behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

লোকজ সংগ্রহশালা লোকায়ণ

সামিউল্যাহ সমরাট॥১৭:৪৭, নভেম্বর ০৯, ২০১৫

টাঙ্গন নদীর পাড়ে চায়ের আড্ডা চলছিল । সঙ্গী কামাল উদ্দিন আপেল ভাই । ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়ায় রবীন্দ্র ভারতী থেকে স্নাতকোত্তর করেছেন নব্বইয়ের দশকে।  দীর্ঘদিন থেকে ঠাকুরগাঁও অঞ্চলের  ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নিয়ে কাজ করছেন তিনি। আড্ডার বিষয়বস্তুও ছিল  ওঁরাও সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা আর লোকজ ঐতিহ্য নিয়ে। এক পর্যায়ে  আপেল ভাই বললেন, চল তোমাকে একটি সুন্দর জায়গা দেখিয়ে নিয়ে আসি। একটু অবাক হলাম ঠাকুরগাঁওয়ের সবকিছুই তো দেখা । তাহলে কোথায় নিয়ে যেতে চান তিনি?

শহর থেকে প্রায় কিলো দুই দুরে ছায়া ঘেরা এক শান্ত বাড়ির দরজায় এসে দাঁড়ালাম । দরজা  খুলে দিলেন মধ্যবয়সি একজন । দু হাত এক করে নমস্কার জানালেন বাড়িও দারোয়ান কাম পিয়ন অনয় বর্মণ।

একটু সামনে গিয়ে ডানে-বামে তাকিয়ে বুঝলাম এটা কোন বাড়ি নয় , একটা ক্যাম্পাস । আপেল ভাই আমার দিকে তাকিয়ে মিট মিট করে হাসছেন। ঘাড়ে হাত রেখে বললেন চল। কাঠের তৈরি টিনশেড একটি চৌচালা ঘর। বারান্দায়  গাছের শুকনো ডাল পালা দিয়ে  বেড়া দেওয়া, দরজায় লেখা লোকায়ণ।

 লোকায়ণ, একটি ব্যতিক্রমী জাদুঘর ।  আপেল ভাই এই জাদুঘরের তত্বাবধায়ক । তাকে সাজিয়ে রাখা  প্রতিটি সংগ্রহের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে চলেছেন চলছেন তিনি। লোকজ ঐতিহ্যের অনেক উপকরণ  এখানে সংরক্ষিত। বিশেষ করে কৃষিজ  দেশীয় সকল যন্ত্রপাতি এখানে উপস্থিত । যেমন-  লাঙল-জোয়াল, মই, ফলা, নিড়ানি, দা, কাস্তে, খুন্তি, মাথাল,   ইঁদুর মারার  ফাঁদ,গরুর মুখে দেওয়া আটুলি , যাতা, ঢেঁকি, ছাম-গাহিন, কোদাল, হাতুড়ি, শাবল ছাড়াও বাদ্য যন্ত্রের তালিকায় দোতারা,মাদল, বাঁশি, সানাই,  একতারা, ঢাক, ঢোল রয়েছে।

জিজ্ঞেস করে জানলাম এই জাদুঘরের উদ্যোক্তা শহিদুজ্জামান  স্থানীয় মানুষ জনের কাছ থেকে এসব সংগ্রহ করে এনেছেন। আয়োজন দেখে অনেকেই সেচ্ছায় অনেক কিছুই দিয়ে গেছেন । চোখ আটকে গেল পুরনো দলিলের দিকে। ব্রিটিশ আমলের বেশ কিছু হাতে লেখা অস্পষ্ট দলিল, চিঠিপত্র , পুঁথি ও জমিদারের খাজনা আদায়ের রশিদও সযতনে রাখা হয়েছে ।

তাকের একেকটি খোপে সাজিয়ে রাখা হয়েছে মাছ ধরার জাল, টোঁটা, পলো, চাঁই, কামারের হাপর, হুক্কা, বসার পিড়ি, বাঁশের মোড়া, কয়েক রকমের কেরোসিনের কুপি, তীর-ধনুক, তরবারি, ঢাল, মাটির বাসন-কোসন, হাঁসুলি, হাতের চুড়ি, বালা, শত বছর আগের গুড়ের হাড়িসহ যাত্রাপালায়  ব্যবহৃত  পোশাক পর্যন্ত। বাদ যায়নি পুরনো ক্যামেরা,  টাইপরাইটার, রেডিও, ক্যাসেট প্লেয়ারও।

জাদুঘর থেকে বেরিয়ে এবার আমরা প্রবেশ করলাম  ঔষধি গাছের বাগানে ।

সবমিলিয়ে এখানে ১২০ প্রজাতির ঔষধি ও ৭০ প্রকারের ফলের গাছ রয়েছে। পরিচিত অনেক উদ্ভিদের পাশাপাশি অপরিচিত অনেক যেমন  শালপনি, দাদ মর্দন, বেগুন হুরহুরি, মনসা গাছ দেখালেন  আপেল ভাই। আমার বিস্ময়ের সীমা নেই।

শুধু  সংগ্রহই নয়  শাশ্বত বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এখানে আয়োজন করা  হয়  নানান কর্মসূচী । বিভিন্ন উপলক্ষ্যে স্থানীয় লোকনাট্য ধামের গান, আদিবাসী নাচ-গান, কবিগান, গীত, বর্ষামঙ্গল, নবান্ন , শীতে পিঠা উৎসব তো নিয়মিত ব্যাপার ।

এখানে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন অনেকেই । জাদুঘরের পরিদর্শন বই ঘেটে দেশ বিদেশের অনেক বরেণ্য ব্যক্তিদের  বক্তব্যে লোকায়ণ সম্পর্কে অনেক ইতিবাচক মন্তব্য পাওয়া গেল । জাদুঘরে আরও অনেক দর্শনার্থী এসে পড়েছেন । আপেল ভাইও ব্যস্ত হয়ে পড়লেন । আমিও বিস্ময় নিয়ে বের হয়ে এলাম । আরও আগেই  এই মুল্যবান সংগ্রহশালা কেন দেখতে আসিনি ভেবে বেশ  আফসোস লাগছে ।

ঢাকা থেকে যোগাযোগ

ঢাকার শ্যামলী থেকে হানিফ, নাবিল, শ্যামলী  ছাড়াও আরও বেশ কয়টি পরিবহনের এসি নন এসি বাস ঠাকুরগাঁওয়ের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়।   প্রায় ৯/১০ ঘন্টার ভ্রমণ । ঠাকুরগাঁও শহর থেকে রিকশা বা ব্যাটারি চালিত অটোরিকশায় ডায়াবেটিস হাসপাতালের পাশ দিয়ে ২০ মিনিটে লোকায়ণে পৌঁছে যাবেন।

/এমআর/

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