শাড়ির ঢঙে ফিউশন

Send
সুরবি প্রত্যয়ী
প্রকাশিত : ১৯:০০, মে ২৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:১৬, মে ২৭, ২০১৯

বেশিরভাগ বাঙালি নারীর কাছে প্রিয় পোশাক মানেই শাড়ি। তবে যতই প্রিয় হোক না কেন, কিছুদিন আগ পর্যন্তও বাঙালি তরুণীদের অভিযোগ ছিল শাড়ি গায়ে জড়ানোর ঝক্কি নিয়ে; একদিক দিয়ে কুচি ঠিকঠাক করে পরার ঝামেলা, অন্যদিকে শাড়ি সামলানো। আদি আমল থেকে আমরা দুইভাবেই শাড়ি পরার চল দেখে আসছি, এক প্যাঁচে অথবা কুচি দিয়ে বাম কাঁধে আঁচল ফেলে। তবে সম্প্রতি ফ্যাশন বদলের সঙ্গে বাঙালি নারীর সেই চিরাচরিত শাড়ি গায়ে জড়ানোর বা ড্রেপিংয়ের স্টাইলে এসেছে ভিন্নতা। এখন শাড়ি পরা হচ্ছে বেল্ট দিয়ে, প্যান্ট দিয়ে, ব্লাউজের বদলে টিশার্ট বা টপ দিয়ে, গাউনের মতো করে ড্রেস হিসেবে, পায়ে স্নিকারসের সাথে বা উপরে কটি চাপিয়েও। শাড়িতে ফিউশন এনেছে রঙিন পকেট।

পোশাক ও ছবি: বাটারফ্লাই বাই সাগুফতা
আসন্ন ঈদেও শাড়ি ড্রেপিংয়ে তরুণীদের নানা স্টাইল চোখে পড়বে- সাম্প্রতিক সময়ের বেশ কয়েকজন ফ্যাশন ডিজাইনার, স্টাইলিস্ট এবং ফ্যাশন ব্লগারদের সঙ্গে কথা বলে তেমনটাই জানা গেল। এ সময়ের বেশকিছু অনলাইন এবং অফলাইন ফ্যাশন হাউজ এই ঈদে তাদের স্টাইলিংয়ে কাজ করেছে নতুন ধরনের এই শাড়ি ড্রেপিংয়ের টেকনিক নিয়ে। এই হাউজগুলোর মধ্যে অন্যতম ফ্যাশন হাউজ ‘বাটারফ্লাই বাই সাগুফতা।’ ডিজাইনার সাগুফতা ওসমানের ‘বাটারফ্লাই বাই সাগুফতা’-এর শাড়ি গাউন বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। গাউনের শিলুয়েটে তৈরি শাড়ির আধুনিক সংস্করণ এটি। সাগুফতা বললেন, ‘এই পোশাকটা গাউনের মতো করেই পরা যায়, তাই পরতে কোনও রকম ঝামেলা নেই। আবার পরার পর দেখতেও শাড়ির মতো লাগে। রাতের পার্টি, বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে তারকাবহুল রেড কার্পেট সব আয়োজনেই শাড়ি গাউন মানানসই একটি পোশাক।’ এবারের ঈদে বেল্ট দিয়ে শাড়ি পরার ট্রেন্ডটাও বেশ চলবে বলে মনে করেন সাগুফতা ওসমান। ‘শাড়ির সাথে বেল্ট পরার দুইটি সুবিধা আছে। প্রথম হচ্ছে বেল্টের কারণে শাড়ি শরীরের সাথে এঁটে থাকে। এছাড়া নতুন যারা শাড়ি পরছেন তাদের মধ্যে শাড়ি খুলে যাওয়ার ভয়টা কম থাকে। আবার বেল্ট পরলে দেখতেও খুব ফিট লাগে’- বলেন এই ডিজাইনার।

