অধ্যাপক রাজ্জাক : কয়েকটি খটকা || পর্ব-৮ (প্রসঙ্গ সামন্তবাদ)

Send
ফিরোজ আহমেদ
প্রকাশিত : ১০:৩৬, সেপ্টেম্বর ০৪, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:২৯, সেপ্টেম্বর ০৪, ২০১৬

অধ্যাপক রাজ্জাক ও আহমদ ছফাতিনি আহমদ ছফারে বললেন “আহেন, মৌলবী ছফা, বহেন”। ছফা ভাই কিছুক্ষণ ছটফট করে বের হয়ে গেলেন। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। তো ছবিটবি তোলা শেষ। আমি বের হব। স্যার বললেন, “এহন যায়েন না।বসেন, বইটই দ্যাখেন।” আমি তখন তার কথা বুঝি নাই। আমি তাড়াতাড়ি সালাম টালাম দিয়ে বের হয়ে আসলাম। বের হয়ে দেখি গেটের মধ্যে বসা ঐ ভদ্রলোক, আহমদ ছফা। হাতে আঁখ, হাত দিয়ে কচলাইতেছেন। আমারে দেখে বললেন, “দাঁড়ান, আপনারে কি রাজ্জাক স্যার কোনো বই দিছে।” আমি বললাম “না, দেয় নাই”। উনি আমার ব্যাগ চেক করা শুরু করলেন

