স্ট্যাপহোর্স্টদের অজানা গল্প

Send
তানবীরা তালুকদার
প্রকাশিত : ১৩:০০, নভেম্বর ২৬, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:১২, নভেম্বর ২৬, ২০১৮

নেদারল্যান্ডসে একটি শহরতলি আছে যেখানে আজও  মানুষ ঔষধে বিশ্বাস করে না! বিজ্ঞানে বিশ্বাস করে না তারা। ঝাড়-ফুঁক, তুক-তাকে তাদের জীবন চলে। শহরতলির গণ্ডি ছেড়ে অনেকেই বাইরে বের হয় না। আধুনিক সভ্যতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তারা দিব্যি নিজেদের রাজ্যে নিজেদের মতো করেই বসবাস করছে।

স্ট্যাপহোর্স্ট– একটি গ্রামের নাম। যেখানে মানুষ তাদের শেকড় আঁকড়ে ধরে থাকতে পছন্দ করে। আধুনিক ডাচ সমাজ তাদের বিভিন্ন রকম সামাজিক ভাতা, সেক্স আর ড্রাগসের প্রতি উদার মনোভাবের জন্য বিখ্যাত। কিন্তু আমস্টার্ডাম থেকে আশি মাইল উত্তরপূর্বে কেউ যদি যায়, সেখানে এক অন্য পৃথিবী। এখানের লোকজন সব ধরনের বীমা, সামাজিক ভাতা আর তাদের ভাগ্যের ওপর হস্তক্ষেপ করাকে প্রত্যাখান করে। টেলিভিশন দেখাকে পাপ মনে করে।

এই গ্রামের মুখপাত্র ইয়ান উইলিয়াম স্টক বলেন, আধুনিক সংশোধিত ডাচ সমাজ থেকে দূরে তিনশ হাজার মানুষ নিয়ে, দ্য বাইবেল বেল্ট গোষ্ঠী উত্তর ওস্টব্রুঘ এর উর্ক শহরে, দক্ষিণ পশ্চিম থেকে একশ বিশ মাইল দূরে, আলাদা একটি সমাজ গঠন করেছিল। চৌদ্দ হাজার অধিবাসী নিয়ে প্রোটেস্টান্ট ধর্মে অগাধ আস্থা রাখা একটি কৃষিভিত্তিক গ্রামের নাম ‘স্ট্যাপহোর্স্ট।’ মেয়ে চাষীদের ঐতিহ্যবাহী লম্বা স্কার্ট, ফুল ছাপা ব্লাউজ ও মাথায় টুপিই প্রধান পোশাক। সেই পোশাক পরে গ্রামের সাতটি চার্চের সামনে প্রতি রবিবারে ঘরের পুরুষদের সাথে হাঁটতে দেখা যায় এখনও।

পনেরশ বাষট্টি সালে ধর্মপরায়ণ ব্যক্তি লুথেরানিজাম একটি মিশ্র ধর্ম আবিস্কার করেন। যার মূল কথা ছিল নিয়তিকে মেনে নিতে হবে, বিশ্বাসীকে ভুগে ভুগে তার সত্যতা প্রমাণ করতে হবে। আর এই বিশ্বাসের নাম ‘হাইডেলবার্গ ক্যাটেসিজাম’  যা নিয়ে স্ট্যাপহোর্স্টের মানুষ বেঁচে আছে। অন্যান্য দেশের মত ডাচ রাজনীতিতেও ধর্ম বিরাট ভূমিকা রাখে। ডাচ রাজনীতিতে একটি শব্দ আছে ‘স্ট্যাপহোর্স্ট ফ্যাক্টর।’ কট্টরবাদী বিশ্বাসীদের রাজনৈতিক দলজাতীয় সংসদে সবসময় পাঁচ ভাগ আসনে জয়ী হয়।

স্টক বলেন, বহু বছর আগে অনেক অনেক ডাচ গ্রাম এমন ছিল। এখানকার ঐতিহ্য অনেক দিন ধরে চালু রয়েছে কারণ এই গ্রামের অধিবাসীরা সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন। গ্রামের বেশির ভাগ অধিবাসীই পুরনো ঐতিহ্যের কারণে, সরকারের সামাজিক ভাতা নিতে অনিচ্ছুক। সরকারকে কর প্রদানেও তাদের অনীহা। তারা তাদের নিজেদের সম্প্রদায়ের জন্যে নিজেরাই অর্থনৈতিক সাহায্যের ব্যবস্থা করে। কারও বাড়ি পুড়ে গেলে প্রতিবেশীরা নতুন বাড়ি বানিয়ে দেয়। কেউ মারা গেলে আত্মীয়রা তার কফিন বানিয়ে দেয়। স্ট্যাপহোর্স্টের ঐতিহ্য হলো, একজন কৃষক মারা গেলে তার জমি ছেলেদের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। যেসব ছেলেরা উত্তরাধিকার সূত্রে জমি পাবে না, সে অন্যদের জমির পেছনে নিজের খামার বাড়ি বানিয়ে নেবে। এই কারণে সেখানকার চাষের জমিগুলো খুব সরু আর লম্বা – পনেরশ বাই চল্লিশ মিটার। আদিতে এগুলো একশ পঁচিশ মিটার প্রশস্ত ছিল। এ অঞ্চলের কৃষকেরা তাদের ঐতিহ্যবাহী লো স্যাক্সন এর আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে। এই গ্রামের বাড়ির জানালা-দরজা সব সবুজ। এখন যে বাড়িগুলো দেখা যায়, তার বেশির ভাগই আঠারশো পঞ্চাশ সাল থেকে উনিশো দশ সালের মধ্যে তৈরি করা হয়েছিল।

এ গ্রামের অনেক অধিবাসীই ওষুধ খায় না। এমন কী টিকাও নেয় না! তারা বিশ্বাস করে অসুস্থতা হলো ঈশ্বরের শাস্তি আর সুস্থতা তার পুরস্কার। ১৯৭১ সালে পোলিও মহামারীর সময় স্ট্যাপহোর্স্ট বিশ্ব সংবাদের শিরোনাম হয়েছিল। উনচল্লিশ জন পোলিও আক্রান্ত হয়েছিল যাদের বেশির বভাগই শিশু। ইউরোপের মধ্যে জন্মহার এখানে সবচেয়ে বেশি এখানে।

অন্যান্য বাইবেল আশ্রয়ী গ্রামের মত স্ট্যাপহোর্স্টও এখন রূপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এই ছবির মতো সুন্দর গ্রামের দৃশ্যটি ক্রমশঃ পরিবর্তন হচ্ছে। ঐতিহ্য ভেঙে আধুনিক জীবনে যোগ দিচ্ছে স্ট্যাপহোর্স্টের বাসিন্দারা। ইতোমধ্যে একটি হাসপাতাল স্থাপিত হয়েছে এই গ্রামে। তবু এখানকার বাসিন্দাদের প্রাধান্য সেই কট্টর নিয়তির ঐতিহ্যেই।



/এনএ/এফএএন/

লাইভ

টপ