পোশাক ও ছবি: প্রাইড

‘প্রাইড লিমিটেড’-এর ঈদের শাড়ি কালেকশনের এবারের মূল বিষয় শাড়ি ড্রেপিংকে মডার্ন লুক দেওয়ার প্রচেষ্টা। প্রাইডের ঈদ ফটোশুটের নির্দেশনা দিয়েছেন ফ্রিল্যান্স স্টাইলিস্ট এবং ফ্যাশন ডিরেক্টর শিমতানা শামীম। তিনি বললেন, ‘প্রথমদিকে শাড়ি পরায় এই ভিন্নতার বিষয়টা কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়ে কিংবা নীরিক্ষার জন্য করা হচ্ছিল। কিন্তু ক্রমেই এখন মূলধারার ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে এটি। আমাদের একটা ধারণা ছিল যে শাড়ি আসলে খুব ফরমাল একটি পোশাক এবং কেবল বিশেষ আয়োজন বা দাওয়াতে কিংবা অফিসিয়াল প্রেজেন্টেশন বা গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়েই শাড়ি পরা যাবে। আর পরার ঝামেলার কথা চিন্তা করে আমরা দৈনন্দিন জীবনে শাড়িটাকে একরকম এড়িয়েই চলতাম। কিন্তু সম্প্রতি শাড়ি পরার স্টাইলে ভিন্নতা আসার কারণে তরুণীদের কাছে বিষয়টা বেশ সহজ হয়ে গিয়েছে এবং তাই শাড়ি পরার চলটাও অনেকখানি ফিরে এসেছে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কেবল বদলেছে স্টাইলটা।’ প্রাইডের এবারের ঈদ কালেকশনে থাকছে প্যান্ট শাড়ি, টি-শার্ট দিয়ে শাড়ি আর থাকছে শাড়ির সাথে কোমরে বেল্ট। এসব স্টাইলেই সবচেয়ে বড় সুবিধা শাড়িতে কুচি দেওয়ার ঝামেলাটা নেই, ড্রেসের মতই পরে ফেলা যায়, সেট হয়ে যায় শাড়ির মত।

পোশাক ও ছবি: বাটারফ্লাই বাই সাগুফতা
ফ্যাশন এবং বিউটি ব্লগার ডা. নিলয় ফারহানা ব্যক্তিগতভাবে শাড়ি পরতে খুব পছন্দ করেন। দৈনন্দিন জীবনের পোশাক হিসেবে সালোওয়ার-কামিজ কিংবা ওয়েস্টার্ন পোশাকের মতো শাড়িটাও তিনি নিয়ম করেই পরেন সপ্তাহে কমপক্ষে ৪ থেকে ৫ দিন, যেকোনও জায়গায়। শাড়ি ড্রেপিংয়ের এই নতুন স্টাইল নিয়ে তিনি বললেন, ‘আমার কাছে মনে হয় শাড়ি পরার এই নতুন স্টাইলগুলো আমাদের মধ্যে এসেছে আমাদের মুক্তচিন্তার একটা অংশ হিসেবে। চিরাচরিত ধ্যানধারণা থেকে বের হয়ে মানুষ এখন চায় নতুন, আধুনিক কিছু। সেখান থেকেই কিন্তু ফিউশন, সাংস্কৃতিক বিনিময়, বিশ্বায়ন এই টার্মগুলো আমরা দৈনন্দিন জীবনে এর প্র্যাকটিস করছি। সেই জায়গাটা থেকেই আমাদের সবচাইতে ঐতিহ্যবাহী পোশাকের স্টাইলিংয়ে এসেছে এই নতুনত্ব। সকালবেলা অফিস থেকে শুরু করে সন্ধ্যার পার্টি পর্যন্ত আমি এখন একই শাড়ি দিয়ে কাটিয়ে দিতে পারি কেবল ড্রেপিং স্টাইলটা বদলে দিয়ে।  আর এর ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে বেড়েছে দেশীয় শাড়ির গ্রহণযোগ্যতা। শাড়ি এখন সব বয়সী নারীরাই পরতে চায় এর সহজতার জন্য।’

