যে গ্রামে মার্বেল খেলে প্রবীণরাও!

Send
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৯:৪৮, জানুয়ারি ১৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৫৫, জানুয়ারি ১৫, ২০১৯



মার্বেল খেলা সম্পর্কে স্থানীয় একাধিক প্রবীণ ব্যক্তিরা জানান, শীত মৌসুমে মাঠ-ঘাট ও সড়ক শুকিয়ে যাওয়ায় তাদের পূর্ব পুরুষরা মার্বেল খেলা শুরু করেন। যা আজও অব্যাহত আছে। এ খেলা থেকেই এখন এটা মার্বেল মেলায় রূপ নিয়েছে। আর তাদের উত্তরসূরি হিসেবে এখন তারাও খেলার সেই প্রাচীন ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। এ দিনটিকে ঘিরে রামানন্দেরআঁক গ্রাম ও তার আশপাশ এলাকায় কয়েকদিন আগে থেকেই মার্বেল মেলার উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। গ্রামের অধিবাসীরা তাদের মেয়ে জামাইসহ অন্যান্য নিকট আত্মীয়-স্বজনদের এই মেলায় মার্বেল খেলার আমন্ত্রণ জানিয়ে আসছেন।
জানা যায়, মূল মেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার কয়েকদিন আগে থেকেই আত্মীয় স্বজনরা বাড়িতে বাড়িতে অবস্থান নিতে শুরু করেন। বাড়িতে বাড়িতে চিড়া-মুড়ি, খেজুর গুড়ের পিঠা খাওয়ার ধুম পড়ে। চলে মার্বেল খেলার প্রতিযোগিতা। প্রায় ৫ বর্গ কি.মি এলাকা জুড়ে মার্বেল খেলার আসর বসেছে এবার। মেলাজুড়ে ছিল পুলিশের কঠোর নিরাপত্তা। বিভিন্ন বাড়ির আঙ্গিনা, অনাবাদী জমি, বাগান ছাপিয়ে রাস্তার উপরও বসেছিল মার্বেল খেলার আসর। এর সাথেই  অনাবাদী জমিতে বসেছে বাঁশ ও বেতের শৌখিন শিল্প সামগ্রী, মনিহারি দ্রব্য, খেলনা, মিষ্টি, ফল, চটপটি, ফুচকাসহ হরেক রকমের খাদ্যদ্রব্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া থেকে আসা সমীর বিশ্বাস জানান, তারা এই খেলার দাওয়াত পেয়ে এসেছেন। ব্যতিক্রমধর্মী এই মেলা তাদের ভীষণ ভাল লাগে। রামানন্দেরআঁক গ্রামের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র দিগন্ত বাগচী জানায়, সে সারা বছর টাকা জমিয়েছে মার্বেল কেনার জন্য। সেই মার্বেল নিয়ে খেলতে এসেছে মেলায়। মেলায় মার্বেল খেলার জন্য পার্শ্ববর্তী কোটালীপাড়া, উজিরপুর, কালকীনি, গৌরনদীসহ বিভিন্ন উপজেলা ও জেলার লোকজন এসেছেন।

মার্বেল মেলা কমিটির সভাপতি বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক (নিওনেটোলজি) শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. বিধান চন্দ্র (বিসি) বিশ্বাস ও উপদেষ্টা উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মলিনা রানী রায় গোসাই বলেন, ‘ছয় বছর বয়সে সোনাই চাঁদ নামে এক মেয়ের বিয়ের এক বছর পেরোতেই স্বামী মারা যায়। স্বামীর মৃত্যুর পর শ্বশুরবাড়ির নিম গাছের নীচে সোনাই দেবাদি দেব মহাদেবের আরাধনা ও পূজার্চনা শুরু করে। তার অলৌকিক কর্মকাণ্ড চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সোনাই চাঁদের জীবদ্দশায় তার ভক্তরা ওই বাড়িতে আনুমানিক ১৭৮০ খ্রিষ্টাব্দে ‘মা সোনাই চাঁদ আউলিয়া মন্দির’ স্থাপন করেন। ওই মন্দিরটি পরবর্তিতে স্থানীয়দের উদ্যোগে ২০১২ সালে পুনঃনির্মাণ করা হয়।’

মেলা আয়োজক কমিটির সভাপতি আরো জানান, মন্দির প্রতিষ্ঠার পর থেকে অদ্যাবধি প্রতি বছর পৌষ সংক্রান্তির দিনে বাস্তু পূজা (মাটির পূজা) ও নবান্ন মহোৎসবের মাধ্যমে ধুমধামের সাথে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। প্রতিবছর এই দিনে বৈষ্ণব সেবা, হরিনাম সংকীর্ত্তন শেষে সোয়া মণ (৫০ কেজি) চালের গুঁড়ার সাথে সোয়া মণ গুড়, ৫০ জোড়া (১শ পিস) নারকেল ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য উপকরণ মিশিয়ে তৈরি করা হয় নবান্ন।

মেলায় আগত সকল ভক্ত ও দর্শনার্থীদের মাঝে এই নবান্ন প্রসাদ বিতরণ করা হয়। আর নবান্ন মহোৎসব উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী মার্বেল খেলার মেলা। আগৈলঝাড়া থানার ওসি (তদন্ত) নকিব আকরাম জানান, ‘মার্বেল মেলা ও খেলা রামানন্দেরআঁক গ্রামের ঐতিহ্য। প্রতি বছর এ দিনে মার্বেল মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এ বছরও এর ব্যতয় ঘটেনি। মেলাকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা যেন না ঘটে এজন্য পর্যাপ্ত পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে।’

উল্লেখ্য প্রতি বছর পৌষ সংক্রান্তির দিনে এ মার্বেল মেলা ও খেলার প্রতিযোগিতা হয়ে আসছে। আর স্থানীয় বয়স্করা তাদের পূর্ব পুরুষদের ঐতিহ্য হিসেবে এ খেলাটি ধরে রেখেছেন।

/এনএ/

লাইভ

টপ