এ এক অন্য জীবনানন্দ

Send
ফয়সাল আহমেদ
প্রকাশিত : ১৬:০৫, জুন ২০, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩০, জুন ২০, ২০১৬

প্রচ্ছদঅনেকদিন পর জীবনানন্দ দাশ নতুন করে আমাদের সামনে, তবে কবি হিসেবে নয় কথাসাহিত্যিক পরিচয়ে, যে উপাধিতে তিনি সাধারণের কাছে পরিচিত নন। আমি-আমরা, আমাদের কাছে জীবনানন্দ বলতে তাঁর কবি পরিচয়টিই মাথায় আসে সবার আগে। কবি হিসেবে তিনি যেমন সেরা, কথাসাহিত্যিক হিসেবেও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ‘গল্পপত্র’ সম্পাদক মাসউদ আহমাদ লিখেছেন- ‘জীবদ্দশায় জীবনানন্দ ছিলেন বৃত্তের বাইরে, মৃত্যু-পরবর্তী সময়ে তিনিই চলে আসেন বৃত্তের কেন্দ্রে; যা সময় পরিক্রমায় গাণিতিক নয়, জ্যামিতিক হয়ে উঠেছে। কী কবিতায় বা গল্প-উপন্যাসের লেখক হিসেবে তিনি আরাধ্য, বহুল পঠিত এবং তুমুলভাবে সমসাময়িক। নানা কারণেই রবীন্দ্রনাথের কাছে আমাদের ফিরে ফিরে যেতে হয়; কিন্তু রবীন্দ্রনাথের পর, জীবনানন্দ এতটা প্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ- গুরুকে পাশে রেখেও জীবনানন্দের সৃজনভাণ্ডারে আমরা সবচেয়ে বেশি অবগাহন করে উঠি- অনুভবে, আভাসে ও প্রতিভাসে।’
গল্প ও গল্পভাষ্যের কাগজ ‘গল্পপত্র’ মে-২০১৬ সংখ্যাটি সাজানো হয়েছে জীবনানন্দকে কেন্দ্র করে। যার শিরোনাম দেয়া হয়েছে কথাসাহিত্যের জীবনানন্দ। জীবনানন্দ গবেষক ভূমেন্দ্র গুহর একে একে তিনটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে গল্পপত্রের এই সংখ্যায়। সাক্ষাৎকারগুলো আলাদাভাবে নিয়েছেন ফয়জুল লতিফ চৌধুরী, যৌথভাবে আনিসুল হক ও জাফর আহমদ রাশেদ আর সৈকত হাবিব। তিনটি কথোপকথনে উঠে এসেছে জীবনানন্দ দাশের ব্যক্তি জীবন, পারিবারিক জীবন, সাহিত্য চর্চা, বিশেষ করে জীবনানন্দের মৃত্যু পরবর্তী সময়ে তাঁর অপ্রকাশিত লেখা প্রকাশের গল্প। জীবনানন্দ গবেষক কবি ভূমেন্দ্র গুহ অত্যন্ত খোলামেলাভাবে বিষয়গুলো বর্ণনা করেছেন। এর পরই রয়েছে কবি কায়সুল হকের সাক্ষাৎকার। আর এটি নিয়েছেন মাসউদ আহমাদ।

