জামদানি শিল্পীদের সারাজীবন ধরে কৃতজ্ঞতা জানালেও কম জানানো হবে: চন্দ্রশেখর সাহা

Send
নওরিন আক্তার
প্রকাশিত : ২১:০৯, জানুয়ারি ২৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:১৪, জানুয়ারি ২৪, ২০১৯

মা-খালাদের শাড়ির তাকে যত্ন করে যে শাড়িটা তুলে রাখা হতো, সেটা জামদানি। জামদানির সঙ্গে জড়িয়ে আছে যুগ যুগের আবেগ ও ভালোবাসা। তবে আমরা এখন যে জামদানি দেখি, সেটার সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী জামদানির আকাশ-পাতাল পার্থক্য! মূলত নকশাদার মসলিনকে বলা হয় জামদানি।


এই প্রজন্মকে আদিকালের জামদানির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং দেশের অসাধারণ জামদানি শিল্পের ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখার প্রয়াসে শুরু হচ্ছে ‘জামদানি উৎসব।’ বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের পরিকল্পনায় বেঙ্গল ফাউন্ডেশন ও বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের আয়োজনে তিন সপ্তাহব্যাপী জামদানি উৎসব শুরু হচ্ছে এপ্রিলের ১২ তারিখ। জামদানির উন্নয়ন ও বিপণনে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী ৪ সহযোগী প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করছে প্রদর্শনীতে। এগুলো হচ্ছে আড়ং, কুমুদিনী, টাঙ্গাইল শাড়ি কুটির ও অরণ্য।    
জামদানি উৎসবের খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আজ ২৪ জানুয়ারি (বৃহস্পতিবার) ধানমন্ডির বেঙ্গল বইয়ে হয়ে গেল একটি সংবাদ সম্মেলন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ কারুশিল্প পরিষদ, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন ও আয়োজন সংশ্লিষ্ট সবাই।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী বলেন পুরো আয়োজনটির খুঁটিনাটি তথ্য তুলে ধরেন স্লাইড শো প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে। প্রায় দুই বছরের প্রস্তুতির পর পর্দা উঠতে যাচ্ছে জামদানি উৎসবের। ‘এই কাজটি আদৌ সম্ভব হবে কিনা, সেটা নিয়ে শুরুতে সংশয়ে ছিলাম আমরা। আদিকালের জামদানির মতো নিখুঁত কাজ এখন আর করে না তাঁতিরা। এত টাকা দিয়ে কেউ জামদানি কিনতে চায় না বলে ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হতে চলেছে আমাদের ঐতিহ্যের অন্যতম নিদর্শন জামদানি। সেই সব বয়নশিল্পীদের নিয়ে কর্মশালা করেছি আমরা। তাদের বুঝিয়েছি আমরা কি হারাতে চলেছি। তাদের তাঁতি নয়, একজন শিল্পীর মর্যাদা দিয়ে অনুরোধ করেছি পুরনো জামদানির আদলে নতুন করে জামদানি তৈরি করতে। শেষ পর্যন্ত তারা পেরেছে, আমরা পেরেছি’- বলেন লুভা নাহিদ চৌধুরী।

বক্তব্য দিচ্ছেন লুভা নাহিদ চৌধুরী
ফ্যাশন ডিজাইনার ও বাংলাদেশ কারুশিল্প পরিষদের নির্বাহী সদস্য চন্দ্রশেখর সাহা বলেন, ‘প্রথমে তাঁতিরা রাজি হচ্ছিলো না পুরনো মোটিফে জামদানি বুনতে। তারা বলছিল এত নিখুঁত কাজ কীভাবে সম্ভব? তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে পূর্বপুরুষদের কাজ না দেখেও তারা একদম একইভাবে বানাতে পেরেছে জামদানি। এসব জামদানি হাত দিয়ে ধরে দেখলে মনে হবে, জামদানি শিল্পীদের সারাজীবন ধরে কৃতজ্ঞতা জানালেও কম জানানো হবে! এত নিখুঁত কাজ, এত চমৎকার নকশা!’

