behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

রেমাক্রির পথ ধরে নাফাখুমে…

ফারুখ আহমেদ১৬:১৮, ফেব্রুয়ারি ০৪, ২০১৬

নাফাখুমের পথে

আজকের পথ চড়াই। রেমাক্রিখাল বা ঝিরি পার হয়ে ঢালু আবার কখনও উঁচুনিচু পায়ে চলা পথ, পুরোটাই হালকা পাহাড়ি পথ। যে পথ অনেকগুলো গ্রামের পাশ দিয়ে এগিয়ে গেছে, আমরা পা বাড়াই সে পথে। সবুজের সমুদ্রে হাবুডুবু খেতে খেতে এগিয়ে চলি। চলতি পথে দলে দলে পাহাড়ি মেয়েদের দেখা মেলে। এক ধরনের ছোট মাছ ধরে তারা ঘরে ফিরছে। দেখতে চাইলে মাছের ডালা মেলে ধরে। কেমন কিলবিল করা ছোট্ট মাছ!  পাহাড়ি মেয়েরা নিজে নিজেই বলে ‘এসব আপনারা খাবেন না।’ এভাবেই চলতি পথে মাঝে মাঝে দেখা হয় খেলায় মত্ত শিশু দলের সঙ্গে। অনেকটা অবাক করেই নমস্কার বলে কেউ, কেউবা টাটা বাইবাই। আমার এগিয়ে চলি। পাশ দিয়ে বনের আড়ালে পাহাড় স্পর্শ করা রেমাক্রি খালও এগিয়ে চলে আমাদের সঙ্গে।

নাফাখুমের পথে প্রথমে ট্রেন, তারপর মাইক্রোবাসের পর পাবলিক বাস এবং শেষে ট্রলারে চেপে দুপুর ১টায় আমরা পাঁচজনের দল রেমাক্রি এসে পৌঁছাই। তারপর ব্যাকপ্যাক কোনও রকমে বিশ্রামাগারের বিশাল ঘরে ধুম করে ফেলে রেখে শরীফকে নিয়ে বের হই নাফাখুমের উদ্দেশ্যে। বাকি তিনজন আগেই বলে রেখেছে তারা সেই ভরদুপুরে দূর্গম পথ ধরে হাঁটবেনা। তবে ফারাবী হাফিজের কথা আলাদা, ঘাড় ব্যথার জন্য সে যাত্রা বিরতি দিতে বাধ্য হয়। শেষমেষ রেমাক্রি থেকে যায় ফারাবী হাফিজ, বোরহানূল হক সম্রাট আর প্লাবন রহমান। আমরা দুজন এগিয়ে চলি। রেমাক্রি মুখ থেকে দুপুর দেড়টায় যাত্রা শুরু করে বিশ মিনিট পর প্রথম পা রাখি পেনেদং পাড়ায়। পেটে কিছু জমা করা দরকার। যেহেতু আমাদের হাতে সময় কম সে জন্য আমরা পেনেদং পাড়ায় যাত্রা বিরতি দিয়ে সময় নষ্ট করতে রাজি ছিলাম না। খুব দ্রুত কিছু খাবার কিনে দ্রুত এগিয়ে চলি। যাত্রা পথে উচ্চতার কোনও ক্লান্তি ছিল না। সে অর্থে কোনও চড়াই ভাঙতে হচ্ছিলো না। স্বাচ্ছন্দ্যে এগিয়ে চলি কখনও জঙ্গলের পাশ দিয়ে, কখনও রেমাক্রি খালের পাথর বিছানো জলপথ ধরে, কখনওবা সবুজ ঘাসের ঢাল ধরে।

