behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

দুবলার চরে রাসমেলায়...

ফারুখ আহমেদ।।১৭:৩০, নভেম্বর ১৩, ২০১৫

_MG_0224ভোর পাঁচটা হবে তখন। ঘুম ভেঙ্গে গেল। তাকিয়ে দেখি আবছা সরের মত কুয়াশা লেগে আছে চারদিকে। এমন দৃশ্যে আবেশে আচ্ছন্ন হলাম। মাথা তুলে এদিক ওদিক তাকাই, শান্ত চারপাশ। স্বপ্নের মত ঠান্ডা হাওয়া বইছিল ঝিরঝির। বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করছিল না, কম্বলটা আরও ভাল করে গায়ে টেনে দিতেই পাশ থেকে কারও ধাক্কা! সঙ্গে পশুর নদীর ঢেউয়ের দোল। সুতরাং বিছানা ছাড়তেই হল। ইতোমধ্যে নাজমুল হক স্যার ক্যামেরা হাতে ট্রলারের সামনের দিকে চলে গেছেন। আর রাজীব রাসেল ক্যামেরায় পোজ দিতে গোলুইতে বসে পড়েছেন। আমি আকাশের দিকে দৃষ্টি ফেরালাম। হলুদাভ কিছু নজরে আসতেই নড়েচড়ে বসলাম। পূর্ব দিগন্তে কিছু একটা হচ্ছে। চোখ কচলে স্থির তাকালাম। একসময় ধীরে ধীরে লাল থালার মত সূর্য আমার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে হাসল। বিমোহিত আমি স্থির তাকিয়েই রইলাম, চোখ-মন কোনটাই ফেরাতে পারলাম না। হাত হয়ে গেল অচল, ক্যামেরা চলল না। পশুর নদীর সেই ভোর আর সূর্যোদয় আজীবন মনে থাকবে।

IMG_9082

বঙ্গোপসাগরের কোলে জেগে ওঠা ছোট্ট দ্বীপ দুবলার চর। অনেকে এই চরকে বলেন আলোর কোল। আলোর কোল বা দুবলার চরে রাস মেলার রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য। পশুর ও কুঙ্গা নদীর মোহনায় জেগে ওঠা ছোট্ট এই চরে প্রতিবছর কার্তিক অগ্রায়ন পূর্ণিমা তিথীতে বসে রাসমেলা। রাসমেলা উপলক্ষে এখানে আসেন অর্ধলক্ষাধিক পুণ্যার্থী। উৎসবে সামিল হতে আসেন দেশ-বিদেশের বহু পর্যটক। গত বছর প্রথমবারের মতো গিয়েছিলাম রাসমেলায়। যাত্রাসঙ্গী ছিল সিলেট, চট্টগ্রাম আর ঢাকা মিলে মোট ১২ জন। মাওয়া-কাওড়াকান্দি হয়ে মাদারিপুর আর গোপালগঞ্জ পেছনে ফেলে ভোরবেলাতেই ছুটে চললাম মংলা সমুদ্র বন্দরের দিকে, পৌঁছলাম দুপুরে। এখানে আগে থেকেই ট্রলার ঠিক করা ছিল। কিছু প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহ আর খাওয়া দাওয়া শেষে যখন ট্রলারে উঠি তখন বিকাল।

IMG_9421

সেই বিকালে আমরা করমজল ইকোপার্কে যাই। এখানে রয়েছে বিশাল ওয়াচটাওয়ার। যেখানে দাঁড়িয়ে পুরো সুন্দরবনে একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যায়। আমরা করমজল ঘুরে বন বিভাগের প্রবেশ অনুমতির অপেক্ষায় নন্দবালা টহল ঘাঁটিতে অপেক্ষায় বসি। এখানেই জানতে পারি মংলাসহ সুন্দরবনের মোট আটটি পয়েন্ট দিয়ে রাসমেলায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। এরমধ্যে আমরা পাশের জয়মনি বাজার ঘুরে এসেছি। প্রবেশপত্র বা অনুমতি পাওয়া গেল রাত বারোটায়, তারপরই শুরু হল আমাদের মূল যাত্রা। সেই রাতে আকাশে চাঁদ ছিল, দমকা বাতাস ছিল। সঙ্গীরা সবাই আড্ডায় মেতে উঠলো। আর আমি আগে ভাগে ঘুমাতে চলে গেলাম। তারপরই তো সেই ভোরে সূর্যের নরম আলোয় মন ভরে যাওয়া।

