behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

পাথর বনের গল্প

ফারুখ আহমেদ১৫:০৪, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০১৬

পাথর বনের গল্প

পরিষ্কার নীলাকাশে শ্বেতশুভ্র মেঘ দেখে শরৎকালকেই মনে পড়লো অথচ চলছে শীত মৌসুমের শেষ সময়টুকু। অনেক রাত করে ঘুমাতে গেলেও ঘুম আর আসলো না। সকাল সকাল বিছানা ছেড়ে বের হয়ে দেখি কুয়াশা ঢাকা প্রকৃতি। থানচি ব্রীজের কাছে গিয়ে এক হাত দূরত্বের কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না, অথচ সেদিন সকাল দশটার পর একেবারে ঝকঝকে আকাশ! অবশ্য তেমন ঝকঝকে আকাশ আমাদের কারোরই কাম্য ছিল না। ভাবছিলাম পাবো মেঘে ঢাকা আকাশ। কিন্তু চাইলে কি আর সব পাওয়া যায়! তাছাড়া শীত মৌসুম বলে কথা। কি আর করা! আমরা এই অতৃপ্তিটুকু নিয়েই পথে নামলাম। আজকের গন্তব্য তিন্দু বড় পাথর হয়ে রেমাক্রি। পায়ে হেঁটে বা গাড়িতে নয়, আমরা চলেছি পাহাড়ের পায়ের কাছে দিয়ে বয়ে চলা রেমাক্রি খাল দিয়ে।

পাথর বনের গল্প

পাথর বনের গল্প

দু'পাশে বিস্তৃত সবুজের মধ্য দিয়ে বয়ে চলা ক্ষীণকায় এ খালটি শঙ্খ নদীতে গিয়ে মিশেছে। সবুজের বাঁক ধরে সে পাথুরে খাল ধরে আমরা সামনে এগিয়ে চলি। চারপাশের মনোরম দৃশ্য মন কেড়ে নেয়। দৃশ্যগুলো যত না লেন্সে ধরা দিচ্ছে তারচেয়ে বেশি মনে গেঁথে যাচ্ছে। ইতস্তত কিছু ঘরবাড়ি ছড়ানো ছিটানো। একলা একটি বাড়ি পাহাড়ের ভাঁজে দেখে মনের আকুলিবিকুলি টের পেলাম। আহা এখানে রাত্রিযাপন কতই না মধুর হত! ভাবতে ভাবতেই দেখি এক প্রৌঢ়া দুইটা ছাগল নিয়ে রেমাক্রি খালে নেমে আসছেন। অবশ্য একটু পর আমাদেরও রেমাক্রি খালে নামতে হলো। খালের এ যায়গাটায় পানি কম এবং পাথর ভরা চড়াইপথ। সবাই মিলে চিৎকার দিয়ে উঠলাম- মারো ঠেলা হেইও! আমাদের সে চিৎকার পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এল। পুরো এলাকাই ছিমছাম শান্ত। উপজাতি মানুষদের দৈনন্দিন জীবনের টুকরো ছবি চোখে পড়ছে একটু পর পর। তিন নারীকে দেখলাম জুমের জমি মেরামতে ব্যস্ত। কত নাম না জানা পাহাড়ি ফুল পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে। শীতের দিনে কাচা রোদ দারুণ লাগছিল। এভাবেই চলতে চলতে সকাল ১১টা নাগাদ তিন্দু এসে যাত্রা বিরতি নিলাম।

পাথর বনের গল্প

পাথর বনের গল্প

 ছোট্ট যায়গা তিন্দু। কোনও কর্মব্যস্ততা চোখে পড়লো না। অলস জীবনযাপন। সবাই নিজেদের খেয়ালে, আমাদের কেউই খেয়াল করলো না যেন। খেয়াঘাটে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ট্রলার দাঁড়িয়ে আর চারজন বিজিবির সদস্য নিজেদের ট্রলারের অপেক্ষায়। আমরা ধীর পায়ে তিন্দু বাজারে চলে যাই। নির্ঝঞ্ঝাট, নিরিবিলি তিন্দু ভালো লাগার মাত্রায় যোগ করলো নতুন পালক। বিশ মিনিট তিন্দু কাটিয়ে আবার যাত্রা শুরু করলাম আমরা। এত দ্রুততার কারণ, দেড়টার মধ্যে রেমাক্রি পৌঁছতে হবে। নাহলে আজ আর নাফাখুম যাওয়া হবে না। এবার অল্প কিছু পথ ট্রলারে যেতেই ট্রলার চালকের কথা মতো ট্রলার ছেড়ে আবার পাহাড়ের পাদদেশ ও পাথর-নুড়ির ওপর দিয়ে চলতে হলো। বিষয়টা সবার জন্য অসাধারণ অভিজ্ঞতা ছিল। ক্যামেরায় ক্লিক চলছিল, ভিডিও হচ্ছিল সঙ্গে আনন্দ উল্লাস তো ছিলই। তিন্দু যতই পেছনে যাচ্ছিলো ততই সৌন্দর্য আরও বেশি ঠিকরে বের হচ্ছিল যেন। আমরা উপরে উঠছি কিন্তু চড়াই মনেই হচ্ছিল না। অবিন্যস্ত পাথর বিছানো পথে কত যে পাথরের ছড়াছড়ি তা ভাষায় বলে বোঝানোর নয়। বোরহানুল হক সম্রাট হাঁটতে হাঁটতেই বললেন পরিশ্রম স্বার্থক। প্লাবন আর শরীফের সে কী উচ্ছ্বাস! অথচ তখনও আমরা জানি না সামনে আমাদের জন্য কী এক অপার বিস্ময় অপেক্ষা করে আছে!

