ঐতিহ্যবাহী ঢাকাই খাবার

Send
নোরা তাসনিম
প্রকাশিত : ১৭:১২, মে ১৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:২৩, মে ১৩, ২০১৯

খাদ্যাভ্যাস একটি জাতির সংস্কৃতির অংশ। বাঙালির পরিচয় যেমন মাছে ভাতে! এর পেছনে কারণও রয়েছে ঢের। নদীমাতৃক বাংলাদেশে মাছ পাওয়া যায় প্রচুর পরিমাণে। এ দেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু ধান চাষের উপযোগী। ভাত মাছের এ প্রাচুর্যতাই ছিল যুগ যুগের খাদ্যাভ্যাস গড়ে ওঠার পেছনের কারণ। অবশ্য প্রধান খাদ্য বাদ দিয়ে বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটেছে বহুবার। বিশেষ করে ঢাকাই খাবারের তালিকা সেই প্রাচীনকাল থেকেই সমৃদ্ধ। ঐতিহাসিক বিবর্তনের সাক্ষী ঢাকার চারশ বছরের সংস্কৃতির ইতিহাস বলে আদিকাল থেকেই অত্যন্ত ভোজনরসিক ছিল ঢাকাইয়ারা। প্রাচীন নগরী ঢাকার অধিবাসীদের রসনাতৃপ্তিতে বহুমুখী সংস্কৃতির সংমিশ্রণে যোগ হয়েছে নিত্যনতুন স্বাদ। ঐতিহাসিক খাদ্যের বিশাল তালিকায় মোগল খাদ্যাভ্যাসভিত্তিক ঢাকাই খাবারের প্রাধান্যই বেশি। এছাড়া ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলেও ঘটেছে ঢাকাবাসীর খাদ্যাভ্যাসের বিবর্তন।

