জন্মদিনে মিলনের জন্য লেখা

Send
রিজিয়া রহমান
প্রকাশিত : ১২:০২, সেপ্টেম্বর ০৮, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৩৯, সেপ্টেম্বর ০৮, ২০১৬

ইমদাদুল হক মিলন
সময়টা ছিল সত্তরের দশকের শেষ বা আশির দশকের শুরু। সে সময়ের খুব বেশি প্রচারিত নয় এমন একটি পত্রিকায় প্রকাশিত একটি লেখা পড়ে আমি রীতিমতো বিস্মিতই হলাম। এমন লেখা সচরাচর চোখে পড়ে না। যেমন তার বিষয়চিত্রণের দক্ষতা, তেমনি ভালো লেখকসুলভ কলম-সংযম। সবচেয়ে আকৃষ্ট হলাম তার ভাষার আশ্চর্য গতিময়তায়। লেখকের নামটি বারবার পড়লাম, খুব পরিচিত মনে হলো না, তবে নিশ্চিত হলাম, আমাদের সাহিত্যে নিঃসন্দেহে একজন ভালো কথাশিল্পীর পদার্পণ ঘটল। ধারণাটি আমার যে অমূলক ছিল না, তা আজ ইমদাদুল হক মিলনের পাঠক এবং বোদ্ধা সাহিত্য বিশ্লেষকরা নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন(এমনি সচকিত ও উচ্ছ্বসিত হয়েছিলাম, আনোয়ার হোসেন সম্পাদিত ছোট কাগজ ‘রূপম’ পত্রিকায় প্রকাশিত নবীন এক লেখক মঞ্জু সরকারের প্রথম লেখাটি পড়ে)।

প্রতিশ্রুতি দেওয়া নবীন লেখক আজকের খ্যাতনামা কথাশিল্পী ইমদাদুল হক মিলনের জন্যই আজ কলম ধরেছি আমি। যদিও আজকের লেখার পরিপ্রেক্ষিতটি ভিন্ন, তার জন্মদিন উদ্যাপনের প্রাসঙ্গিকতাতেই আমার এই লেখা। ইমদাদুল হক মিলনের অবদানের কারণে তার সম্পর্কে লেখার দাবিটি অনেক আগেই যে তৈরি হয়েছিল, সেটা অস্বীকার করি না। তবে সম্ভবত মিলনের সাহিত্যযাত্রার মধ্যপথে, ভাবতে হয়েছিল জনপ্রিয় লেখক হয়ে ওঠার যে প্রবণতা তার কলমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তাতে সেই জনপ্রিয়তার কোন অঙ্গনটি বেছে নেবে, সে উপলব্ধিটি করা। অপেক্ষা হয়তো সে কারণেই ছিল আমার। মিলনের লেখার যে বৈদগ্ধ্য প্রথমেই আমাকে আকৃষ্ট করেছিল, হয়তো চেয়েছিলাম সেই পথেই তার আরো উত্তরণ ঘটুক।
অবশ্য এর পরে আমি লেখকের জনপ্রিয়তা নিয়েও ভাবতে বাধ্য হয়েছি। আমাদের দেশে জনপ্রিয় লেখককে অবমূল্যায়নের একটি প্রবণতা সব সময়ই আছে। বলা হয়, জনপ্রিয় লেখা হচ্ছে তরল অগভীর গল্পকাহিনী, যা কেবল অপরিপক্ব পাঠকেরই প্রিয় হয়। অনেক সময় জনপ্রিয় লেখাকে রহস্য কাহিনী বা বটতলার অপসাহিত্যের পর্যায়ে নামিয়ে ফেলার অসৎ উদ্দেশ্যও দেখা যায়। বাস্তবতাটি কিন্তু ভিন্ন, আসলে সব জনপ্রিয় লেখাই রহস্য সিরিজ কাহিনী বা সস্তা লেখা নয়। কোনো লেখা জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারে লেখকের লেখার বৈশিষ্ট্যের কারণেই। ভাষা, আঙ্গিক, গল্প বলার ভঙ্গি