ভ্রমণসঙ্গী পোষা প্রাণী

Send
নওরিন আক্তার
প্রকাশিত : ১৭:১৫, নভেম্বর ০১, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৫২, নভেম্বর ০১, ২০১৮

বন্ধুরা মিলে মেঘ-পাহাড়ের কাছাকাছি একটি বাড়ি বানিয়েছি। সেটার কাজেই গিয়েছিলাম সাজেক। ফেব্রুয়ারি মাস তখন। শীতের বাতাস যায়নি পুরোপুরি। হিম হিম বিকেলে গরম চায়ে চুমুক দিয়েছি মাত্র, ছোট্ট এক কুকুরছানা দৌড়ে এলো। চোখে-মুখে বেশ রাগ রাগ ভাব। বলের মতো ছোট্ট ছানার রাগ দেখে আমরা তো অবাক! ব্যাপার কী? জানা গেল উনার চেহারাই নাকি এমন! চায়ের কাপ ফেলে কোলে তুলে নিলাম কুকুরছানাকে। সেই যে কোলে তুলেছি আর আটকেছি ভালোবাসার বাঁধনে, এখন পর্যন্ত সেই মায়া কেবল বেড়েছেই। অবাক লাগে ভাবতে যে কীভাবে দায়িত্ব নিতে হয়, সেটা ঠিকঠাক পালন করতে হয় এবং ভালোবাসতে হয় প্রাণীকে- সেটা শিখিয়েছে সেদিনকার সেই রাগী কুকুরছানা।

যখন প্রথমবার ঢাকা আসে লিলিপুট
জানলাম ভারতের মিজোরাম থেকে সাজেকে আনা হয় কুকুরের একদম ছোট ছোট ছানা। স্থানীয় বাসিন্দারাই আনে। বিক্রি করে পর্যটকদের কাছে। বেশিরভাগ সময় মিক্স ব্রিডের হয় এগুলো। আমার কোলে থাকা ছানাটির জন্মস্থানও মিজোরাম। সাইজে খুব বেশি বড় হয় না এই ব্রিডের কুকুর। চিহুয়াহুয়ার ব্রিডের মতো ছোট জাতের হলেও হাস্কির মতো চেহারা এগুলোর। মালিকের কাছ থেকে কিনে নিলাম তাকে। আকার দেখে বর নামকরণ করলো ‘লিলিপুট!’

বাসে করে ঘুরতে যাচ্ছে সাজেকে, প্রায় আট মাস পর!

যাত্রাপথে, চান্দের গাড়িতে
কিনে তো ফেললাম, আনবো কীভাবে? দোকান থেকে বিস্কুটের ছোট কার্টুন কিনে বসিয়ে দিলাম লিলিপুটকে। সেও দিব্যি বসে রইলো রাগী রাগী চেহারা নিয়ে। তারপর চান্দের গাড়ি ও দীর্ঘ বাস জার্নি করে একদম বহাল তবিয়তে চলে এলো ঢাকায়। পাহাড়ে থাকা লিলিপুট খুব দ্রুত অভ্যাস করে ফেললো গা ঘেঁষে ঘুমানো ও মাছ-মাংস দিয়ে ভাত খাওয়ার। দেখতে দেখতে ন্যাওটা হয়ে গেল। দিনশেষে বাড়ি ফেরা মাত্র কোলে ঝাঁপিয়ে পড়া, চোখের আড়াল হলেই দরজার সামনে বসে থাকাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম করে জানান দিলো নিঃশর্ত ভালোবাসা এখনও পৃথিবীতে রয়েছে। কখনও প্রাণী না পোষা আমিও অদ্ভুত এক মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে যেতে লাগলাম। লিলিপুটের প্রিয় খাবার ও খেলনা কেনা পরিণত হলো শখে।

আমাদের ভ্রমণসঙ্গী লিলিপুট

আমাদের ভ্রমণসঙ্গী লিলিপুট
তবে শহুরে জীবনে লিলিপুটের সবচেয়ে বড় কষ্ট বাইরে ছুটতে না পারা। সুযোগ পেলেই সে জানালা দিয়ে মানুষ দেখে উদাস হয়ে যায়। অফিসে যাওয়ার সময় পিছনে পিছনে চলে আসে লিফটের কাছে। খুনখুন করে কাঁদতে থাকে যাওয়ার জন্য। বেচারার এই দুরবস্থা দেখে ঠিক করলাম এখন থেকে ভ্রমণে যাওয়ার সময় নিয়ে যাব লিলিপুটকে। যেহেতু ব্যবস্থার কারণে তাকে খুব বেশি সময় দিতে পারি না। পরবর্তী ভ্রমণ সেই সাজেকেই। ব্যস, সঙ্গে নিয়ে নিলাম লিলিপুটকে।

পাখি দেখে দৌড়াদৌড়ি!
বাসে উঠে সে যারপরনাই অবাক। এত মানুষ, এত গাড়ি! অবশ্য বাস চলতে শুরু করতেই খানিকটা অসুস্থ হয়ে পড়লো। নাক দিয়ে পানি ঝরতে লাগলো। তারও বেশ খানিকক্ষণ পর ঘুমিয়ে গেল। বাস জার্নি শেষ হলো পরদিন ভোরে। চান্দের গাড়িতে করে আমাদের সঙ্গে লিলিপুট রওনা দিলো সাজেকের উদ্দেশে। তার আগ্রহের কমতি নেই। রাত থেকে বিস্কুট ছাড়া তেমন কিছুই খায়নি সে যদিও। যাত্রাপথে টয়লেটও করেছে মাত্র একবার!