পূর্ব প্রকাশের পর

অধ্যাপক রাজ্জাকের সামন্তবাদ বিচার


অধ্যাপক রাজ্জাককে নিয়ে শ্রেষ্ঠতম রচনাটি আহমদ ছফার। ‘যদ্যপি আমার গুরু’ সম্ভবত বাংলা জীবনী সাহিত্যেই তুলনাহীন একটা গ্রন্থ। অধ্যাপক রাজ্জাকের চিন্তার বৈচিত্র, গভীরতা আর স্বাতন্ত্র্যের পরিচয় আমরা গ্রন্থটিতে বারংবার পাবো। কিন্তু পাণ্ডিত্য নয়, আবদুর রাজ্জাক নামের একটি মানুষকে রক্তমাংসে যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, তার সাহিত্যগুণ অনন্য। ভবিষ্যতের পাঠকদের আবদুর রাজ্জাককে চেনার প্রধানতম সূত্র এরপর থেকে ‘যদ্যপি আমার গুরু গ্রন্থটি’র এই আবদুর রাজ্জাক। কিন্তু এই রাজ্জাক ছফার সৃষ্টি, বাস্তবের সাথে তার মিল-অমিল যাই থাকুক। গভীর প্রেম, কখনো কখনো অভিমান আর সর্বদা প্রশ্নাতুর মন নিয়ে শিষ্যরূপী আহমদ ছফা যে গুরুকে এঁকেছেন, আবেগের প্রাবল্য তার শিল্পমানকে সামান্যও ক্ষুণ্ন করেনি। বরং আবদুর রাজ্জাকের একটা প্রধান বৈশিষ্ট্য আহমদ ছফা তার গুরুর চিত্রণে সম্ভবত সবচে সার্থকভাবে প্রকট করে তুলতে পেরেছিলেন। সেটা শিক্ষক হিসেবে আবদুর রাজ্জাকের স্বাতন্ত্র্য ও অনন্যতা।
আহরার আহমেদ তার স্মৃতিচারণে শিক্ষক হিসেবে অন্য অধ্যাপকদের বিপরীতে আবদুর রাজ্জাকের বৈশিষ্ট্যকে মূল্যায়ন করেছেন “নিজেকে তিনি স্থাপন করেছিলেন প্রাচীনতর ভারতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক রীতি আর অনুশীলনে- সেটি হলো পরম্পরা যা গুরু আর শিষ্যকে এক বন্ধনে আবদ্ধ করে।”[১] ত্রিশের দশকের আরও কয়েকজন অধ্যাপক সম্পর্কিত স্মৃতিচারণে এই বৈশিষ্ট্যটির কমবেশি উল্লেখ পাওয়া যাবে। হয়তো, আধুনিক পাশ্চাত্য জ্ঞানকাণ্ডকে তারা অসাধারণরূপে আয়ত্ব করলেও আশ্রমের পরম্পরা সংস্কৃতির ঐতিহ্যও তারা লালন করেছেন একই সাথে। অধ্যাপক রাজ্জাকের বিষয়টি শুধু অবশ্য সেখানেই সীমাবদ্ধ নয়, শ্রেণিকক্ষে বক্তৃতা দিতে তিনি নিতান্তই অপরাগ ছিলেন। এমনকি মুখস্ত করেও ফিরে এসেছেন তিনি, সহাস্যে বলেছেন সরদার ফজলুল করিমের সাথে সাক্ষাতকারে। রওনক জাহান ‘গুরু’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন তার বিশেষণ হিসেবে। তার আরেকজন ছাত্র খালিদ শামস অধ্যাপক রাজ্জাকের পড়াবার পদ্ধতি নিয়ে যে আলোচনা করেছেন, আজকের শিক্ষার্থীরা তা শুনলে নিশ্চয়ই অবাস্তব ভাববেন: অধ্যাপক রাজ্জাকের যে টিউটোরিয়াল ক্লাসগুলো নেয়ার কথা, সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি স্বভাবজাত অট্টহাসির সাথে রোববার সকালে তার বাড়ি চলে আসতে বলেন। হাসির কারণ ছিল অধিকাংশ শিক্ষার্থীই তার এই ক্লাসটি এড়িয়ে যেতে পছন্দ করে। রোববার, মানে সাপ্তাহিক ছুটির দিনটিতে সকাল বেলা বইপত্রের স্তুপে ঠাসা কেদারাহীন সেই ঘরে শতরঞ্জির ওপর শুরু হলো পাঁচ শিক্ষার্থীর টিউটোরিয়াল। সাথে মিলতো মাখানো রুটি আর লেবু চা। খালিদ শামস বলেন, “সেই ছিল আমাদের টিউটোরিয়ালের শুরু, শুরু এমন একটা বিদ্যায়তনিক সম্পর্কেরও যার ভিত্তি ছিল উষ্ণ ব্যক্তিগত অন্তরঙ্গতা, যার সাথে তুলনীয় কোন কিছুই দেশে কিংবা প্রবাসে কোন স্থানে কিংবা কোন শিক্ষকের সাথেই আমার হয়নি।”[২]