এবং বিষয়ের বিশ্বস্ততার বাস্তবতাই একজন জনপ্রিয় লেখককে পাঠকপ্রিয় করে তোলে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এখানেই রহস্য সিরিজের জনপ্রিয়তার সঙ্গে মূলধারার অন্তর্গত জনপ্রিয়তার পার্থক্য। আজ নিঃসন্দেহে বলতে পারি, হুমায়ূন আহমেদের মতো (যদিও তার মৃত্যুর পরে তার অবদানের কথা অনেকেই বলতে শুরু করেছেন) মিলনকেও ‘জনপ্রিয়তার’ কারণে যথার্থ মূল্যায়ন করা হয়নি বলে আমার ধারণা।
মনে আছে, অনেক আগে মিলন একবার আমাকে বলেছিল- রিজিয়া আপা, হুমায়ূন ভাই সম্পর্কে কলাম লিখে তাঁর নিন্দুকদের মুখ বন্ধ করে দিয়েছেন, আমার সম্পর্কেও কিছু লেখেন।
বলছিলাম- লিখব, সময় হোক।
বলা বাহুল্য, সময়টা হয়নি। কারণ তরলমতি পাঠকদের মস্তিষ্ক চর্বণ করবার এবং ‘ধোয়া তুলসীপাতা’ সদৃশ্য (!) গুরুগম্ভীর (!) সমকালীন বাংলা সাহিত্য পাঠকদের পথভ্রষ্ট করবার অপবাদ দিয়ে দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের কলমের ‘নার্ভাস ব্রেকডাউন’ করবার জন্য অনেক কবি-সাহিত্যিক তথা বুদ্ধিজীবীরা যেভাবে কোমর বেঁধেছিলেন, সৌভাগ্য আমাদের অর্থাৎ সমকালীন সাহিত্য পাঠকদের, ইমদাদুল হক মিলনের কলমের প্রতি তেমন প্রস্তর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেনি।
সত্যের প্রয়োজনে বলতেই হয়, মিলনের অবদান নিয়ে বিশ্লেষণ ও তার মূল্যায়নের তাগিদ অনুভব করেছি অনেক আগেই। বিশেষ করে তার একাধিক ছোটগল্প ও দু-একটি উপন্যাস এবং তার আত্মজীবনীর খণ্ডগুলো আমাকে যথেষ্ট উদ্বুদ্ধ করেছে আলোচনা লেখার জন্য। এই লেখাগুলোই বাংলা সাহিত্যে তার যথার্থ স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছে। আমার শারীরিক অক্ষমতা ও কিছু অকর্মক ব্যস্ততাই ইমদাদুল হক মিলন সম্পর্কে লেখার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। সময় হওয়ার পরও মিলনকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি আমি রাখতে পারিনি। এটা আমার যথেষ্ট মর্মপীড়ার কারণও বটে। সে যা-ই হোক, আজ মিলনের জন্মদিনের শুভকামনা জানাতে গিয়ে ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়া আলোচনা স্থগিতই রাখলাম। আজ তার একষট্টিতম জন্মবার্ষিকীর ঘটনাই মুখ্য। মানুষের জীবনে একষট্টি বছর বয়স এসে যাওয়া এমন কিছু নতুন ব্যাপার নয়। কিন্তু একজন সৃজনশীল মানুষের ক্ষেত্রে এটি একটি বিশেষ ঘটনা। মিলনের ক্ষেত্রেও।
