Vision  ad on bangla Tribune

‘হারং হুরং’ সুড়ঙ্গে

সামিউল্যাহ সমরা১৩:৪২, এপ্রিল ০২, ২০১৬

‘হারং হুরং’ সুড়ঙ্গে

 

বিকেল গড়িয়ে গেছে। আমরা বের হলাম মালনিছড়া চা বাগানে যাব বলে। উদ্দেশ্য সন্ধ্যার পর চা বাগানে ঘোরাঘুরি। দিনের আলোয়  চা বাগানের সৌন্দর্য তো অনেক দেখা হলো, এবার রাতের চা বাগান কেমন দেখায় সেটাই দেখব। দল বেশ ভারি। দেবাশীষ দেবু, প্রত্যুষ তালুকদার, বিনয় ভদ্র, রাজীব রাসেল, গৌতম, দিদার, সুমি ও শিমু  আগে থেকেই তৈরি ছিল। শেষ মুহূর্তে যোগ দিলেন অমিত আর বাতিন ভাই। এই মালনিছড়া চা বাগান ১৮৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। উপমহাদেশের বাণিজ্যিক চা উৎপাদনের শুরুটা এ বাগান থেকেই। আমরা অনেকবার এসেছি এই বাগানে আর আকারে আকৃতিতেও  বিশাল বলে এই অ্যাডভেঞ্চারের জন্য মালনিছড়াকেই আমরা বেছে নিয়েছি ।  

সিলেট শহরের খুব কাছেই মালনিছড়া। পূর্ব নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা আম্বরখানা বড়বাজারে একত্রিত হলাম। তিনটি মোটরবাইক আর একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চেপে বিমানবন্দর সড়ক ধরে এগিয়ে চলেছি। লাক্কাতুরা চা বাগানকে  পাশ কাটিয়ে মিনিট দশেকের মধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম মালনিছড়া চা বাগানের কারখানার মূল ফটকের সামনে। আমরা একটু দাঁড়ালাম কিছু শুকনো খাবার আর পানি নেব বলে । হুট করেই বিনয় ভদ্র নতুন একটি প্রস্তাব দিয়ে বসল। হারং হুরং নামে একটি প্রাচীন সুড়ঙ্গ আছে এই বাগানের গহীনে। সেখানে যাওয়া যায়। এ জীবনে সুড়ঙ্গ দেখিনি। আমরা ঘাড় নেয়ে সায় দিলাম। বাইরে সূর্য অস্তগামী হলেও চা বাগানে ইতোমধ্যে আঁধার নেমে এসেছে। হারং হুরং-এর পথ আমাদের চেনা নেই কারও। সন্ধ্যা বেলায়  টিলাময় চা বাগানের ভেতরে অচেনা সুড়ঙ্গ খুঁজে বের করা ভীষণ মুশকিল। প্রায় ৫ কিলোমিটার উঁচুনিচু পথ আমরা পেরিয়ে এলাম। হিলুয়াছড়া অতিক্রম করে এলাম।  রাতের শুরুতেই গভীর রাতের মতো আবহ। একেবারে শুনশান চারদিক। পথের মাঝে দু’একজন চা শ্রমিক ছাড়া আর কোন জনমানব নেই। এখন চা শ্রমিকরাই একমাত্র ভরসা । বাতিন ভাইয়ের বাইকের পেছনে সুজন নামের একজন চা শ্রমিককে নিয়ে নিলাম আমরা। কিছু দূর এগিয়ে সুজন বলল সামনের পথটুকু হেঁটে যেতে হবে!

চা বাগান আমরা না হয় হেটেই যাব। কিন্তু এই জঙ্গলে বাইকগুলো কোথায় রেখে যাব? সুজনই ব্যবস্থা করল। ওর পরিচিত আরেকজন শ্রমিককে আমরা ফেরা পর্যন্ত বাইক পাহারার দায়িত্ব দিল। সিএনজি ড্রাইভার কিছুতেই থাকবে না। অনেক অনুরোধে ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়ার আশ্বাসে সে রাজি হলো। বেশ শীতল বাতাস। অন্ধকারে মোবাইলের আলো আর ছোট টর্চ লাইট আমাদের  সঙ্গী। বিশ মিনিট হাঁটার পর সুজনকে বেশ দ্বিধাগ্রস্ত মনে হলো। সে পথ হারিয়েছে! সুড়ঙ্গ  আর সেদিন দেখা সম্ভব হলো না। চা বাগানে  ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছেও উবে গেল । কী আর করা! সর্বসম্মতিক্রমে  সিদ্ধান্ত হল আগামীকাল সকালে আবার হারং হুরং অভিযান শুরু হবে । সুজনের সহযোগিতায় পথ হাতরেই  আমাদের ফিরতে হলো।  
‘হারং হুরং’ সুড়ঙ্গপরদিন সকালে আরও চারজন আমাদের সাথে যুক্ত হলেন। পিয়েল, শুভ, মাসুক আর বাবর। আজও সুজন আমাদের সঙ্গে। পথ চিনতে তেমন কোন অসুবিধা হলো না।  হিলুয়াছড়ার ১৪ নম্বর সেকশনে এই সুড়ঙ্গ। সিলেট অঞ্চলে জনশ্রুতি আছে ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে হযরত শাহজালাল (রহঃ)-এর সিলেট আগমনের খবর পেয়ে রাজা গৌড়-গোবিন্দ তাঁর সৈন্যসামন্তসহ একটি সুড়ঙ্গপথ দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার পর নিরুদ্দেশ হয়ে যান আর ‘হারং হুরং’-ই হচ্ছে সেই সুড়ঙ্গ।  সিলেটি শব্দ হুরং অর্থ সুড়ঙ্গ। ছোট পাহাড় ঘেরা এক খণ্ড ফাঁকা জায়গা। এরই এক পাশে সুড়ঙ্গের প্রবেশ মুখ। ভেতরে খুবই অন্ধকার। সাবধানে কয়েক পা এগিয়ে বোঝা গেল ভেতরে পথ সংকুচিত হয়ে এসেছে। প্রচণ্ড  স্যাঁতস্যাঁতে, দেয়ালে শ্যাওলা। মোবাইলের আলোয় সুড়ঙ্গের অন্ধকার ভেদ করা গেল না। বেশি ভেতরে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। বিষাক্ত সাপ, পোকামাকড় থাকা খুবই স্বাভাবিক। হয়তো অনেক রহস্যও লুকিয়ে রয়েছে এখানে। তবে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়ে এলে হয়তো এর ভেতরটা দেখা যেতে পারে। যদিও তেমন দুঃসাহস এখন পর্যন্ত কেউ করেনি।

চলে আসুন সিলেটের এই ঐতিহাসিক সুড়ঙ্গে। রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা হবে নিশ্চয়ই। ঢাকা থেকে সিলেটে এসে আম্বরখানা থেকে অটোরিকশায় এখানে আসা যায়। গাইড হিসেবে একজন চা শ্রমিক সঙ্গে নিয়ে নেবেন।

ছবি: লেখক 

/এনএ/      

লাইভ

টপ