আহমদ ছফার সাথে অধ্যাপক রাজ্জাকের সম্পর্ক শিক্ষক ছাত্র হিসেবে ছিল গভীরতম। তাদের অন্তরঙ্গতা নিযে সরদার ফজলুল করিম বলেছেন মোহাম্মদ আলীর সাথে তার সাক্ষাতকারে।[৩] নাসির আলী মামুনও আহমদ ছফা তার গুরুর প্রতি কী রকম অধিকার বোধ করতেন ও তার প্রকাশ ঘটাতেন, তার সরস বর্ণনা করেছেন অধ্যাপক রাজ্জাকের স্মৃতিচারণে।[৪]
নাসির আলী মামুনের স্মৃতিচারণে গুরুর প্রতি আহমদ ছফার দখলের বোধ ও প্রেমানুভূতির যে চিত্রটি এঁকেছেন, তাতে আহরার সাহেবের ভারতীয় গুরু পরম্পরা অভিধাটির মাজেজা বেশ খানিকটা বোঝা যাবে। পাঠকের মনে পড়ে যেতে পারে মহাভারতে কুরু-পাণ্ডবের অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্যের ওপর অর্জুনের অধিকারবোধের কথা, নিষাদপুত্র একলব্যের প্রতি অর্জুনের প্রবল ঈর্ষার আধুনিক রূপটি যেন আহমদ ছফা দেখালেন বিখ্যাত ব্যক্তিদের আলোকচিত্র তোলার নেশাকে পেশা বানিয়ে ফেলা নাসির আলী মামুনের প্রতি তার সরল হিংসার প্রকাশে।
১৯৭৬ সালের ঘটনা এটি, নাসির আলী মামুন গিয়েছেন অধ্যাপক রাজ্জাকের বাড়িতে তার ছবি তুলতে: “হঠাৎ এর মধ্যে আহমদ ছফা আসলেন।উল্টাপাল্টা পোশাক,পায়ে ধুলা, উসকো খুসকো চুল,বিস্ফোরিত চোখ, হাতে একটা বই আর এক টুকরা আঁখ। আহমদ ছফা রুমে আসলেন, আমি স্যারের চেয়ারে, হাতে ক্যামেরা।এগুলা দেখে আহমদ ছফা বললেন “এই যে আপনি, আপনার আইডেন্টিটি কার্ড আছে? আপনি কোন পত্রিকায় কাজ করেন?” নানান রকম জেড়া করতেছেন কিন্তু আমি যার বাসায় বসা- রাজ্জাক স্যার- তিনি আমারে প্রটেক্ট করতেছেন না। তিনি মিটমিট করে হাসতেছেন। আমি থতমত খেয়ে গেলাম। তিনি আহমদ ছফারে বললেন “আহেন, মৌলবী ছফা, বহেন”। ছফা ভাই কিছুক্ষণ ছটফট করে বের হয়ে গেলেন। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। তো ছবিটবি তোলা শেষ। আমি বের হব। স্যার বললেন, “এহন যায়েন না।বসেন, বইটই দ্যাখেন।” আমি তখন তার কথা বুঝি নাই। আমি তাড়াতাড়ি সালাম টালাম দিয়ে বের হয়ে আসলাম। বের হয়ে দেখি গেটের মধ্যে বসা ঐ ভদ্রলোক, আহমদ ছফা। হাতে আঁখ, হাত দিয়ে কচলাইতেছেন। আমারে দেখে বললেন, “দাঁড়ান, আপনারে কি রাজ্জাক স্যার কোনো বই দিছে।” আমি বললাম “না, দেয় নাই”। উনি আমার ব্যাগ চেক করা শুরু করলেন। ব্যাগে বই না দেখে আমারে সেদিন ছেড়ে দিছিলেন। আমার তো তখন কাঁদো-কাঁদো অবস্থা- থাপ্পড়-টাপ্পড় দেয় কিনা- না আঁখ দিয়ে বারি মারে- এই চিন্তায়।”
ছফার প্রায় শিশুসুলভ পাহারাদারির দিকটি বাদ দিলেও সম্পর্কের এই দিকটি গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আমাদের চেনা সম্পর্কে শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে সাধারণ একটা বক্তৃতা দেন সকলের জন্য, শিক্ষার্থীরা সাধ্যমত গ্রহণ করেন। বক্তৃতাটিকে উৎপন্ন হিসেবে বিবেচনায় নিলে সকলের জন্যই তা একই, বাজারের মোড়কজাত পণ্যের মতো তাতে সাধারণ একটি মান বজায় রাখার নিশ্চয়তা থাকে। কিন্তু গুরুবাদী শিক্ষায় সকল শিক্ষার্থী একই গূঢ় জ্ঞানের অধিকারী হবেন না। যোগ্যতা আগ্রহ ও বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী কেউ শরনিক্ষেপের রহস্য জানবেন, কেউ অসিচালনায় দক্ষতা পাবেন, কেউ গদাধারী হবেন। সতীর্থরা তাই কী পাচ্ছেন সে বিষয়ে সজাগ ও ইর্ষাতুর, কখনো অভিমানভরা দৃষ্টি রাখাটা তাই কখনো কখনো স্বাভাবিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।