তবু মিলনকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হচ্ছে, কী করে কখন তুমি আমাদের মতো প্রৌঢ়দের সারিতে এসে দাঁড়ালে? সেই প্রাণবন্ত তরুণটি তুমি- তুমিও শেষে ষাটের ঘরে পা রাখলে? বয়স বাড়ার শুভ-অশুভ নিয়ে কথা বলার সময় নয়, তবু বলতে চাই, বয়সের বৈদগ্ধ্যেই প্রকৃত স্বর্ণের খনির আধার (ওল্ড ইজ গোল্ড), তা ছাড়া লেখকের বয়স কখনো কি ষাট বছর হয়! ওটা ক্যালেন্ডারের পাতায়ই থাকে। লেখকরা চিরতরুণ, চিরনবীন- চিরহরিতের দেশের বাসিন্দা তাদের মনে সতত প্রবাহিত হয় বসন্তের বাতাস। তা-ই যদি না হবে, পঁচাত্তর বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ ‘শেষের কবিতা’ নামের রোমান্টিক উপন্যাসের বিস্ফোরণটি ঘটাতে পারতেন? ষাটোর্ধ্ব অনেক কবি তাঁদের বিখ্যাত প্রেমের কবিতাগুলো লিখতে পারতেন! এই বয়সেই তো পৃথিবী বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিকরা তাঁদের সোনালি ফসল ঘরে তুলে আনতে থাকেন। মিলনের ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম ঘটবে না, আশা আমার।
একসময় আমি ছিলাম মিলনের কাছে বড় বোনের সম্মানে। এখনো আছি কি না জানি না (কারণ স্বেচ্ছানির্বাসিত আমার দীর্ঘদিন যোগাযোগ নেই মিলনের সঙ্গেও), তবু সেই বড় বোনের দাবি নিয়ে ইমদাদুল হকের স্বর্ণালি ফসলের আশা আমি করতেই পারি। পৃথিবীর আহ্নিক গতি, বার্ষিক গতির কারণে মানুষের বয়স বাড়বার অনিবার্যতা সত্ত্বেও সে সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির অনার্সের ছাত্র মিলন, সেই উদ্যমী তরুণটিই নিজের লেখার ব্যাপারে যে ছিল দারুণ উৎসাহী, সে ছিল আমার স্নেহের পাত্র। সেই সব দিনে, কোনো দুপুরে হঠাৎ এসে টিপে দিত আমার বাড়ির দরজার বেল। ঢুকেই বলত- খিদে পেয়েছে খুব, রিজিয়া আপা। বলি- এসো, আমার সঙ্গে ভাত খাও। রাজ্যের গল্প হয় খাবার টেবিলে বসে। তারপর দুম করে উঠে দাঁড়ায় সে; বলে- চলি, রিজিয়া আপা।
হোন্ডা নিয়ে সশব্দে আমাদের গলির মুখে অদৃশ্য হতে দেরি হয় না তার।
ছোট ভাইটির মতোই আমার কাছে ছিল হয়তো মিলনের আবদারের জায়গা। সমস্যা হলে শুকনো মুখে ছুটে আসত রিজিয়া আপার কাছে। সেসব মিলনের মনে আছে কি না জানি না, কিন্তু মনে আছে আমার।
হঠাৎ একদিন এসে জানাল- পশ্চিম জার্মানিতে চলে যাচ্ছি। দোয়া করবেন। অবাক আমি। কোনো চাকরি নিয়ে নয়, জার্মানির কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্যও নয়, লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে কেন চলেছে? ক্ষুণ্নই হলাম; বললাম- অনার্স পরীক্ষা না দিয়েই চলে যাবে! তা ছাড়া এত ভালো লেখার হাত তোমার, তোমার লেখা পাঠকরা পছন্দ করছে, এসব ফেলেই চলে যাবে?