রেমাক্রির মুখ

কাঠ কাটতে আসা লোকজনের সঙ্গে দেখা হয়। তবে এরা কেউই স্থানীয় নয়। বেশীরভাগ ছিল সাতকানিয়ার বাসিন্দা, জীবিকার টানে এখানে আসা। শীতকাল বিধায় প্রচুর লোক ঘুরতে বের হয়েছে। নাফাখুমের পথে চলতে তেমন বেশ কয়েকটা দলের সঙ্গেও দেখা হয়ে যায়, তারা ফিরে আসছে আর আমরা যাচ্ছি। এভাবেই আমরা হেটম্যান পাড়া হয়ে মংসং পাড়া পেছনে ফেলে যতই এগিয়ে যাচ্ছিলাম ততই নিরবতা সঙ্গী হচ্ছিল। এবার লাঠি গেঁথে গেঁথে পথ চলা। বেশ কয়েকবার পাহাড়ের খাঁজ থেকে পা হড়কে গিয়ে রেমাক্রি খালের জলে পড়ার হাত থেকে বাঁচলাম। এভাবে আমাদের চলার ঠিক তিন ঘন্টা পর জলের তীব্র গর্জন কানে এল। আরও কিছুটা পথ এগিয়ে দূর থেকেই দেখতে পেলাম নাফাখুম জলপ্রপাতের দুরন্ত জলধারা। আরও কিছুটা কাছে যেতেই চোখ সরতে চাইলো না। নাফাখুম জলপ্রপাতের কলতানে দিশা হারিয়ে শরীফের পাথরের ওপর দিয়ে সে কী দৌঁড়! তারপর তো আমরা ফেরার কথাই ভুলে যাই। দু’চোখ ভরে শুধু জলপ্রপাতের জলধারা দেখে চলি, আর চলে আনন্দে লাফালাফি।

নাফাখুম

এভাবে একসময় প্রকৃতির আলোতে ঘাটতি পড়লে বুঝতে পারি এবার ফেরা দরকার। ইতিমধ্যে শীত খুব জেঁকে বসেছে। গায়ে শীতের কাঁপুনি নিয়ে নাফাখুমকে বিদায় বলে ফিরতি পথ ধরি। পথেই সন্ধ্যা নামবে বুঝতে পারি। সে জন্য ফেরার সময় আরাম করে ফেরার আর উপায় থাকলো না। আমরা সেই শুরুর মতই দ্রুত এগিয়ে যাই। কেননা রাত গভীর হলে রেমাক্রির জঙ্গলে আমাদের মত অচেনাদের পথ চেনা কঠিন হয়ে যাবে। পথ হারালে চেনানোর কেউ থাকবে না, মোবাইল যোগাযোগও নেই যে সহযোগিতা নেবো। সুতরাং ঝোপঝাড় ভেদ করে মোচড়ানো ডালপালা, পায়ের তলা আর উপর নিচ জল জঙ্গল দেখে দেখে রেমাক্রির পথে চলি।

নাফাখুম

ঠিক দুই ঘন্টা পর সবুজ পাহাড়ের গা ফুঁড়ে আকাশে চাঁদের দেখা মেলে। এবার চোখ বুজেও পথ চলা যায়। তবু আর পা চলে না, মনে হয় এমন সৌন্দর্যে হারিয়ে গেলে মন্দ কি! শরীফ আবেগ তাড়িত হয়ে বলে ফেলে, ভাই আমরা আর না ফিরি! তবু ফিরতে হয়। পথের বাকে বাকে সবুজের ফাঁকে ফাঁকে চাঁদনী রাতের অপরূপ সৌন্দর্য দেখে দেখে এগিয়ে চলি। সে রাতে দু’চোখে ভর করা চাঁদের প্রতিবিম্ব স্বর্গীয় না বলে উপায় ছিল না! আবার কোনও চাঁদনী রাতে তাবু খাঁটিয়ে এখানে থাকবো পণ করে আমরা আরও দ্রুত পা চালাই। পেনেদং পাড়া আসতেই অনেকগুলো টর্চ এগিয়ে আসতে দেখে চিৎকার করে জানতে চাই কে যায়? ফারাবী তখন চিৎকার করে বলে, ভাই বাঁচালেন, আপনাদেরই খুঁজতে বের হয়েছি আমরা!

প্রয়োজনীয় তথ্য

ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে বান্দরবান চলে যান।  বান্দরবান থেকে বাসে বা দল ভারি হলে চান্দের গাড়িতে থানচি চলে যেতে পারেন। বাস ভাড়া জনপ্রতি ২০০ টাকা। চান্দের গাড়ি বা জীপ ভাড়া রিজার্ভ ৪০০০ টাকা। থানচিতে রাত্রিযাপন করে অথবা সেদিনই ট্রলারে চেপে তিন্দু হয়ে চলে যান রেমাক্রি। রেমাক্রি পৌঁছে আমাদের মতো তাড়াহুড়া না করে পরদিন সকাল সকাল বের হয়ে চলে যান নাফাখুম। পুরো বেলা সেখানে কাটিয়ে দুপুরের পর ফিরতি পথ ধরুন। নাফাখুমের পথে পর্যাপ্ত পানি আর শুকনা খাবার অবশ্যই সঙ্গে রাখবেন। পরিবেশ নষ্ট হওয়ার মত তেমন কিছু করবেন না এবং অপচনশীল কিছু বনে ফেলবেন না।

 

ছবি: লেখক
/এনএ/

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