IMG_9918

আমাদের ট্রলার তখন বঙ্গোপসাগরের নোনাজল বিলি কেটে ছুটে চলেছে। এরমধ্যে আমাদের গাইড কৃষ্ণদা জানালেন, আমরা পথ হারিয়েছি! নেটওয়ার্কের বাইরে চলে এসেছি সুতরাং যোগাযোগের কোন উপায় নেই। আশেপাশে কোন ট্রলারও নেই। মাঝি এসে আমাদের আশ্বস্ত করলো সামনেই দুবলার চর, কোন সমস্যা নাই। একসময় আমরা সুন্দরবন ঘেরা সুন্দর এক দ্বীপে চলে আসি। সেই দ্বীপে তখন আমাদের মতই এক পথহারা ট্রলার দাঁড়িয়ে, তাদের সঙ্গে কথা বলে সেই দ্বীপে নামার প্রস্তুতি নিলাম। তখনই হইহই করে বনবিভাগের নিরাপত্তারক্ষীবাহী ট্রলারের আগমন। তাদের কাছেই জানতে পারি সেই চরের নাম মাধিয়ার দ্বীপ বা মাইধ্যার দ্বীপ। আমরা কেবল ভুল পথে আসিনি, ভয়ংকর বিপদসংকুল এলাকায় চলে এসেছি। শুনে তো আমাদের দিশাহারা অবস্থা। এবার আমরা সঠিক পথ জেনে নিয়ে ছুটে চললাম দুবলার চরের দিকে। আরও দুইঘন্টা সমুদ্র ভ্রমণ শেষে আরেক দুপুরে দুবলার চর পৌঁছলাম। ধকল একটু বেশি গেলেও সবাই ব্যাগ গুছিয়ে সমুদ্রস্নানে ছুটল।

_MG_0392

সমুদ্রস্নানের পাশাপাশি সে রাতে আমরা স্নান করেছিলাম জোছনাতেও। আর রাতের খাবার টাটকা মাছ ভাজার সঙ্গে আলুভর্তা ভাত। তারপর বহুপথ হেঁটে গিয়েছিলাম স্থানীয় নিউ মার্কেট, তারপর মেলাস্থল। আমরা মেলা ঘুরে দেখি, কীর্ত্তন শুনি। তারপর চলে আসি পাশের সমুদ্র সৈকতে।

IMG_9846

দুটো ডাব গাছ, অনেকগুলো কাটা গাছ যেন এক একটি আলাদা ভাস্কর্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সৈকতে। সে জোছনা ভরা রাতে আমরা রাসমেলার পাশে দুবলার চর সমুদ্র সৈকতে বসেছিলাম রাত দুইটা পর্যন্ত। তারপর ট্রলারে ফিরে ঘুম। সে ঘুম ভাঙ্গে পাশের অনেকগুলো ট্রলার থেকে ভেসে আসা প্রার্থনা সংগীতে। আমরাও তৈরি হয়ে নিই। তারপর ছুটে যাই সমুদ্র সৈকতে।

IMG_9439

সনাতন ধর্মাবলম্বীরা সবাই পূজায় ব্যস্ত। দেবতা নীলকমল ও গঙ্গাদেবীর উদ্দেশ্যে সমুদ্র তীরে বসে সবাই পূজা দিচ্ছেন। ডাব, মিষ্টি আর আগরবাতি নিয়ে পূজা শেষ করে সেসব ডাব আর মিষ্টি সমুদ্রের ঢেউয়ে উৎসর্গ করছেন। তারপরই পাপ মোচনের জন্য সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়া।

IMG_9598

সমুদ্র থেকে উঠে আসার সময় সবাই সংগ্রহ করে নিয়ে আসছেন পবিত্র জল। এসব জল নিজে রাখবেন আর দেবেন প্রিয়জনকে। আসলে মানুষের টিকে থাকার সংগ্রাম পরস্পরকে ভালোবেসে। এমন উৎসবে না এলে সেটা বোঝা খুব কষ্টকর। আমরা সেটা বুঝলাম, আরও বুঝলাম কেন পর্যটকদের স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছে দুবলার চর!

IMG_9681

প্রয়োজনীয় তথ্য
প্রতিবছর কার্তিক অগ্রায়ন পূর্ণিমা তিথীতে দুবলার চরে বসে রাসমেলা। এই চরের মোট আয়তন ৮১ বর্গমাইল। পুরোটাই সুন্দরবনের দক্ষিণে সমুদ্র কোল ঘেঁষে। রাসমেলা মনিপুরীদের প্রধান উৎসব হলেও বিভিন্ন হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যেও এই উৎসব পালিত হয়। অনেকে দুবলার চরের রাসমেলা উৎসবকে মৎস আহরণ উৎসব বলে মনে করেন। কারণ রাসমেলার পরপরই শুরু হয় পুরোদমে মৎস আহরণ। দুবলার চর বা রাসমেলায় যেতে হবে আপনাকে পূর্ণিমা তিথীকে সামনে রেখে। এ মাসের পূর্ণিমা ২৬ নভেম্বর, সময় বেশি নেই। দলবেঁধে বা একা যেভাবেই যান, সুন্দরবন প্যাকেজ ট্যুরের ব্যবস্থাপক যে কোনও ভাল ট্যুরিষ্ট গাইডের সহযোগিতা নিতে পারেন।

IMG_9384

এ সময় সুন্দর বনের আটটি পয়েন্ট কর্তৃপক্ষ খুলে দিয়ে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেন। তাই নিজেরাও ট্রলার ভাড়া করে চলে যেতে পারেন দুবলার চর। সেক্ষেত্রে জানাশোনা ভাল গাইড ও ট্রলার নেবেন। নিজেদের আয়োজনে গেলে ঢাকা থেকে সর্বসাকুল্যে খরচ হবে জনপ্রতি ৫ হাজার টাকার মতো। আর টুরিষ্ট গাইডের এর প্যাকেজে গেলে জনপ্রতি খরচ হবে ৭ থেকে ১২ হাজার টাকা।


ছবি: লেখক

/এনএ/

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