মিলন শুধু বলে- ফিরে আসব, রিজিয়া আপা। বেশিদিন থাকব না।
মিলন ফিরে এলো সত্যিই, বেশিদিন না থেকেই। বলল- ভালো লাগল না, চলে এলাম।
কাজ শুরু করল সাপ্তাহিক ‘রোববার’ পত্রিকায়। লেখাও শুরু করল পুরোদমে, অল্প দিনেই পেল খ্যাতি।
সে সময়ের একটি ঘটনা- মিলন হয়তো এত দিনে ভুলে গেছে। ঘটনাটি তেমন গুরুত্বপূর্ণ না হলেও আজও বেশ মনে আছে আমার। একেবারে ছেলেমানুষি কাণ্ড, কৌতুকই বোধ করি ভাবলে। বর্তমানে আমেরিকাপ্রবাসী তখনকার তরুণ কবি ইকবাল হাসানও ছিল ঘটনাটিতে। কয়েক বছর আগে ঢাকায় এসেছিল, দেখা হয়েছিল আমার সঙ্গে, পুরনো ঘটনাটি নতুন করে মনে পড়েছিল আমার, ইকবালেরও। দুজনেই হাসছিলাম। ঘটনাটির উল্লেখ হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হবে না ভেবেই লিখছি। তখন ‘রক্তের অক্ষর’ আর ‘শিলায় শিলায় আগুন’ লিখে বেশ খ্যাতি পেয়ে গেছি। ‘বিচিত্রা’ সম্পাদক শাহাদত চৌধুরীর অনুরোধে ঈদ সংখ্যা ‘বিচিত্রা’র জন্য চা বাগানের উপন্যাস ‘সূর্য-সবুজ রক্ত’ লিখতে শুরু করেছি। লিখে সবে শেষ করেছি, প্রচণ্ড পরিশ্রমে রীতিমতো বিধ্বস্ত আমি তখন। তখনই, এক সকালে মিলন এসে উপস্থিত, সঙ্গে কবি ইকবাল হাসান। দুজনেই ঈদ সংখ্যা রোববারের জন্য কাজ করছে।
মিলনই প্রথমে বলল- রিজিয়া আপা, আপনাকে এবারের ঈদ সংখ্যা রোববারের জন্য উপন্যাস দিতে হবে।
বললাম- ঈদ সংখ্যা বিচিত্রার জন্য উপন্যাস লিখে মাত্র শেষ করলাম। এখন আরেকটি উপন্যাস লেখা আমার পক্ষে কী করে সম্ভব!
মিলন গম্ভীর কণ্ঠে জানাল- উপন্যাস আপনাকে দিতেই হবে। কোনো আপত্তি চলবে না।
ইকবাল আরো একপ্রস্থ চড়া- যদি না দেন, সেটা আপনার জন্য ভালো হবে না জানিয়ে রাখি। কী হবে আমার জানতে চাইলে মিলন বলল- আপনাকে আমরা ব্ল্যাক লিস্টেড করব, আপনার কোনো লেখা, কোনো ছবি, আপনার সম্পর্কে কোনো খবর, সমালোচনা-আলোচনা আমাদের পত্রিকায় যাবে না।
সাপ্তাহিক ‘রোববার’ ছিল ইত্তেফাক গ্রুপেরই একটি প্রকাশনা। ইত্তেফাকের সার্কুলেশন তখন দেশের সব জাতীয় দৈনিকের শীর্ষে।
আমার অতি পরিচিত দুই তরুণ লেখকের কথাবার্তা-হাবভাবে আমি প্রথমে হতবাক হলাম, তার পরই রেগে গেলাম, বললাম- তোমরা কি আমাকে হুমকি দিতে এসেছ! ভয় দেখিয়ে লেখা নেবে? শোনো, উপন্যাস তোমাদের আমি দেব না। কোনো লেখাই আর দেব না, যাও, আমাকে ব্ল্যাক লিস্টেড করলে কর গিয়ে, ও নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই।
নিমেষেই চুপসে যায় দুই আগ্রাসনবাদীর ভাবভঙ্গি। মিলন মিনমিন করে কী যেন বলতে চেষ্টা করে। যেন যেতে পারলেই বাঁচে। ইকবাল একেবারেই নিষ্প্রভ। এরপর কী করতে হবে, বলতে হবে, ওরা বুঝে উঠছে না যেন, শুকনো মুখেই চলে গেল দুজন।
কিন্তু ওদের বিব্রত নির্বাক মুখ আর অপরাধী ভঙ্গিতে চলে যাওয়ায় বেশ মন খারাপ হলো। ভাবলাম, ওদের নেহাতই ছেলেমানুষি কাে আমি এমন রেগে না গেলেও পারতাম। ওদের যিনি পাঠিয়েছেন, নির্দেশনাটা হয়তো তাঁরই ছিল। মিলনকে তো আমি চিনি। এমন ব্যবহার ওর স্বভাবে নেই।
পরদিন ফোন করল মিলন- রিজিয়া আপা, আমার কিন্তু কোনো দোষ নেই। ইকবালই...