২.
ভারতবর্ষের উৎপাদন পদ্ধতি বিতর্ক বিষয়ে তার অভিমত জানতে চেয়ে আবদুর রাজ্জাককে ছফা প্রশ্ন করেছিলেন প্রখ্যাত কমুনিস্ট নেতা আবদুল হক রচিত একটি গ্রন্থকে উপলক্ষ করে। যদিও ছফার গ্রন্থটিতে কাল বিষয়ে সামান্য তথ্যগত বিভ্রান্তির সুযোগ রয়েছে, বলা হয়েছে ‘পুরো ষাটের দশক, এমনকি সত্তরের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই পুস্তিকাটি রাজনৈতিক নেতা এবং বুদ্ধিজীবীদের কিছুটা প্রভাবিত করেছিল।’ আবদুল হক রচিত এই গ্রন্থটি ৬৯ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। ফলে পুরো ষাটের দশক জুড়ে এর প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনা নেই। সামন্তবাদের মতো তখনকার দিনের একটা আলোচিত বিষয়ে ছফাচিত্রিত রাজ্জাক সাহেবের চিন্তা ভাবনার খোঁজ আমরা এই প্রসঙ্গেই পাই, উদ্ধৃতির দীর্ঘতা পরিহারে কিছুটা সংক্ষিপ্ত আকারেই উপস্থাপন করা গেলো:
“ইন দা স্ট্রিকটেস্ট সেন্স অব দা টার্ম ইন্ডিয়াতে কোন ফিউডালিজম আছিল না। বেঙ্গলের কথা তো এক্কেরে আলাদা... ফিউডালিজম অইল একটা ক্লোজড সিস্টেম। বংশপরস্পরা একটা পরিবার স্থায়ী অইয়া একটা জায়গায় বসা করব। তার ধোপা, নাপিত, কামার, কুমার সব আলাদা। এক জায়গার মানুষ অন্য জায়গায় যাইবার পারব না... আর যদি বেঙ্গলের কথায় আইয়েন, তাইলে এক্কেরে অন্যকথা বলতে অয়। পুরনো বাংলাপুঁথিতে দেখা যায় বাংলার বাণিজ্যবহর জাভা, সুমাত্রা এই সকল অঞ্চলে যাওয়া আসা করছে। যেখানে বাণিজ্য এই রকম সচল থাকে সেই সমাজটারে অন্য যা ইচ্ছা কইবার চান কন, কিন্তু ফিউডালিজম বলবার পারবেন না... তা অইলে চাঁদ সওদাগরের কাহিনী আপনের জানা। বেবাক বাংলা সাহিত্যে এই রকম শিড়দাঁড়ার মানুষ একটাও দেখছেন? ...চাঁদ সওদাগর চরিত্রের এই যে ঋজুতা এইডা অইল সমুদ্র বাণিজ্য শক্তির প্রতীক।
আমি আমার মূল প্রশ্নে ফিরে গেলাম: উনারা যে বলছেন, পূর্ববাংলা আধা-সামন্তবাদী আধা-উপনিবেশবাদী?
স্যার ঈষৎ বিরক্ত হয়ে বললেন: ওরা যদি গায়ের জোরে কইবার চায় আপনে কী করবেন, মারামারি করবেন নিহি?”[৫]
এটা খুবই স্বাভাবিক যে, সামন্তবাদের বিতর্ক আজকাল মানুষ ভুলেই গেছে প্রায়, তরুণেরা বলতে গেলে জানেনই না। বাংলাদেশের উৎপাদন পদ্ধতি কি পুঁজিবাদী না সামন্ততান্ত্রিক না আধাসামন্ততান্ত্রিক, সেটা এক বিস্তর বিতর্কের বিষয় ছিল ষাটের দশক থেকেই। বামপন্থীদের প্রধান দুটো ভাগ মস্কোপন্থীদের পুরোটা এবং পিকিংপন্থীদের একাংশ মনে করতো পূর্ব পাকিস্তানের উৎপাদন পদ্ধতি আধা-সামন্তবাদী।[৬]
১৯৬৪ সালে রায়পুরার কৃষক সম্মেলন আবদুল মতিন, আলাউদ্দিন ও আবদুস সামাদ পূর্ব পাকিস্তানের কৃষিতে ধনতন্ত্র প্রধান বলে তত্ত্ব হাজির করেন। তার বিরোধিতা করে ১৯৬৯ সালে পূর্ববাংলার তখনকার অন্যতম প্রধান কমিউনিস্ট নেতা এবং একই পার্টিভুক্ত আবদুল হক রচনা করেন তার ‘পূর্ব বাংলা আধা ঔপনিবেশিক আধা সামন্তবাদী’ পুস্তিকাটি। আবদুল হকের ব্যাখ্যার সমর্থন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত অধ্যাপক আবু আহমেদ, যিনি সর্বপ্রথম দুই পাকিস্তানের অর্থনীতির বৈষম্য বিষয়টি আলোচনায় এনে আলোড়ন তৈরি করেছিলেন, এনএসএফের গুণ্ডাদের শারিরীক গুরুতর হামলা শুধু নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিও খুইয়েছিলেন। ’৭১ পরবর্তীতে বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে ধনবাদ প্রধান বক্তব্য দিয়ে আবারও একটি পুস্তিকা রচনা করেছিলেন অর্থনীতিবিদ আখলাকুর রহমান। সেটার সমালোচনা করে আবদুল হক আবারও লেখেন ‘কৃষি ব্যবস্থা আধা সামন্ততান্ত্রিক’ গ্রন্থটি।[৭]
অজস্র রচনা তখন এসেছে এ বিষয়ে। অজস্র ভাতৃঘাতী খুনও ঝরেছে এই বিতর্কে। বিপ্লবী রাজনীতির সাথে যুক্ত অধিকাংশ তাত্ত্বিক এ বিষয়ে নিজ নিজ অবস্থান ব্যক্ত করে কিছু না কিছু লিখেছেন।
অর্থনীতিতে সামন্তবাদের উপস্থিতি বিষয়ে সম্ভবত ৯০ দশকে শেষ জোরালো বক্তব্য দেন ফরহাদ মজহার। ব্রাত্য রাইসু, রাজু আলাউদ্দিন ও মশিউল আলমকে দেয়া একটা সাক্ষাতকারে রাজু আলাউদ্দিনের প্রশ্নের উত্তরে তিনি শুধু যে সামন্তবাদ কিংবা আধা সামন্তবাদ আছে, তাই না, এনজিওর উচ্চসুদের কারবার গ্রামাঞ্চলে সেটাকে আরও শক্তিশালী করছে, এমন মত প্রকাশ করে বলেন:[৮]

