দিয়ে জাচ্ছিলেন নৌকায়। তখন এক দেবতা কচ্ছপের রূপ নিয়ে সম্রাটকে একটি স্বর্ণের তলোয়ার উপহার দেন। সেই তরবারি দিয়ে যুদ্ধ করেই সম্রাট চীনাদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করেন।

ডিনারে খাওয়া চাওমিন ও এগ স্যুপ

নাইট মার্কেটে রঙের বাহার
রাত যত বাড়তে শুরু করলো, হ্যানয় যেন একটু একটু করে খুলতে শুরু করলো তার রঙের ঝাঁপি। লেকঘেঁষে যে রাস্তা চলে গেছে, সেখানে যানবাহন প্রবেশ নিষিদ্ধ। এই রাস্তা ঘুরে দেখতে চাইলে পায়ে হাঁটার বিকল্প নেই। ‘ওয়াকিং স্ট্রিট’ এর দুপাশে রং –বেরঙের পসরা সাজিয়ে বসেছেন নাইট মার্কেটের বিক্রেতারা। শো-পিস, হ্যাট, পুতুল, ব্যাগ, কানের দুল, ব্রেসলেট- কী নেই! হাজার হাজার পর্যটক ঘুরছেন নিশ্চিন্তে। 

হ্যানয়ের নাইট লাইফ

হ্যানয়ের যে জিনিষটি আমাকে প্রচণ্ড মুগ্ধ করেছে তা হচ্ছে এখানকার নাইট লাইফ। এত স্বতঃস্ফূর্ততা, এত আনন্দ এখানে- না আসলে বোঝা মুশকিল। অবাক হয়ে দেখতে হয় ভিয়েতনামবাসীদের চমৎকার জীবনযাপন পদ্ধতি। প্রযুক্তির ডামাডোলে এখনও রোবট হয়ে যায়নি তারা। পরিবারের সঙ্গে এখনও তারা সময় কাটায় তুমুল আনন্দে। সারাদিন কাজ করে সন্ধ্যায় তারা বেরিয়ে পড়ে নাইট লাইফ উপভোগ করতে। হাতে গোনা দু’একজন বাদে কারোর হাতে স্মার্টফোনও দেখিনি। বরং সবাই হাত ধরে আছে শিশুর। কেউ কেউ পোষা প্রাণী সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছে। সবাই আনন্দ করছে, উদযাপন করছে জীবনের আনন্দ।

ওয়াকিং স্ট্রিটে জমেছে গানের আসর
রাস্তার এক কোণে গানের আসর বসিয়েছেন গায়ক। গিটার হাতে প্রবল উৎসাহে গাচ্ছেন গান। তাকে ঘিরে কয়েকটি শিশু নাচছে মনের আনন্দে, ভিড় করে আছে সংগীতপ্রেমীরা। কোথাও জাদুকর দেখাচ্ছেন ম্যাজিক। স্কেটিংয়ে অসম্ভব সব নৈপুণ্য প্রদর্শন করছেন কেউ কেউ। সব আয়োজন ঘিরেই উৎসুক পর্যটকদের ভিড়। পাওয়া যাচ্ছে হাওয়াই মিঠাই, আইসক্রিম, ফল। যেন এক চমৎকার মেলা বসেছে শহরে। জীবনের এই আয়োজন যেন অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে তাগিদ যোগায় বেঁচে থাকার, শেখায় কীভাবে উপভোগ করতে হয় সময়।

রাতের পথভ্রমণে শিশুদের সঙ্গে এসেছে পোষা প্রাণীরাও
আরেকটি ব্যাপার দেখে মুগ্ধ হলাম। শিশুদের বিনোদন ও শিক্ষাকে এখানে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। এই আনন্দ আয়োজনেই খেলতে খেলতে শিখছে শিশুরা। রাস্তার এক কোণে অনেকগুলো সাদা ভাস্কর্য রাখা। অনেকগুলো রংসহ সেগুলো দিয়ে দেওয়া হয়েছে শিশুদের কাছে। মনের আনন্দে রং করছে তারা। বকাঝকা করার কেউ নেই, বাধা দেওয়ার কেউ নেই। একইভাবে কাগজে আঁকা কার্টুনেও মনের মতো রং করছে। স্কেটিং করছে বিভিন্ন বয়সী শিশুরা। ছোট ছোট সাইকেল ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। বাবা-মা হাঁটছেন, শিশু সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে। কী সুন্দর দৃশ্য!

শিশুরা ইচ্ছে মতো রং করছে ভাস্কর্যখেলতে খেলতে শিখছে শিশুরা
হ্যানয়ের নাইট লাইফ যে প্রাণ সঞ্চার করেছিল আমাদের মধ্যে, তা বুঝি আজীবনের জন্যই গেঁথে থাকবে মনে। পরদিন সকালে আবার গিয়েছিলাম কিয়েম লেকের সৌন্দর্য দেখতে।

কিয়েম লেক

তারপরই গাড়িতে করে রওনা দিই আরেক শহর হা লং এর উদ্দেশ্যে। সে গল্প তোলা থাকুক পরের পর্বের জন্য।  

আরও পড়তে পারেন: বিমানবন্দরে নেমেই মিলবে ভিয়েতনামের ভিসা

/এনএ/

লাইভ

টপ