ওকে থামিয়ে দিলাম, বললাম- উপন্যাস আমি তোমাদের জন্য লিখব।
দুদিন পর ইকবাল সস্ত্রীক আমার বাড়িতে এসে হাজির; বলল- আপনার সঙ্গে আমার স্ত্রীর পরিচয় করাবার জন্য নিয়ে এলাম। ও আপনার লেখার ভক্ত।
একেবারেই নিপাট ভালো মানুষ ইকবাল। চা-টা খেয়ে, গল্পসল্প করে, অতি বিনীত সম্ভাষণে বিদায় নিল। উপন্যাস লেখার কথা একবারও উচ্চারণ করল না।
পরে জেনেছিলাম, ওদের সেই অপরিপক্ব ঘটনাটি কবি আহসান হাবীবও শুনেছেন। হাবীব ভাই-ই ইকবালকে বলেছেন- খুব অন্যায় কাজ করেছ। রিজিয়া রহমানের কাছে মাফ চেয়ে এসো।
হাবীব ভাইয়ের কথায়ই ইকবালের ঘটা করে বউ নিয়ে বেড়াতে আসা, অর্থাৎ মাফ চাইতে আসা। মাফ ওকে চাইতে হয়নি, কোনো রাগই আমার ছিল না।
বেশ মন দিয়েই লিখলাম ঈদ সংখ্যা রোববারের জন্য ‘অলিখিত উপাখ্যান’ নামের উপন্যাসটি। ইকবাল এসে নিয়ে গেল, ছাপা হলো ঈদ সংখ্যা রোববারে। সেই প্রথম আমার একসঙ্গে দুটি ঈদ সংখ্যার উপন্যাস লেখা।
মিলন কিন্তু লাপাত্তা। ফোন সে আর করেনি, আমার বাড়ির দরজায় তার আঙুলের চাপে অসহিষ্ণু বেল আর বাজে না। কবি জাহিদুল হক, লেখক নুরুল করিম নাসিম ও আরো দু-একজন কবি-সাহিত্যিক ছিলেন আমার স্নেহভাজন, যাঁরা প্রায়ই আসতেন আমার বাড়িতে। ইমদাদুল হক মিলন ছিল এদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ, হয়তো সে কারণেই এই প্রতিভাবান তরুণটি ছিল আমার বিশেষ স্নেহের পাত্র।
হঠৎ উদ্ভট একটা কাণ্ড ঘটিয়ে ওর পালিয়ে থাকায় বেশ দুঃখিত হয়েছিলাম।
‘অলিখিত উপাখ্যান’ ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়ার বেশ কিছুদিন পর হঠাৎ একদিন মিলনের ফোন- রিজিয়া আপা, আপনার উপন্যাসটা পড়েছি। খুব ভালো লেগেছে।
বললাম- এ উপন্যাসের ক্রেডিট তো তোমার আর ইকবালের। তোমাদের হুমকির কারণেই একটা ভালো উপন্যাস লেখা হয়ে গেল।
মিলন কুণ্ঠিত স্বরে বলে- রাগ করেছেন, রিজিয়া আপা? হেসে ফেলি- রাগ করব কেন। অল্প বয়স, কোনো পত্রিকার পক্ষ থেকে এমন গুরুদায়িত্ব পেয়ে গেলে ও রকম একটু হয়েই থাকে। আমি তো আর তোমাদের বয়সী ছেলেমানুষ নই যে এ নিয়ে রাগ করে বসে থাকব।
মিলন সহজ হয়ে যায়, আবার সেই আগের মিলন হয়ে ওঠে।