“রাজু: উচ্চহারে সুদ দেওয়ার কারণে ফিউডালিজম ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে?
ফরহাদ: আপনি তো জমিদারদেরও সুদ দিচ্ছেন, খালি গরীব কৃষকদেরই সুদ দিচ্ছেন না। জমিদারও কুসীদজীবীর কাছ থেকে সুদ নিচ্ছে। মহাজনের কাছ থেকে। এবং বড় জমির মালিকরা সুদ নিচ্ছে। নিয়ে তার কাছে সে কিন্তু বন্ধক থাকছে। থাকার কারণে সে জমি হারাচ্ছে। এবং উৎপাদন ব্যবস্থা এতে কিন্তু ক্ষয় লাভ করছে। ক্ষয়িষ্ণু হচ্ছে। এখান থেকে মার্ক্স কী সিদ্ধান্ত টানলো? জানেন? বললো যে এটা প্রগতিশীল। এটাতে ভীত হওয়ার কোনো কারণ নেই। এটাই হিস্ট্রির প্রসেস। আমি পছন্দ করি আর না করি। ক্যাপিটালিজম একটা বর্বর জিনিস। দিস উইল হ্যাপেন। ইউ ক্যাননট স্টপ ইট। এখানে মর‌্যালিজম করে লাভ নেই। কাজেই আমি যেহেতু এখনও পর্যন্ত- আমার বন্ধু ছফা আমাকে যতই গালিগালাজ করেন- মার্ক্সের ছাত্র হওয়াটা আমি ছেড়ে দেই নাই, আমি মর‌্যাল ক্রিটিসিজমের জায়গায় যাই না। আমি প্রসেসটা বোঝার চেষ্টা করি। তা হলে আমরা দেখবো যে ড. ইউনূসের এই যে ব্যবস্থাটা, এটা কী করছে? আমাদের সমাজকে কি এটা আসলে ভাঙছে, নাকি সমাজে আসলে রিইনফোর্স করছে ফিউডালিজম। “ফিউডালিজম” ধারণাটার মুশকিল থাকা সত্ত্বেও ভালো কিছু হাতের কাছে নেই বলে এটাই বললাম।
রাজু: আপনার কি ধারণা রি-ইনফোর্স করছে?
ফরহাদ: রি-ইনফোর্স করছে।
রাজু: ফিউডালিজমকে?
ফরহাদ: যে নামেই বলুন, পুরোনো পশ্চাৎপদ ও প্রতিক্রিয়াশীল উৎপাদন সম্পর্ক তো গ্রামে বহাল তবিয়তেই আছে। বিলুপ্ত হয়নি তো। আমাদের রাজনীতি আর সংস্কৃতির দিকে তাকান। কী দেখেন? মাস্তানি...”
ভারতবর্ষে সামন্তবাদের উপস্থিতি কিংবা অনুপস্থিতি বিষয়ে পণ্ডিতরা একমত নন। এর একটা প্রধান কারণ বিতর্কের বিষয়বস্তু আর তার সংজ্ঞার অনির্দিষ্টতা। কিন্তু আহমদ ছফার বয়ানের অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক যে যুক্তি ও সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে সামন্তবাদের উপস্থিতি অপ্রমাণ করতে চেয়েছেন, সেটাই ইতিহাস বিচারে আরও একটি খটকার জন্ম দেয়। (চলবে)
পড়ুন-