পাথর বনের গল্প

পাথর বনের গল্প

পাথর বনের গল্প

এভাবে অনেকটা পথ চলার পর আবার ট্রলারের যাত্রী হই। আমরা এখন চলছি রেমাক্রি খালের ছায়াঘেরা পথে। আচমকা সামনে বড় এক পাথরে দেখে চমকে উঠলাম। পাথরের গায়ে রোদ পরে ঝকমক করছিল। সে দৃশ্যে আমাদের চোখও কেমন চকচকিয়ে উঠে। ফারাবী আমার কাঁধ আঁকড়ে বলেন, ভাই দেখেন পাথরটি কেমন কাঁপছে। আমি তাকিয়ে দেখি পাথরের প্রতিচ্ছবি এখানকার ঝিরি বা খালের জলে অপূর্ব দৃশ্য তৈরি করেছে। এমন রঙিন প্রতিবিম্ব দেখে দেখে আরও সামনে এগিয়েই তো চোখ ছানাবড়া! সামনে বিশাল বিশাল সব পাথর। এবার প্লাবন গলা আসমানে তুলে বলল পাথরের বনরে ভাই! সম্রাট চিৎকার করে বলল, ‘উফ, পুরোটাই স্বর্গীয়!’

পাথর বনের গল্প

পাথর বনের গল্প

পাথর বনের গল্প

স্বর্গীয়ই বটে। ছোট, মাঝারি, বিশালাকৃতি সব মিলিয়ে বিশাল এক পাথর বন। মনে হলো যেন পাথরকুলের মহাসম্মেলন চলছে। আমরা সে সম্মেলনে কিছু সময়ের মেহমান মাত্র। মুগ্ধতার ফুলঝুরি ছোটে সঙ্গীদের মুখ থেকে। অদ্ভুত এক শিহরণ নিজের ভেতরও অনুভব করি। ছবি তোলা চলতে থাকে। পুরো দেড় ঘন্টা আমরা একইভাবে ছিলাম। যেন কোনও নির্জন গ্রহে শুধুমাত্র আমরা ক’জন। ট্রলার চালক একটা পাথর ছুঁয়ে বলেন, এটা হল রাজা পাথর। ফারাবী রাজা পাথরে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে চাইলে চালক বাধা দিয়ে বলেন, পাথরে পা রাখলে আপনার অমঙ্গল হবে! আমরা তার বিশ্বাসেই অটল থাকি। একটা পাথরেও চড়ে না বসে খালি ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখি। তারপর কী এক দমকা বাতাসে এগিয়ে চলি রেমাক্রির দিকে!

পাথর বনের গল্প

প্রয়োজনীয় তথ্য

পাথর বন বা পাথরের মহা সম্মেলন দেখতে হলে আপনাকে যেতে হবে বান্দরবানের থানচি উপজেলার তিন্দু ইউনিয়নে। ঢাকা থেকে বাসে বান্দরবান চলে যান। তারপর থানচি থেকে রেমাক্রি খাল বেয়ে উপরের দিকে ট্রলার বেয়ে উঠতে উঠতে ঠিক দুই ঘন্টা পর তিন্দু পেরিয়ে একটু সামনে গেলেই পেয়ে যাবেন অদ্ভুত সে বড় পাথর এলাকা। তারপর শুধু মনে হবে আপনি রয়েছেন স্বপ্নের ভেতর। ঘোর লাগা যে স্বপ্নের দৃশ্য চোখ থেকে কোনও দিন মুছবে না!

পাথর বনের গল্প

ছবি: লেখক



/এনএ/

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