মনে হয়, এসব এই তো সেদিনের কথা। মনে হয়, এই তো সেদিন বাংলা একাডেমির বইমেলায় গেলাম আমি আর রাবেয়া আপা- রাবেয়া খাতুন। গেটের কাছেই বইয়ের স্টলটিতে ছিল মিলন আর ওর স্ত্রী। ছিল হুমায়ূন আহমেদও। চেয়ারে বসে ছিলেন হক ভাই- সৈয়দ শামসুল হক। মিলনই ডাকাডাকি শুরু করল- রিজিয়া আপা, রাবেয়া খালা, আসেন আমাদের দোকানে। আসেন, আসেন।
আমাদের তখন বইমেলার স্টলগুলো সব ঘুরে ঘুরে দেখবার তাগিদ রয়েছে। পুকুরপাড়ে উন্মুক্ত চায়ের দোকানে বসে চা খাওয়ার পরিকল্পনাও আছে। রাবেয়া আপাই বললেন- আসব একটু পরে, মেলাটা ঘুরে দেখি আগে।
হুমায়ূন এসে জোর করেই আমাদের দোকানে নিয়ে গেল। মিলনের নতুন বই সাজানো রয়েছে র‌্যাকে, হুমায়ূনেরও।
পাঠকরা বেশ সমীহ-ভক্তি নিয়েই ঘুরে ঘুরে দেখছে তাদের। হুমায়ূন, মিলন দুজনই তখন খ্যাতিমান লেখক, রাবেয়া আপা আর হক ভাই তো সাবেকি নামি লেখক, দোকানের সামনে কৌতূহলী পাঠক-ক্রেতার ভিড় জমাটাই স্বাভাবিক। সেটা বেশ উপভোগ করেছিলাম সেদিন। তা ছাড়া ফাল্গুনের উতলা হাওয়া আর মিষ্টি রোদের বিকেলটিতে বইয়ের দোকানে আড্ডাটি সেদিন কিন্তু হুমায়ূনের রসিকতায় হক ভাইয়ের সংক্ষিপ্ত-তীক্ষ্ম বাক্যে এবং মিলন ও তার স্ত্রীর প্রাণবন্ত হাসিতে চমৎকার জমেছিল। অসুখ ধরা পড়েছে। প্রায়ই ব্যথা হয়, ব্যথার ওষুধ খেয়ে গুটিশুটি পড়ে থাকি বিছানায়, ডাক্তার বলেছেন পানি বেশি খেতে। পানির বোতল সব সময় সঙ্গেই রাখি।
মিলনকে বললাম- মিলন, আমার পানির বোতলটা রেখে এসেছি। গলা, বুক শুকিয়ে উঠছে। পানি খেতে হবে। চলো, ফিরে যাই। তোমার উপন্যাসের পত্রিকা পরে কিনে পড়ে নেব।
পলকে মিলনের মুখ নিষ্প্রভ। বুঝলাম, ওর ইচ্ছে পত্রিকাটা আজই আমার হাতে তুলে দেয়। হতাশ কণ্ঠে মিলন বলল- চলেন, তাহলে ফিরে যাই। আর কিন্তু হাঁটতে হবে না, এসেই গেছি প্রায়। নবীন লেখকটি নিজের লেখা অন্যকে পড়তে দেওয়ার আগ্রহে এতক্ষণ খুবই উৎসাহী ছিল। ফিরে যাওয়ার কথায় একেবারে ম্লান হয়ে গেছে। মনে পড়ল, একসময় আমিও তো আমার প্রথম লেখা উপন্যাসটি বন্ধুবান্ধব-পরিচিতদের পড়তে দিয়েছি, অধীর আগ্রহে তাদের মন্তব্যের অপেক্ষায় থেকেছি। মিলনকে বললাম- চলো, পত্রিকাটা কিনেই নিই। পরে আবার পাওয়া যায় কি না। গুলিস্তানের শেষ মাথায় এসে ফুটপাত থেকে পত্রিকাটি কিনে নিলাম।