অধ্যাপক রাজ্জাক : কয়েকটি খটকা || পর্ব-৭ (প্রসঙ্গ জিন্নাহ) 

টীকা-
১. ডেইলি স্টার, জুলাই ৬, ২০১৫
২. আ. রা. স্মা. গ্র. পৃষ্ঠা ২৭০
৩. “তুমি জানলা কেমন করে? আমরা গিয়ে দেখতাম, তিনি ছফার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করছেন, ইয়ার্কি-ঠাট্টা করছেন, তখন আমরা কাইটা পড়তাম। কারণ ছফার সঙ্গে তাঁর আড্ডা ছিল ভিন্ন ধরনের। ছফার সঙ্গে প্রফেসর রাজ্জাক খুব ইন্টিমেট ছিলেন। ছফা তাঁর সাথে ইয়ার্কি-ঠাট্টা করত। হ্যাঁ, ছফা তো প্রফেসর রাজ্জাককে ছাড়ত না। ও মুখের ওপর কিছু বলতে পরোয়া করত না। প্রফেসর রাজ্জাকের সাথে আমরা তেমনভাবে মিশতাম না। ছফা দরকার হলে টাকা চাইত, বলত, আমার এত টাকা লাগবে। আমাদের সাথে এ ধরনের সম্পর্ক ছিল না। আমরা যাইতাম তাঁর কাছে জ্ঞানের কথা-টথা শুনতে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করতে।”
৪. অধ্যাপক রাজ্জাকের সাথে আহমদ ছফার এই গুরুশিষ্য সম্পর্ক বাকি সতীর্থদের প্রতি কতটা ঈর্ষার পর্যায়ে গিয়েছিল, সেটা বোঝা যাবে বর্ণনাটি নেয়া হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রিডিং ক্লাবের আয়োজনে ২৪ মার্চ, ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত নাসির আলী মামুনের একটি স্মৃতিচারণে।
৫. যদ্যপি আমার গুরু, পৃষ্ঠা ৪৮
৬ .জানা-অজানা ভাষা মতিন; ড. মাহবুব উল্লাহ্, ১৪ অক্টোবর, ২০১৪, দৈনিক যুগান্তর
৭. ডা. এম এ করিম, সাপ্তাহিক সেবা-৩৩ বর্ষ ।।সংখ্যা: ১১।।রোববার।।২৪ নভেম্বর ২০১৩
৮. খুবই অন্যায় করেছে উন্নত বিশ্ব ডঃ ইউনূসকে নোবেল প্রাইজ না দিয়ে। এটা বর্ণবাদের অংশ :
ফরহাদ মজহার। আদাবর, শ্যামলী ২/১/১৯৯৬। ব্রাত্য রাইসুর সৌজন্যে পাওয়া। এত পুরনো একটা সাক্ষাতকার তার ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে ব্যবহার করতে দেয়ার জন্য তাকে ধন্যবাদ। 

লাইভ

টপ