কাগজটিতে আরো আছে জীবনানন্দের ছোটগল্পের মূল্যায়ন। আবদুল মান্নান সৈয়দ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, জাকির তালুকদার, ফারুক মঈনউদ্দীন, শহীদ ইকবাল, হাসান অরিন্দম, হামীম কামরুল হক, মহি মুহাম্মদ, জুলফিয়া ইসলাম, বকুল আশরাফ ও শামস্ আলদীনের মূল্যায়ন জীবনানন্দের গদ্যের নতুন চিন্তার সূত্রপাত ঘটাবে। কথাসাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন- জীবনানন্দের এইসব পাণ্ডুলিপি গ্রন্থাকারে প্রকাশের ঔচিত্য বা উপযোগিতা সম্পর্কে প্রশ্ন উঠেছে কোনও কোনও মহলে। তাঁদের বক্তব্য এই, কবি স্বয়ং এগুলি প্রকাশের উপযুক্ত মনে করেননি, অনেক অপ্রকাশিত কবিতাই তাঁর পূর্ব প্রকাশিত কিছু কবিতা খসড়া মাত্র। কিছু রচনা নিতান্তই হাত মকসো করার মতন অকিঞ্চিৎকর। এতে একজন কবির খ্যাতি ক্ষুণ্ন হয়। আবার অন্যপক্ষের বক্তব্য, যে-কবি বাংলা কবিতার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন, তাঁর সমস্ত রচনাই প্রকাশযোগ্য, পৃথকভাবে কোনও কোনও রচনা সার্থক না হলেও সামগ্রিকভাবে এইসব রচনার মধ্যে ফুটে ওঠে কবির সম্পূর্ণ মনোজগৎ, তাঁর নির্মাণপদ্ধতি, তাঁর সময়-চেতনা। আর জীবদ্দশায় অপ্রকাশিত এতগুলি গদ্য রচনা জীবনানন্দর সম্পূর্ণ অন্য একটি পরিচয় এনে দিয়েছে। যা শুধু বিস্ময়করই নয়, সাহিত্যের ইতিহাসেও স্থান করে নেবে। আমি এই দ্বিতীয় মতটিকেই যুক্তিযুক্ত মনে করি।’

জীবনানন্দ দাশের উপন্যাস মূল্যায়ন বিভাগে লিখেছেন সৈয়দ আজিজুল হক, সেলিনা হোসেন, পারভেজ হোসেন, রেজাউল করিম খোকন ও সৈয়দ তৌফিক জুহরী। কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন লিখেছেন- ‘জীবনানন্দ দাশ কবি এবং কথাশিল্পী- দুই শিল্পমাধ্যমে তাঁর দেখার কোনো ফাঁক নেই, যে দেখা একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় ক্ষমতা। তিনি তাঁর উপন্যাসকে এই বড় ক্ষমতা দিয়ে অসাধারণ করেছেন।’
এ ছাড়া 'ও জানেমন জীবনানন্দ, বনলতা সেন বলছি' শিরোনামে কবিকে নিয়ে কাব্যগল্প লিখেছেন মল্লিকা সেনগুপ্ত। আমার জীবনানন্দ বিভাগে জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে ব্যক্তি-অনুভূতির কথা জানিয়েছেন এ সময়ের পাঁচজন লেখক। প্রশান্ত মৃধা, আহমাদ মোস্তফা কামাল, টোকন ঠাকুর, তারেক মাহমুদ ও লুৎফর হাসান।
এ সংখ্যার অন্যতম আকর্ষণীয় বিষয় জীবনানন্দকে নিয়ে গল্প বিভাগটি। দারুণসব গল্প লিখেছেন- আবদুল মান্নান সৈয়দ, শাহাদুজ্জামান, মনি হায়দার, পিয়াস মজিদ, মোজাম্মেল হক নিয়োগী, মোজাফ্ফর হোসেন, কাদের বাবু, শাহান শাহাবুদ্দিন ও মাসউদ আহমাদ। 'জীবনানন্দ ও তাঁর কাল' উপন্যাসটি রচনার পেছনের গল্প লিখেছেন লেখক হরিশংকর জলদাস বইয়ের গল্প বিভাগে। উপন্যাসটি রচনার প্রেক্ষাপট বর্ণনা আশা করি ভালো লাগবে।
জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে এত আয়োজনের মধ্যে এই সংখ্যায় আরও রয়েছে ম্যারিনা নাসরীন, গওহর গালিব, সবুজ ওয়াহিদ ও হোসনে আরা জাহানের গল্প। পাঠকের চিঠি বিভাগে দুইজন পাঠকের লেখা স্থান পেয়েছে।
গল্পপত্রের এই সংখ্যাটির দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ করেছেন আনিসুল হক। 



গল্পপত্র/ সম্পাদক : মাসউদ আহমাদ/ বর্ষ-৬, সংখ্যা-৮, মূল্য : ১২০ টাকা

লাইভ

টপ