ফ্যাশন এবং বিউটি ব্লগার ডা. নিলয় ফারহানা

পোশাক: ক্লাবহাউজ
দেশীয় ফ্যাশন হাউজ বিবিয়ানা’র স্বত্বাধিকারী লিপি খন্দকারের মতটা একটু ভিন্ন। যদিও তিনি এটাকে ফ্যাশনে ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবেই দেখছেন। তবে তিনি আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি, রক্ষণশীল পরিবেশ এবং শালীনতার বিষয়টা নিয়েও উদ্বিগ্ন। ‘নারীদের মধ্যে শাড়ি পরার আগ্রহটা বেড়ে গেছে দেখে আমার খুব ভালো লাগে। তবে আমাদের এমন কিছুই করা উচিত না যেটা আমাদের নিজস্ব দেশীয় ধ্যানধারণার পরিপন্থী’- বলেন তিনি।

পোশাক ও ছবি: ক্লাব হাউজ
অনেক নারী এখন শাড়ির উপর কটি পরছেন। ডিজাইনার এবং অ্যাক্টিভিস্ট আফসানা ফেরদৌসী মনে করেন শাড়ির সাথে কটি কিংবা ভিন্ন স্টাইলে ব্লাউজ পরার চলটা এসেছে পেশাগত প্রয়োজনে। নারী উকিল কিংবা ডাক্তার বা পেশাগত ইউনিফর্ম পরেন এমন সকল নারীই শাড়ি পরলে তার উপর ইউনিফর্ম পরেন। আগে পেশাগত কারণে পরতে হলেও সময়ের বিবর্তনে এখন এটা ফ্যাশন। তিনি নিজে তার ব্লাউজের ডিজাইনগুলোয় ডেনিম, গ্যাবার্ডিন ইত্যাদি আনকমন ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করেন। তবে তার মতে, ‘শাড়ি পরার এই নতুন স্টাইল আমার কাছে ক্ষণস্থায়ী মনে হয়। কারণ এই স্টাইলটা ট্রেন্ডি হলেও, আমাদের চিরাচরিত শাড়ি পরার স্টাইলই আমার কাছে ক্লাসিক।’
এবারের ঈদে শাড়ির ফ্যাশনে আরেকটি আকর্ষণ পকেট শাড়ি। ডিজাইনার নীলিমা সরকার তার অনলাইন ফ্যাশন হাউজ ‘অনিন্দ্য’তে প্রথমবারের মতো এই শাড়ি এনে ইতোমধ্যেই সকলের নজর কেড়েছেন। ‘আমার যে কাজ তাতে ফোন সবসময় কাছে রাখতে হয়, যেহেতু ব্যবসাটা অনলাইন বেইজড। একটা শাড়ি বানাতে গিয়ে জামার পকেট থেকে ফোন বের করছিলাম, তখনি মনে হয়েছিল জামায় যদি পকেট থাকতে পারে, তাহলে শাড়িতে কেন পকেট থাকবে না। যারা সবসময় শাড়ি পরেন তাদের জন্য হয়তো শাড়ির পকেটটি কাজে আসতে পারে, এছাড়াও এটি স্টাইলে ভিন্ন মাত্রা যোগ করবে বলে মনে হচ্ছিল। মানুষ ব্যাপারটা কীভাবে নেবে এতকিছু চিন্তা না করেই তখন শাড়ির পাড় লাগানোর জন্য যে কাপড় ব্যবহার করব তার থেকে কিছু অংশ কেটে পকেটের ফরমা বানিয়ে ফেললাম, জুড়ে দিলাম শাড়িতে।’- এভাবেই পকেট শাড়ির উৎপত্তি বলছিলেন নীলিমা সরকার।

পোশাক ও ছবি: অনিন্দ্য
প্রাইড, বাটারফ্লাই বাই সাগুফতা, অনিন্দ্য ছাড়াও সিকোসো, ওয়্যারহাউজ, ক্লাবহাউজ, ইত্যাদি অনলাইন এবং অফলাইন ফ্যাশন হাউজগুলোতে পাবেন নতুন ধরনের এসব শাড়ি। সঙ্গে পাবেন বেল্ট, স্নিকার্স ও কটির মত অ্যাকসেসরিজগুলোও।

/এনএ/

লাইভ

টপ