চকবাজারের ইফতার
যুগে যুগে ঢাকাই খাবার
প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন জাতির আগমন ও তাদের রুচিবোধের সাথে বাঙালি খাবারের স্বাদ মিশে সৃষ্টি হয়েছে ঢাকাই সংস্কৃতির পরিমার্জিত রূপ। সুলতানি আমলে ঢাকার খাদ্যাভ্যাসে ছিল আফগান-তুর্কির প্রভাব। তারপর আসে মোগলরা। মোগলদের সাথে উত্তর ভারতীয়সহ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের মানুষ আসে এ দেশে। এসময় বিভিন্ন পেশাজীবী এলেও সুবেদাররা চলে যাওয়ার পর থেকে যায় তারা। পরবর্তীতে বিয়েশাদির মাধ্যমে পারস্পরিক সংস্কৃতি আদান প্রদানের পাশাপাশি ঢাকার খাবার ও খাদ্যাভ্যাসে নিয়ে আসে যুগান্তকারী পরিবর্তন। 
মোগল ঢাকার খাদ্য সংস্কৃতি ছিল সবচেয়ে বেশি সমৃদ্ধ। অত্যন্ত ভোজনরসিক মোগলরা খাবার নিয়ে রীতিমতো গবেষণা করতেন। কোন খাবারের স্বাদ কীভাবে বাড়ানো যায় সেটা নিয়ে চলতো প্রতিযোগিতা। মোগলরা কাবাবের জন্য যে গরু ব্যবহার করতো তাকে জাফরান খাওয়াতো নিয়মিত! এতে মাংসের মধ্যে একধরনের সুগন্ধ এসে স্বাদ বাড়িয়ে দিতো কাবাবের। মোগল খাবারের জন্ম স¤্রাট আকবরের রসুইঘরে বলে প্রচলিত আছে। তার শাহী রন্ধনশালায় নানা দেশের নানা জাতের বাবুর্চি ছিল। এ সময় ঢাকাই খাদ্য তালিকায় যুক্ত হয় বেশকিছু সুস্বাদু ও মুখরোচক খাবার। এসব খাবার যখন বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি শুরু হয় তখন লোভনীয় স্বাদের কারণে লুফে নেয় সাধারণ মানুষ। এরমধ্যে কোর্মা, পোলাও, বিরিয়ানি, কোফতা, ফিরনি, জর্দা, শাহী মোরগ পোলাও অন্যতম। ঢাকায় মোগলরা মাংস দিয়ে কাচ্চি বিরিয়ানি রান্না করতো। ঢাকাইয়া কোরমায় কাঁচামরিচ দেওয়া শুরু হয় এসময়। মোগল যুগের খাবারের মধ্যে মাংসের কোফতা ছিল অন্যতম। এছাড়া তেহারি ও দোলমাও মোগল আমলে প্রচলিত খাবার। আরেকটি জনপ্রিয় খাবার ছিল কাবাব। শিক কাবাব, শামি কাবাব, মোসাল্লাম কাবাব, টিকা কাবাব, মাছের কাবাব মোগল আমলে সুখ্যাতি লাভ করে। এ সময় নানা স্বাদের পরোটাও জায়গা করে নেয় ভোজনরসিকদের মাঝে। ময়দার পুরু পরোটা, কিমা পরোটা, মোগলাই পরোটা ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। মোগলরা আসার পর রান্নায় ঘিয়ের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। পর্তুগিজরা মরিচ আমদানি করার পর খাবারে মরিচের ব্যবহারও বেড়ে যায়।
মোগল যুগের সবচেয়ে বড় অবদান হচ্ছে বাকরখানি। মোগল আমলের জায়গিরদার মির্জা আগা বাকেরের নামে ঢাকার বাকরখানি রুটির নামকরণ করা হয়। তবে এ ধরনের রুটির প্রচলন করে গিয়েছিল কাশ্মিরিরা। তখন বাকরখানি তৈরিতে ঘি ও দুধ ব্যবহার করা হতো। অনেক সময় পনির দিয়েও তৈরি করা হতো বাকরখানি। ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে পর্তুগিজরা পাউরুটির প্রচলন করে। সাধারণত বৃদ্ধ ও রোগীরা দুধের সাথে পাউরুটি খেতেন। পরবর্তী সময়ে ইরাকিরা ঢাকার চকবাজারে চালু করে বাগদাদি রুটি। মোগল যুগের শেষের দিকে গুজরাটিরা ঢাকায় ছাতুর প্রচলন করে। আজ থেকে প্রায় দেড়শ বছর আগের ইতিহাস থেকে জানা যায়, কাঁটার ভয়ে তখন মাছ খেতো না অনেকে। পরবর্তী সময়ে রিঠা, রুই, চিংড়িসহ বড় কাঁটার মাছ মাংসের মসলা ও মেথি দিয়ে রান্না করে খাওয়া শুরু করে তারা। এতে দেখা গেলো রান্নার প্রক্রিয়াটা তাদের হলেও উপাদান ছিল আমাদের এখানকার। যার ফলে এই দুটো মিলে সৃষ্টি হলো নতুন এক খাদ্যরীতি।
মোগল যুগে মিষ্টান্ন ছিল ঢাকাবাসীর অত্যন্ত প্রিয়। দইয়ের সাথে দুধ জ্বাল দিয়ে তৈরি পাতক্ষীর কলাপাতায় পরিবেশন করা হতো। গুড়ের মন্ডা, তিলের খাজা, নাড়ু, বাতাসা, তাল মিছরি জনপ্রিয় মিষ্টান্ন হিসেবে ঠাঁই পেয়েছিলো ঢাকাবাসীর কাছে। সে সময়  দুগ্ধজাত মিষ্টির সুনামও ছিল বেশ। মিষ্টান্নের মধ্যে লালমোহন, ছানার সন্দেশ, কালোজাম, রস কদম,  খিরসা দই জনপ্রিয় ছিল। হিন্দুগোত্রের ময়রারা মিষ্টি তৈরির জন্য বিখ্যাত ছিল। তারা জিলাপি, ছানার সন্দেশ, রাজভোগ, রসগোল্লা, মোহনভোগ, ক্ষীরভোগ, প্রাণহরা ইত্যাদি তৈরিতে পারদর্শী ছিল। বিক্রমপুরের গাওয়া ঘি, পাটালি গুড়, ধামরাইয়ের পাতক্ষীর ঢাকায় বেশ বেচাকেনা হতো। সাভারের ‘রাজভোগ’ মিষ্টি ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এটমবোমা নামের এক ধরনের মিষ্টির প্রচলন শুরু হয়। বড় আকারের মিষ্টিটি ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। এছাড়া লেডিকেনি নামের মিষ্টির সুনামও ছিল বেশ। মোগল ঢাকার বরফি ও লাড্ডু আজও জনপ্রিয়।