ভোর হওয়া দেখে

কংলাক পাড়ায়
সাজেকে পৌঁছেই অবশ্য মাংস দিয়ে ভাত খেল। তারপর ছুটাছুটি শুরু করলো পুরো সাজেক। স্থানীয় কুকুরগুলো ভাব করার জন্য এগিয়ে আসলেও সে পাত্তা দিল না একেবারেই। কেবল একটা ছাগল দেখে বেশ খুশি হয়ে পেছনে পেছনে ঘুরতে থাকলো! মুরগি দেখেও লিলিপুট যথেষ্ট কৌতূহলী, শুধু অন্যান্য কুকুরের ব্যাপারে বেশ উদাসীন!

সময় কেটেছে সবার আদরে

সঙ্গী ছিল সবসময়


এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করলো না আমাদের। ফলে এই ট্যুরে আমার আর সিঙ্গেল ছবি তোলা হলো না! সেখানেই আমি, গুটি গুটি পায়ে সেখানেই সে হাজির। আমি মেঘ দেখছি, লিলিপুট বসে আছে সঙ্গে। আমি চাঁদ দেখছি, পাশে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে সে। অলস বিকেলে চায়ের কাপে চুমুক দিয়েছি, পাশের চেয়ারে লিলিপুট উদাস ভঙ্গিতে বসা। কংলাক পাড়ায় হেঁটে হেঁটে উঠছি, আমাদের আগে আগে যাচ্ছে লিলিপুট! ডিম ভাজা দিয়ে নাস্তা করছে আমাদের সঙ্গে, ডিনারে পাশের চেয়ারে বসেই খাচ্ছে মাংস।

সেও খাচ্ছে আমাদের সঙ্গে

সবসময়ের সঙ্গী লিলিপুট


খেয়াল করলাম, অদ্ভুতভাবে আমার মধ্যেও চলে এসেছে সূক্ষ্ম কিছু পরিবর্তন। মেঘ-পাহাড়ের সৌন্দর্য ছাপিয়ে তখন আমার চিন্তা লিলিপুট কেন টয়লেট করছে না! পছন্দের খাবারটা সামনে থাকলেও মন বিষণ্ণ, কারণ লিলিপুট ঠিক মতো খাচ্ছে না। শীত বাড়লেই নিজের চাদরের নিচে জড়িয়ে নিচ্ছি প্রিয় প্রাণীটিকে।

শীতে কাবু

শীতের মিষ্টি রোদ পোহায়
কয়েকদিনেই লিলিপুট বেশ চিনে ফেললো সাজেকের রাস্তাঘাট, আমাদের রিসোর্টের রাস্তা। যদিও একা একা সে একদমই বের হতো না রিসোর্ট থেকে। বের হওয়ার ইচ্ছা থাকলে পেছনে পেছনে ঘুরতো আমাদের। অপরিচিত কেউ হঠাৎ সামনে আসলেই তারস্বরে ঘেউ ঘেউ করে জানান দিতো সে এখানে উপস্থিত! স্থানীয় বাসিন্দা শিশুদের সঙ্গে বল খেলল বেশ আয়োজন করে। মন কাড়ল অন্যান্য পর্যটকদের।

পাড়া ঘুরতে বেরিয়েছে


ফেরার সময়ে অনেকটাই সুস্থির হয়ে গেল লিলিপুট। যাকে বলে নিপাট ভদ্রলোক! ধর্মঘটের কারণে রাস্তায় বেশ ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে আমাদের। চান্দের গাড়ি, সিএনজি ও বাস জার্নি সে করেছে বেশ সাহসের সঙ্গেই। ঢাকায় ফিরে নিজের বাসায় খানিকক্ষণ ছুটোছুটি করেই লম্বা ঘুম। টানা জার্নির ধকলে পড়ে পড়ে ঘুমিয়েছে সে পরদিন পর্যন্ত!


পোষা প্রাণী নিয়ে ভ্রমণে গেলে করণীয়

  • বাসে করে গেলে আগে থেকেই নিশ্চিত হয়ে নেবেন যে সেখানে পোষা প্রাণী সঙ্গে নিয়ে ভ্রমণে কোনও নিষেধাজ্ঞা আছে কিনা। যে হোটেলে থাকবেন সেটাও ‘পেট ফ্রেন্ডলি’ কিনা তা জেনে নেওয়া জরুরি।
  • সম্ভব হলে সঙ্গে ডগ ফুড/ক্যাট ফুড রাখবেন।
  • বিরতিতে বা বাস থামলে খানিকক্ষণ হাঁটাহাঁটি করান প্রাণীকে। এতে টয়লেটের ঝামেলা মিটবে।
  • খেলনা/বল সঙ্গে নিয়ে নেবেন।
  • আলাদা চাদর/কাপড় রাখবেন হাতের কাছে।
  • অন্যান্য কুকুর/বিড়াল থেকে সাবধানে রাখবেন আপনার প্রিয় প্রাণীটিকে। অনেক সময় অপরিচিত প্রাণী দেখলে তারা হামলা চালায়।
  • ঠাণ্ডা বা গরমে কষ্ট পাচ্ছে কিনা খেয়াল রাখবেন।
  • ভ্রমণে গিয়ে তাদের একা রেখে কোথাও না যাওয়াই ভালো।

জেনে নিন
সাজেক থেকে কুকুরছানা কিনতে চাইলে খোঁজ নিতে পারেন স্থানীয়দের কাছ থেকে। ২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যেই বিভিন্ন ব্রিডের কুকুরছানা কিনতে পাওয়া যায়। কুকুর আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে তেমন কোনও বাধা নেই। তবে ঠিক মতো দেখভাল করতে পাবেন কিনা সেটা ভেবে তারপরই কিনবেন। শখের বশে হুট করে কিনে ছোট্ট ছানাকে কষ্ট দেবেন না কিন্তু!     

/এনএ/

লাইভ

টপ