behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

শিশুদের পৃথিবী ‘শৈশব’

নওরিন আক্তার১৭:৫০, জানুয়ারি ১৪, ২০১৬

শিশুদের পৃথিবী শৈশব

কুণ্ডলী পাকানো মেঘ, ঝরঝর বৃষ্টি ও গাছের ডালে বসে থাকা বিভিন্ন পাখপাখালি দেখতে দেখতেই হঠাৎ শিশুদের কলরব ও হুটোপুটির শব্দ! শব্দের উৎস খুঁজতে খুঁজতে চোখ আটকে গেল দেয়াল জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শিশুদের হাতের রঙিন ছাপে। ভাবছেন এ কোন দুনিয়া? এটি শিশুদের আপন ভুবন ‘শৈশব।’ শিশুরা এখানে খেলে নিজেদের ইচ্ছামতো। আঁকে যেমন খুশি তেমন।  

ডে কেয়ার সেন্টার ‘শৈশব’ সবে শুরু করেছে তাদের কার্যক্রম। শিশুদের ওপর ভালোবাসা থেকেই স্বত্বাধিকারী নজরুল ইসলামের এ উদ্যোগ। অবশ্য শৈশবকে গতানুগতিক ডে কেয়ারের সঙ্গে তুলনা করতে নারাজ তিনি। কেবল কর্মজীবী বাবা-মায়ের সন্তান নয়, যে বাবা মা সবসময় ঘরে থাকেন তাদের শিশুরাও যেন ‘শৈশব’-এ থাকে, এমনটা ইচ্ছা নজরুল ইসলামের। সেটা কেন? ‘কারণ এখন ছোট ফ্যামিলিই বেশি। বাবা-মা হয় চাকরি করেন নাহলে ব্যস্ত থাকেন বিভিন্ন কাজে। শিশুকে খাওয়ানো বা যত্ন নেওয়া ছাড়া তাদের জন্য আমাদের সময় কতটুকু? ফলে এখনকার শিশুরা বেড়ে উঠছে একাকীত্ব নিয়ে। একা একা বেড়ে ওঠার ফলে সহযোগিতা করার মানসিকতা কিংবা সহমর্মিতার মতো মানবিক গুণাবলী তারা শিখছে না। এটি তাদের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত খারাপ। শিশুরা আসলে কী চায়? কেবল আপনার একটু সময় আর মনোযোগ- আর কিচ্ছু না। শৈশবে এটাই পাচ্ছে তারা’- বলেন তিনি।

যেমন খুশি তেমন আঁকার দেয়াল

কথা বলতে বলতেই ১৪ মাসের ছোট্ট সৃজিতা হাসিমুখে এগিয়ে এলো। সঙ্গে সঙ্গে এলো ঈপ্সিতা, নিধি, অরিত্র। তাদের দুষ্টুমিতে মুখরিত হয়ে গেল পরিবেশ। শিশুদের দেখাশোনা করছেন লীনা। তিনি জানালেন, সৃজিতা বাসায় ভাত খেতো না বলে অভিযোগ করতেন ওর বাবা মা। অনেক চেষ্টা করেও যাকে ভাত খাওয়ানো যায়নি সে এখন নিয়মিত সবজি দিয়ে ভাত খাচ্ছে! তাছাড়া অনেক শিশু এখানে থাকতে এতোই পছন্দ করে যে শুক্রবার দিনও ব্যাগ গুছিয়ে চলে আসতে চায়! এগুলোই শৈশব-এর প্রাপ্তি।   

শিশুদের সার্বক্ষণিক দেখাশোনা করার জন্য এখানে রয়েছেন বেশ কয়েকজন তত্ত্বাবধায়ক। শিশুদের খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানোসহ সব ধরনের যত্নআত্তি করেন তারা। এছাড়া শিশু খেলতে খেলতে হঠাৎ আঘাত পেলে কী করতে হবে সেসব বিষয়েও ট্রেনিংপ্রাপ্ত সবাই। স্বাস্থ্যকর পরিবেশে এখানেই রান্না করা হয় শিশুদের খাবার। সকাল, দুপুর ও বিকালে শিশুদের জন্য পরিবেশন করা হয় বিভিন্ন পুষ্টিকর খাবার। খাদ্য তালিকায় রয়েছে হাতে তৈরি রুটি, পরাটা, হালুয়া, ডিম, দুধ, খিচুড়ি, ভাত, ডাল, সবজি, ফল, পোলাও, মুরগি, ফ্রায়েড রাইস, নুডলস, বিস্কুট ইত্যাদি।