ঢাকাবাসীর দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস
প্রাক-মোগল থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমল পর্যন্ত সবসময় ঢাকার জনগণ সকাল, দুপুর ও রাতে- এই তিনবেলা খাদ্য গ্রহণে অভ্যস্ত ছিল। প্রাচীনকালে ঢাকাবাসী তিনবেলাই ভাত খেতো। সকালে ভাতের সাথে মাছ, মাংসের পাশাপাশি ঘি-চিনি, মালাই-চিনি, ডিম ভাজা, আম, কলা, দুধ, গুড় ইত্যাদি খাওয়া হতো। এছাড়া চিড়া-কলা, চিড়া-গুড়, মালাই-মুড়ি দিয়েও নাশতা করতো অনেকে। কেউ কেউ আবার চা, পুরি, বাকরখানি দিয়ে নাশতা সেরে নিতো। ভোর থেকে বিক্রি হতো এক ধরনের ঘোল, যাকে স্থানীয়রা মাঠা বলতো। এটি খুবই জনপ্রিয় ছিল ঢাকাবাসীর কাছে। অনেকে মনে করতো মাঠা খেলে পেট ঠান্ডা থাকে। উচ্চবিত্তরা সকালের নাশতায় রুটি ও পরোটা খেতো।
উনিশ শতকে চা বিস্কুট খাওয়ার প্রচলন শুরু হয়। ঢাকায় তৈরি বিস্কুটের মধ্যে অন্যতম ছিল লাঠি, কুলিচা, নানখাতাই, টোস্ট। ধীরে ধীরে বিস্কুটের পাশাপাশি মুড়ি, রুটি, পাউরুটি খাওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়। সকালে অনেকে চায়ের সঙ্গে নারিকেল দিয়ে তৈরি গোলগোলা খেতো। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে চকবাজার ও এর আশপাশের এলাকায় প্রচুর খাবারের দোকান গড়ে ওঠে। সে সময় বেশকিছু পরিবারে সকালের নাশতা কিনে খাওয়ার রীতি দেখা যায়। এসব খাবারের মধ্যে ভাজি-পুরি, লুচি, মোহনভোগ, তন্দুর রুটি- নেহারি, পরোটা-বুন্দিয়া, হালুয়া, বাকরখানি, তেহারি, বিরিয়ানি অন্যতম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সৈনিকদের সহজে খাবার সরবরাহ করার জন্য প্রচুর পরিমাণে গম আমদানি করা হয়েছিল। ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের মধ্যেও রুটি খাওয়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে ব্যাপকভাবে। আগে তিনবেলা ভাত খেতে পছন্দ করলেও এরপর থেকে মানুষ সকালে রুটি খাওয়া শুরু করে। ঢাকাবাসীর কাছে চিনি পরোটা, আলু পরোটা, ডাল পরোটা, ঘি পরোটার জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করে।
আদিকালে ঢাকাবাসীর রাতের খাবারে আমিষের আধিক্য লক্ষ করা যেতো। ধারণা করা হয়, রাতে গৃহকর্তাসহ পরিবারের সকল সদস্য একসাথে খাবার খেতো বলেই এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। চকবাজারের লাবড়ি, পাতখিসসা ও মালাই ছিল খুবই জনপ্রিয়। প্রাচীন ঢাকাইয়ারা খাবারের পর একটুখানি ভাত রেখে সেটা মালাই দিয়ে মেখে খেতে পছন্দ করতো।
ঐতিহ্যবাহী আঞ্চলিক খাবার
