আমি মা, আমিই বাবা!

Send
নওরিন আক্তার
প্রকাশিত : ১৭:১৫, মে ১২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:০১, মে ১২, ২০১৯

মেয়ে নিধির সঙ্গে নাজমুস নূপুর একটি বেসরকারি ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাজমুস নূপুর। সেপারেশনের পর থেকে মেয়ে নিধিকে নিয়ে একাই আছেন তিনি। সিঙ্গেল প্যারেন্টিং শুধু কষ্টকর না, অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিংও- জানান তিনি। সেটা কীভাবে? নূপুর জানালেন, একদম শুরু থেকেই শুরু হয়েছিল যে স্ট্রাগলটা, সেটা থামেনি আজও। যখন আলাদা হয়েছিলেন, তখন আলাদা বাসা নেওয়ার সামর্থটুকুও ছিল না নূপুরের। যখন সামর্থ হলো, তখন মুখোমুখি হলেন আরেক সমস্যার। সিঙ্গেল মাকে কেউ বাসা ভাড়া দিতে চায় না! সবার মনেই নানা ধরনের প্রশ্ন, সন্দেহ। এরপর মায়ের বাসার পাশেই বাসা নিলেন নূপুর। তারপর পড়লেন আরও কিছু বিপদে। পর্যাপ্ত ডে কেয়ারের অভাব, নিধির বয়সী (১০/১১ বছর) শিশুদের ডে কেয়ারে রাখার ব্যবস্থা না থাকা, বিশ্বস্ত গৃহকর্মী না পাওয়াসহ বিভিন্ন সমস্যা পাড়ি দিতে দিতেই পথ চলেছেন। মেয়ের পড়াশোনা, বাড়ি ভাড়া, মাসের খরচ- সব সামলান নিজেই। পাশাপাশি নিয়মিত সময় দেন মেয়েকে। ছুটিতে ঘুরতে নিয়ে যান। সম্প্রতি আরেকটা সমস্যায় পড়েছেন বলে জানালেন নূপুর। নিধির প্রিয় বন্ধু অন্য স্কুলে চলে গেছে। এরপর থেকে প্রায় প্রতিদিনই মন খারাপ করে বাসায় ফিরছে নিধি। কারণ হিসেবে সে জানিয়েছে অন্য শিক্ষার্থীরা তার সঙ্গে মিশতে চায় না। অন্য শিশুদেরকে তাদের অভিভাবকরা নিধির সঙ্গে মিশতে নিষেধ করেছেন বলে আশঙ্কা নূপুরের। জানালেন এই নিয়ে শীঘ্রই স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলবেন।  
মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে ছোট একটি পদে কাজ করছেন রেহনুমা। ৮ বছরের ছেলেকে নিয়ে ঢাকার মোহাম্মদপুরে থাকেন একাই। ছেলের বাবার সঙ্গে বনিবনা না হওয়ার কারণে ডিভোর্স দিয়েছেন বেশ কয়েক বছর হলো। জানালেন, সিঙ্গেল প্যারেন্টিংয়ের ব্যাপারটা প্রচণ্ড কষ্টের। অনেক পরিশ্রম, অনেক হতাশা লুকিয়ে ফেলতে হয় হাসিমুখে। ছেলের ভবিষ্যতের ভাবনা যেহেতু তাকে একাই ভাবতে হচ্ছে, সেহেতু পর্যাপ্ত উপার্জনের জন্য ভাবতে হয় তাকে। চাকরির টাকা চলে যায় বাসা ভাড়াতেই। ছেলের পড়াশোনার পাশাপাশি মাস চলার টাকা যোগাতে তাই চাকরির পাশাপাশি অনলাইনে ব্যবসা করছেন। সবকিছু নিয়ে মাঝে মাঝেই হাঁপিয়ে ওঠেন রেহনুমা। কিন্তু ছেলের দিকে তাকালে আবার নতুন উদ্যম ফিরে পান। 'হতাশ হয়ে গেলেই নিজেকে বোঝাই, আমি ছেলের কেবল মা নই, বাবাও! আমি ধৈর্যহারা হলে আমার ছেলেটা কোথায় যাবে?' বলেন রেহনুমা। ছেলেকে কেবল উচ্চশিক্ষিতই করতে চান না তিনি, মনেপ্রাণে চান ছেলে যেন একজন ভালো মানুষ হয়।
কথা হলো মনোবিজ্ঞানী নার্গিস সুলতানা সঙ্গে। তিনি বলেন, সিঙ্গেল মায়ের সংখ্যা দ্রুতই বাড়ছে আমাদের সমাজে। সন্তানের ক্ষেত্রে একটি পরিবারে দায়িত্ব ভাগ করা থাকে দুজনের মধ্যে। সন্তানের মানসিক বিকাশ, পড়াশোনা থেকে শুরু করে প্রতিটি দায়িত্ব পালন করেন বাবা-মা দুজনেই। কিন্তু যখনই দায়িত্বগুলো একজনকে পালন করতে হয়, তখন অনেক ধরনের প্রতিবন্ধকতা জেঁকে বসে। অনেক সময় দেখা যায় উপার্জনের চিন্তায় সন্তানকে তার প্রাপ্য সময়টুকু দিতে পারছেন না মা। নানা ধরনের সামাজিক ও আর্থিক প্রতিবন্ধকতায় পড়ে হতাশ হয়ে পড়তে থাকেন তিনি। হতাশ হয়ে সন্তানের সঙ্গে খিটখিটে মেজাজ দেখান অনেক ক্ষেত্রে। এতে একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর সন্তানের সঙ্গে মায়ের যোগাযোগ কমতে থাকে। বিশেষ করে টিনএইজে এসে সন্তানের মধ্যে ভয়াবহ হতাশা দেখা দেয়।
নার্গিস সুলতানা মনে করেন, একজন সিঙ্গেল মাকে মানসিক জোর ও সাহসটা ধরে রাখতে হবে সবসময়। যত বাধা ও বিপদই আসুক না কেন, ভেঙে পড়া চলবে না। সন্তানকে কোয়ালিটি টাইম দেওয়ার কোনও বিকল্প নেই। সম্ভব হলে বাবার সঙ্গে সন্তানের যোগাযোগটাও রাখতে দিতে হবে। এতে তার মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে না। এছাড়া মায়ের নিজের যত্ন নেওয়ার ব্যাপারেও বিশেষ জোর দিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনস্তত্ত্ব নিয়ে পড়া নার্গিস। ‘নিজেকে ভালো রাখার কোনও বিকল্প নেই। অবসরে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া, তাদের সঙ্গে লম্বা ট্যুরে চলে যাওয়া, নিজেকে আনন্দিত করতে পারে এমন কাজ করে নিজেকে ভালো রাখা খুব জরুরি। সবসময় মনে রাখতে হবে, আমি আমাকে ভালো রাখতে না পারলে আশেপাশের কাউকে ভালো রাখতে পারবো না!’-বলেন নার্গিস। 

/এনএ/

লাইভ

টপ