চলছে খেলাধুলা

নজরুল ইসলাম জানান, শৈশব শুরু করার আগে বিভিন্ন ডে কেয়ার সেন্টারে নিজেই গিয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন তিনি। তাদের কর্মপদ্ধতি, অভিজ্ঞতাসহ বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জেনেছেন। তারপর শুরু করেছেন শৈশব। জানান, বেশিরভাগ ডে কেয়ার সেন্টারই শিশুদের খাবারের ব্যবস্থা রাখে না। কারণ মাছ বাছতে গিয়ে যদি রয়ে যায় কাটা, সেই দায়িত্ব কে নেবে? তবে শৈশব-এর উদ্দেশ্যই হচ্ছে বাবা মাকে ঝামেলা থেকে মুক্তি দিয়ে শিশুর সবটুকু দায়িত্ব নিয়ে নেওয়া। একজন মাকে যদি সকালে অফিসে যাওয়ার আগে বিভিন্ন কাজকর্ম সামলানোর পাশাপাশি শিশুর তিনবেলার খাবারও তৈরি করতে হয়, তবে আর শৈশব কীভাবে মাকে নিশ্চিন্ত থাকার আশ্বাস দেয়? খাবার থেকে শুরু করে দিনভর শিশুর যাবতীয় নিরাপত্তা প্রদানের দায়িত্ব তাই নিচ্ছে শৈশব। এখানে প্রি-স্কুলিংও করানো হয়। অনেক শিশু স্কুল থেকে ফিরে হোমওয়ার্ক করে এখানে। সারাদিনের কর্মকাণ্ড শেষ করে তবেই বাসায় পাঠানো হয় শিশুকে। এতে দিনভর কাজ করে ক্লান্ত বাবা-মাকে যেন শিশুর পড়াশোনা নিয়ে চিন্তা করতে হয় না, আর শিশুও সারাদিন পর বাবা-মায়ের সঙ্গে কাটাতে পারে আনন্দময় সময়।

শিশুদের ঘুমানোর স্থান

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন 

৬ মাস থেকে শুরু করে ৭ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুরা শৈশবের সদস্য হতে পারবে। এখানে রয়েছে তিন ধরনের প্যাকেজ। প্রথমটি সকাল থেকে শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত। দ্বিতীয়টি দুপুরের পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। সাধারণত স্কুল পড়ুয়া শিশুরা আসে এ সময়। তৃতীয় প্যাকেজটি হচ্ছে কয়েক ঘণ্টার। অনেক সময় কোন দরকারে বাবা-মা বাইরে গেলে যদি শিশুকে কোথাও রাখার ব্যবস্থা করতে না পারেন, তবে শৈশবের তৃতীয় প্যাকেজটি নিতে পারেন।

যেমন খুশি তেমন আঁকো

নজরুল ইসলাম মনে করেন, বেশিরভাগ শিশুর ওপর সৃজনশীল কাজগুলো চাপিয়ে দেন বাবা-মা। গান অথবা নাচ- শিশু কোনটা শিখবে সে সিদ্ধান্ত নেন তারাই। ফলে নাচ জানা একজন শিশু হয়তো জানতেও পারে না যে তার প্রতিভা ছিলো গান গাওয়ার! ‘শৈশব’-এর শিশুরা নিজেরাই নিজেদের বিভিন্ন বিষয়ে যেন সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সেভাবেই গড়ে তোলা হবে তাদের। হারমোনিয়াম, ঘুঙুর- সবকিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এখানে। দুটি দেয়াল কেবল শিশুদের আঁকাআঁকি করার জন্যই বরাদ্ধ। ইচ্ছা হলেই দলবেঁধে গান গাও, কিংবা নাচো! কিংবা রঙ পেন্সিল নিয়ে দেয়ালে আঁকতে শুরু করো! একসময় শিশু নিজেই বুঝে যাবে তার আগ্রহ আসলে কোনদিকে। শৈশবে শিশুদের জন্য রয়েছে বিভিন্ন ওয়ার্কশপও। আগামীকাল বনানীর চেয়ারম্যানবাড়ির মাঠে শৈশবের প্রথম কর্মশালায় শিশুরা ঘুড়ি বানাবে এবং ওড়াবে। ২১ ফেব্রুয়ারিতে তৈরি করবে শহীদ মিনার। নাচ, গান, ছবি আঁকার কর্মশালার পাশাপাশি খালি হাতে আত্নরক্ষা বিষয়েও খুব শীঘ্রই শেখানো হবে শৈশবে।  

শিশুদের পৃথিবী শৈশব ১
এখনও ডে কেয়ার নিয়ে মানুষের মধ্যে রয়েছে অনেক ভুল ধারণা। পরিবারের নানী-দাদীরা তো বটেই, অনেক বাবা-মাও মনে করে ডে কেয়ারে দেওয়া মানেই শিশুকে অনিরাপদ কোন পরিবেশে দিয়ে দেওয়া। এই ধারনাটি বদলে যাওয়া খুব জরুরি বলে মনে করেন নজরুল। ‘আমরা যদি শিশুকে স্কুলে দিয়ে নিশ্চিন্তে থাকতে পারি, তাহলে ডে কেয়ারে কেন নয়?’- প্রশ্ন করেন তিনি।   

শৈশব-এর স্বত্বাধিকারী নজরুল ইসলাম

‘আমাদের শিশুরা একটি বেড়াঘেরা পরিবেশে বেড়ে উঠতে উঠতে হঠাৎ করে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। বেড়ার বাইরের দুনিয়াকে সে চেনে না। এভাবে মানসিকভাবে পঙ্গু অবস্থায় সে বেড়ে ওঠে। কিন্তু একটি প্রজন্ম এভাবে একা একা বড় হতে পারে না। শৈশব একটি সুস্থ প্রজন্ম তৈরি করতে চায়। শিশুকে একটি আনন্দময় শৈশব উপহার দেওয়ার লক্ষ্যেই পথচলা শুরু করেছে শৈশব’- বলেন নজরুল ইসলাম। বিশাল উঠানওয়ালা বাড়িতে শিশুরা দুষ্টুমিতে মেতে উঠবে নিজেদের মতো, একে অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করবে অনুভূতি এবং সারাদেশে ছড়িয়ে পড়বে শৈশবের এমন হাজারও শাখা- শৈশব দেখে এমন স্বপ্ন।

 শিশুরা এখানে খেলে ইচ্ছামতো

 

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন 

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