জামদানি মোটিফের খুঁটিনাটি দেখাচ্ছেন চন্দ্রশেখর সাহা
তিনি আরও জানান, জামদানি উৎসবের প্রাথমিক পরিকল্পনার পর প্রথম চারমাস রীতিমত যুদ্ধ করতে হয়েছে পরের পরিকল্পনা পর্যন্ত যেতে। আদি জামদানি ও জামদানির ছবি সংগ্রহ করা হয়েছে লন্ডন ও কলকাতার জাদুঘর থেকে। ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকেও কলকাতার বেশ কয়েকজন দিয়েছেন জামদানি। সেসব ছবি ও নমুনা থেকে আদি জামদানির মোটিফ বয়নশিল্পীদের বোঝানো, তাদের মানসিক সাপোর্ট দেওয়া, সাহস যোগানো- সবকিছুই ছিল জটিল প্রক্রিয়া। এরপর মাসের পর মাস ধরে অসাধ্য সাধন করেছেন বয়নশিল্পীরা। ৮ মাস পর্যন্ত সময় নিয়ে একটি শাড়ি বুনেছেন নিখুঁত দক্ষতায়। মিহি খাদি সুতা দিয়ে তৈরি এসব জামদানি চমকে দেবে আপনাকে। নমুনা সংগ্রহের সময়কার বেশকিছু অভিজ্ঞতার কথা বললেন এই ডিজাইনার। কলকাতার পুরনো এক নকশাদার মসলিন হাতে নিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পরেছিলেন তিনি। জামদানিটি দেখে মনে হচ্ছিল সেটি সুতায় বোনা নয়, যেন তুলিতে আঁকা! আদি জামদানির মোটিফ অনেকটা বেনারসির কলকার মতো। সুতার সূক্ষ্মতার কারণে জ্যামিতিক নকশা হয়েছে নিখুঁত।    
টাঙ্গাইল শাড়ি কুটিরের স্বত্বাধিকারী ও বাংলাদেশ কারুশিল্প পরিষদের কোষাধ্যক্ষ মুনিরা এমদাদ সরকারকে অনুরোধ করেন জামদানি শাড়ির উপর থেকে ভ্যাট সরিয়ে নিতে। তিনি বলেন, মানুষ যত জামদানি শাড়ি কিনতে আগ্রহী হবে, এই শিল্পের সম্ভাবনা ততই বাড়বে।
লুভা নাহিদ চৌধুরী বলেন, ‘৬০ ও ৮০ কাউন্ট সুতা নিয়ে কাজ করতে অভ্যস্ত বয়নশিল্পীরা কোনও অভিজ্ঞতা ছাড়াই ২০০ কাউন্ট সুতায় কত নিখুঁতভাবে জামদানি বুনেছেন, সেটি দেখে আমরা যেমন আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি, আমরা চাই সেই আবেগ আপনাদেরকেও ছুঁয়ে যাক। পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে জামদানি শিল্প পরিচিত হোক।’ সরকারের সহযোগিতা পেলে এই শিল্পকে আরও অনেকদূর নিয়ে যাওয়া যাবে বলে বিশ্বাস করেন তিনি।  
১২ এপ্রিল থেকে ৩ মে পর্যন্ত চলা জামদানি উৎসবে থাকবে পুরনো জামদানির আদলে তৈরি করা নতুন জামদানি। দেশ ও দেশের বাইরের সংগ্রাহকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা পুরনো জামদানিও দেখতে পারবেন প্রদর্শনীতে আগতরা। কর্মশালা ও সেমিনারের পাশাপাশি শ্রেষ্ঠ কারুশিল্পীদের পুরস্কার প্রদান করা হবে আয়োজনে। এই আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে থাকছে জামদানির বাজারের প্রসার ও কারিগরদের সক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও কাজের উৎস চিহ্নিত করতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগকে কাজে লাগানো।

/এনএ/

লাইভ

টপ