রান্নায় আনন্দ, আনন্দের রান্না

Send
ফাতেমা আবেদীন
প্রকাশিত : ১৮:৪৪, অক্টোবর ০৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:০৮, অক্টোবর ০৫, ২০১৯

আমরা যখন মিডিয়াপাড়া সার্বজনীন দুর্গাপূজায় পৌঁছাই তখন সবে ভোগের খিচুড়ির ছয়,ছয়টা হাড়ি নেমেছে চুলা থেকে। শেফালি বৌদি সব তদারকি করছেন। আনন্দ দাদা, তথা পূজার পেটপুজোর মূল কান্ডারি আনন্দ চন্দ্র পাল তখন গিয়েছেন চামচ কিনতে। খালি হাতে খাবার ছোঁয়া যাবে না তাই বাড়তি কিছু চামচ আনতে গিয়েছিলেন। পরিবেশনে হাত দিয়ে ছোঁয়া না গেলেও খেতে হবে কিন্তু হাত দিয়েই। এটাই পূজার খাবার খাওয়ার নিয়ম এমনটাই বললেন তিনি।  

সাত থেকে আটটা চামচের সঙ্গে আনন্দ পাল আনলেন এক বোতল কোমল পানীয়। এটা কেন? দুপুরের তপ্ত রোদে ঘেমে নেয়ে যাওয়া টিমমেটদের জন্য ঠাণ্ডা পানীয় এনেছেন দলনেতা।

৪০ বছর ধরে দেশের নানা স্থানে ঘুরেফিরে রান্না করছেন। পূজা এলে তাকে নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ে যায় পূজা আয়োজন কমিটিগুলোর মধ্যে। সঙ্গে থাকেন সহধর্মিনী শেফালি চন্দ্র পাল। ৩০ বছরের সংসার, ছয় ছেলেমেয়ে। তিনজনের বিয়ে হয়ে গেছে। দুজন বাবার মতো রান্নার পেশায় এসেছে।হাসি-আনন্দই রান্নার মূলমন্ত্র

বিয়ে বাড়ির পোলাউ, কোরমা, রেজালা থেকে শুরু করে পূজার ভোগ কোনো রান্নাতেই আপত্তি নেই আনন্দ-শেফালি দম্পত্তির। রান্না করাটাই এক ধরনের পূজা তাদের কাছে। প্রতিদিন রান্না শুরুর আগে পূজা সেরে নেন। কোন হাতা দিয়ে কোন রান্না নাড়া দেওয়া হবে সেটিও সকালেই আগে ঠিক করে নেন। এখানে নিয়ম ভীষণ কড়া।

বাবার সঙ্গে রান্না শুরু করেছিলেন আনন্দ পাল। তবে ঠাকুরদাদা রান্না করতেন না। তিনি জমি চাষ করতেন আর প্রতিমা গড়তেন। আনন্দ নিজেও প্রতিমা গড়েছেন অনেক। রান্নার চাপ কম থাকলেই বসে যান প্রতিমা গড়ার কাজে। সেটা সখ। সে কাজেও সঙ্গ দেন স্ত্রী শেফালি।

আনন্দ পাল জানালেন ছেলে, বউ আর তার আলাদা আলাদা তিনটা দল আছে। শেফালি একাই ২০ জনের একটি পাচক দল নিয়ে কাজ করেন। সার্বজনীন দুর্গাপূজার মতো বড় আয়োজন হলে স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে কাজ করেন। ছেলে আবার ভীষণ ভালো মিষ্টি বানায়। তার দল আলাদা, এই পূজায় দুই ছেলে উত্তরার দুই স্থানে গিয়েছেন রান্নার কাজ নিয়ে।

এত মানুষের জন্য রান্নার কাজটা ভীষণ উপভোগ করেন শেফালি পাল। রান্নাঘরে তার এবং আনন্দ’র প্রধান নীতি কিচ্ছু ফেলা যাবে না, আর সব ঋতুভিত্তিক ফল, সবজি খাবারে ব্যবহার করতে হবে। তাই ভোগের খিচুড়িতে জলপাইয়ের দেখা মেলে। লাউয়ের খোসা ফেলে না দিয়ে ভাজা হয়ে ভোগের থালায় ওঠে অমৃত হয়ে। সারারাত বসে থেকে ঐ কুটেছেন সকালে সবাইকে চমকে দেবেন বলে।

পোস্ত দিয়ে বাঁধাকপির কুড়মুড়ে পাকোরা খেতে খেতে আমরা তখন আনন্দ-শেফালি দম্পতির রান্নার সরঞ্জাম দেখছি, হরেক রকম মরিচ-মসলার সমাহার। মণ্ডপের এক পাশে ছাউনি দিয়ে রান্নার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে সবার প্রবেশাধিকারও নেই। কারণ পরিচ্ছন্নতাই রান্নার প্রথম মূলমন্ত্র মনে করে এই দম্পতি। সবাই হাত দেবে খাবারে সেই সুযোগও নেই। শত মানুষের খাওয়া যেন একটুও নষ্ট না হয়, স্বাদে যেন অসঙ্গতি না থাকে সেটাই ধ্যান-জ্ঞান।  

এত হাজার মানুষের জন্য রান্নার মধ্যে বাড়িতে রেখে আসা ছেলে-মেয়ের কথা বলছিলেন বারবার। ছোট মেয়েটা এবার জেএসসি পরীক্ষার্থী। পূজায় বাবা-মাকে কখনোই পায় না। তাই নিয়ে একটু আফসোস করলেও এত মানুষ খেয়ে খুশি হচ্ছে সেই প্রশান্তিতেই ভীষণ পুলকিত তারা। অন্নপূর্ণার আশীর্বাদ নিয়ে এভাবেই পূজা-পার্বন বা বিয়েতে রান্না করেই জীবন কাটিয়ে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছেন দু’জনে। রান্নার ফাঁকে ফাঁকে চলে এই দম্পতির খুনসুটি। হাসি-আনন্দেই চলে আনন্দের রান্না।

 আনন্দ স্পেশাল বাঁধাকপির পাকোরার রেসিপি-

বাঁধাকপি- দুই কাপ (মিহি কুচানো)

পোস্ত দানা- ১ চামচ

মরিচ গুঁড়া- ১ চামচ

কাঁচা মরিচ কুচি- ১ চামচ

হলুদ গুঁড়া- আধ চা চামচ

জিরা গুঁড়া- আধ চা চামচ

চালের গুঁড়া- এক মুঠো

ময়দা- ১ মুঠো

লবণ- স্বাদ মতো  

সব উপকরণ একসঙ্গে মেখে বেশ কিছুক্ষণ মেখে রাখুন। আধঘণ্টা পর ডুবো তেলে মুচমুচে করে ভেজে তুলুন বাঁধাকপির পাকোরা।

 

/এফএএন/

লাইভ

টপ