ড্রাইভার আমার শরীরের অবস্থা জানে, ভিড় ঠেলেই সে গাড়ি নিয়ে চলে এসেছে গুলিস্তানে। গাড়ির জানালার কাছে হাত রেখে মিলন বারবার বলল- আমার উপন্যাসটা কিন্তু পড়বেন। পড়ে কেমন লাগে জানাবেন কিন্তু, আপা।
বাড়িতে ফিরে দুপুরের মধ্যেই পড়ে শেষ করলাম মিলনের উপন্যাস। ভাষার এমন জাদু... একটানা পড়ে গেছি, শেষ না হওয়া পর্যন্ত ছাড়তেই পারিনি। রোমান্টিক একটি উপন্যাস। কিন্তু চমৎকার। বিকেলেই ফোন করল মিলন- আপা, পড়ছেন আমার উপন্যাস?
বললাম- পড়ে শেষ করেও ফেলেছি। এমন চমৎকার লেখার হাত! উপন্যাস লিখবার ক্ষমতা তোমার কলমের আছে। লেখা ছেড়ে না দিলে ভবিষ্যতে ভালো উপন্যাস পাব তোমার কাছ থেকে।
নিঃসংশয় হলো না মিলন, বলল- সত্যি বলছেন?
-সত্যিই তো বলছি, দুপুরে আমার কিডনিতে পাথরের খোঁচা তুচ্ছ করতে পেরেছি তোমার উপন্যাস পড়তে পড়তে।
খুশি হলো মিলন- দোয়া করবেন, আপা।
আজ নিঃসংকোচেই বলি, মিলনের খ্যাতি তার লেখার গুণেই। সহজ এবং শিল্পিত ভাষা দিয়ে পাঠককে ধরে রাখবার ক্ষমতা সব লেখকের থাকে না, হাতে গোনা কিছু লেখক ছাড়া।
সমকালের সাহিত্যে আমাদের দেশের হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন এবং পশ্চিমবঙ্গের খ্যাতনামা লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখায়ই পাওয়া যায় এই শিল্পময় গতিশীল ভাষার জাদু।
অনেক জটিল কঠিন রূঢ় আখ্যানেও তাঁরা খরস্রোতা নদীর মতো হালকা স্বচ্ছন্দ গতির সাহিত্যভাষা সৃষ্টি করতে পেরেছেন, এখানেই রয়েছে তাঁদের সাফল্য বা কৃতিত্বের মূল চাবিকাঠি।
অনেক আগে নিজের লেখা প্রথম উপন্যাস নিয়ে যে আগ্রহ, অভিনিবেশ, মমতা ও উৎসাহ আমি মিলনের মাঝে দেখেছিলাম, সেটাও ছিল তার সাফল্যের বড় প্রতিশ্রুতি।
আজ যখন সে একষট্টি বছর বয়সে পা রেখেছে, আমি এখনো তাকে প্রতিভাবান সেই উদ্যমী তরুণটিই মনে করছি।
এই দিন, এই বয়স নিঃসন্দেহে সোনালি ফসলের সমৃদ্ধি এনে দেবে। প্রয়োজন শুধু তার অবদানের প্রতি নিরপেক্ষ দৃষ্টিক্ষেপণ এবং তার সঠিক মূল্যায়ন।

 

লাইভ

টপ