প্রাচীন ঢাকায় অঞ্চলভিত্তিক কিছু খাবারের সুনাম ছিল আকাশছোঁয়া। যেমন চকবাজারের বড় বাপের পোলা। এর নাম অবশ্য শেখচুড়া ছিল তখন। উর্দুভাষীরা চিড়াকে চুড়া বলতো বলেই এ নামকরণ। রমজান মাসে বেশি বিক্রি হতো এটি। চকবাজারে ছিল শুধু পোলাওর বাজার। দেখা যেতো একই স্থানে বিক্রি হচ্ছে ডিমের তরকারি দেওয়া ‘আন্ডা পোলাও।’ আবার পাশে বিক্রি হচ্ছে কোফতা পোলাও ও মোরগ পোলাও। তেহারি, বিরিয়ানিও পাওয়া যেতো সেখানে। বংশালের চৌরাস্তায় আলাউদ্দিনের পুরি, ডালরুটি, ভাজাপুরি, গুজাপিঠা ও হালিমের এক নম্বর চা ছিল ছিল অতিথি আপ্যায়নের জন্য বিখ্যাত। মিটফোর্ডের সামনে তিন্নি সুইটসের লম্বাটে লালমোহন ছিল অত্যন্ত সুস্বাদু। চকবাজারের নূরানি কোল্ড ড্রিংক, নাজিরা বাজারের হাজির বিরিয়ানি, তার উলটো দিকে হানিফের বিরিয়ানির চাহিদা ছিল তুঙ্গে। নান্না মিয়ার পোলাও, ইসলামপুরের সাইনুর মোরগ পোলাও, পাগলার গ্লাসিও ছিল জনপ্রিয়তার শীর্ষে। এছাড়া স্বাদে অতুলনীয় ক্যাপিটালের ঘিয়ের পাপড়ি, আলাউদ্দিনের লাচ্ছা সেমাই, চকবাজারের হোটেল নিয়াজীর হালিম, সুভার চা, রওশনের চা ছিল খুবই জনপ্রিয়। লখনৌ থেকে আসা আলাউদ্দিনের হালুয়ার চাহিদা ছিল ব্যাপক। মহররমের সময় হোসেনি দালানের মাসের বড়া খাওয়ার জন্য ভিড় করতো সবাই। ছিলা ধনিয়াও অনেকের আকর্ষণের কেন্দ্রে ছিল। এটি পরিবেশন করা হতো সুন্দর পুরিয়া বানিয়ে। অনেকটা পানের মতো খিলি করে। মহররমের সময় মঞ্জিলের দিন সকালে কলাপাতায় পাতি ক্ষিরসা পাওয়া যেতো। কায়েস কা লাড্ডু, বংশালের মোল্লার চা, খাসির গ্লাসি, আল রাজ্জাকের তন্দুরি, চকবাজারের হোটেল খাওয়া দাওয়ার পোলাও, ভাজিপুরির চাহিদা ছিল ব্যাপক। নয়াবাজারের লাটমিয়ার হালুয়া, রুটি, ভাজি, দই, মিষ্টি, আনন্দ কনফেকশনারির পরোটা, কাবাব, ওভালটিন কেক, বড় আকারের সুতলি কাবাব অতিথি আপ্যায়নের জন্য বিখ্যাত ছিল। পাকিস্তান আমলে এক ব্যক্তি চামান কা মিঠাই নামক মিষ্টি বিক্রি করতো ফেরি করে। আম, কলা, কাঁঠালসহ বিভিন্ন আকৃতির হতো মিষ্টিগুলো। বিচিত্র নকশার কারণে খুবই জনপ্রিয় ছিল সেগুলো।
হাজির বিরিয়ানি, নান্নার পোলাও, তেহারি, মুরগি মোসাল্লাম, ইসলামপুরের পাগলার গ্লাসিসহ ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন খাবারের কদর রয়েছে সেই প্রাচীনকাল থেকেই। মোগলাই এই খাবারগুলো অবশ্য মানুষ রোজ রোজ খায় না। দাওয়াত বা উৎসব-পার্বণে এ ধরনের খাবার পরিবেশন করা হতো। পোলাওয়ের ছিল বিভিন্ন ধরন। বুন্দিয়া পোলাও, কালিয়া পোলাও, হোগলা পোলাও, মোরগ পোলাও ইত্যাদি ছিল ঢাকাবাসীর প্রিয় খাবার। তোপখানা রোডের ক্যাফে ঝিল, ঝুনুর পোলাও ঘর, হোটেল আল রাজ্জাক, হোটেল স্টার, বিউটি বোর্ডিং, ফখরুদ্দীন বিরিয়ানি, কল্পনা বোর্ডিং ও হোটেল, জনসন রোডের মানিক সুইটমিট ছিল প্রসিদ্ধ খাবারের জন্য জনপ্রিয়।    

তথ্য: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের এম. ফিল গবেষক শায়লা পারভীন; কিংবদন্তীর ঢাকা, নাজির হোসেন

/এনএ/

লাইভ

টপ